শনিবার ২৫ মে, ২০১৯ ৮:৪৮ এএম


শিশু শিক্ষা বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরতে হবে

মো. সিদ্দিকুর রহমান

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ১৩ মার্চ ২০১৯  

অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক বর্তমান সরকারের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশাল অর্জন। এত কিছুর পরও শিশু শিক্ষা বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।

সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ নেই। সরকারের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির পরও যেসব কারণে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে আগ্রহী হচ্ছেন না সেগুলো হল- পাঠ্যপুস্তক, শিশুবান্ধব অভিন্ন কর্মঘণ্টা, শিক্ষক সংকট, পাঠদানবহির্ভূত কাজ ইত্যাদি।

পাঠ্যপুস্তক : অধিকাংশ অভিভাবকের ধারণা- বেশি বই, বড় বড় পাস তাদের সন্তানদের মহাপণ্ডিত বানিয়ে দেবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড শিক্ষার্থীর বয়স, রুচি, সামর্থ্য অনুযায়ী মানসিক বিকাশ এবং জ্ঞানার্জনের অভিপ্রায়ে জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদদের মাধ্যমে কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে থাকে।

অথচ কিন্ডারগার্টেনগুলো শিশুর ওপর পাঠ্যবইবহির্ভূত অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দেয়। প্রকৃত অবস্থা হল, না বুঝে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতা ভরিয়ে ফেলা গেলেও তাতে জ্ঞানার্জন হয় না। জ্ঞানার্জন ব্যতিরেকে অহেতুক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বই-খাতার বোঝা শারীরিক ও মানসিক শাস্তিস্বরূপ। এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা দরকার। এতে শিশু শিক্ষায় বাণিজ্য হ্রাসসহ বিকশিত হবে শিশুর ভবিষ্যৎ।

শিশুবান্ধব অভিন্ন কর্মঘণ্টা : দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় সরকারের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় উচ্চশক্তিসম্পন্ন বিস্কুট ও সারা দেশের মায়ের হাতে রান্না খাবারের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীরা ক্ষুধা নিবারণে সাফল্য অর্জন করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এত কিছুর পরও আমাদের দেশের খেটে খাওয়া স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহী হচ্ছে না, যার ফলে শিক্ষার্থী সংখ্যা দিন দিন কমছে।

এর অন্যতম কারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মঘণ্টার সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন ও উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখার সময়সূচির বিশাল ব্যবধান। আমাদের দেশে গরিব মানুষের সন্তানরা কমবেশি তাদের বাবা-মাকে সহযোগিতা করে থাকে। তারা বিকাল বেলা খেলাধুলা, বিনোদন, বিশ্রাম এবং সকাল বেলা আরবি পড়াসহ একটু অবসরের সুযোগ পায় না।

তাই উপবৃত্তিসহ নানা সুবিধা উপেক্ষা করে অভিভাবকরা সন্তানদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করে থাকেন। সব শিশুর জন্য অভিন্ন শিশুবান্ধব কর্মঘণ্টা হলে শিশু শিক্ষায় বাণিজ্য হ্রাস পেত।

অথচ সংশ্লিষ্টরা ছোট সোনামণিদের তাদের মতো কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে বিবেকবর্জিত কাজ করে যাচ্ছেন। তারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে বিদেশি কর্মঘণ্টার সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মঘণ্টা তুলনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। এর ফলে বাণিজ্যিকভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটছে।

শিক্ষক সংকট : প্রাথমিকের শিক্ষক সংকট ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ প্রবাদের মতো। অবসর, মাতৃত্ব, চিকিৎসা, ছুটি, প্রশিক্ষণসহ নানা কারণে প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট দেখা যায়। শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতায় বিদ্যালয়ের বেহাল দশা হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে অভিভাবকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে বাধ্য হন।

পাঠদানবহির্ভূত কাজের চাপ : পাঠদানবহির্ভূত কাজের চাপে প্রাথমিকের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যথাযথ যত্ন নিতে পারছেন না। ফলে ‘শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পড়ান না’- এ অপবাদের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। এতে লাভবান হচ্ছে বাণিজ্যভিত্তিক শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু শিক্ষার্থীদের প্রতি অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকট এবং শিশু শিক্ষায় বাণিজ্য দূর করার উদ্যোগ নেবে সরকার, এটাই প্রত্যাশা।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ ও প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম
এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর