বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ২১:১২ পিএম


শিশুরাই আমাদের শিক্ষক

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশিত: ০৯:২২, ১৩ এপ্রিল ২০১৯  

এক হাতে একটি আহত মুরগির বাচ্চা, অন্য হাতে দশ রুপির একটি নোট। চোখ-মুখ বিষাদময়। বোঝাই যাচ্ছে অপরাধবোধে আচ্ছন্ন সে। অসহায় দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছে। এমন একটি শিশুর ছবি অতিসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে জায়গা করে নিয়েছে গণমাধ্যমে।

শিশুটির নাম ডেরেক সি লালচানহিমা। সে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সাইরাং এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, রাস্তায় তার সাইকেলের নিচে চাপা পড়ে একটি মুরগির বাচ্চা। আহত মুরগির বাচ্চাটিকে নিয়ে বাড়িতে এসে পিতাকে বলে ওটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। পিতা দেখলেন বাচ্চাটি আগেই মারা গেছে। কিন্তু পুত্র বারবার বলতে থাকে হাসপাতালে যাওয়ার কথা। অবশেষে পিতা দশ রুপির একটি নোট হাতে দিয়ে পুত্রকে বলেন, তুুমিই হাসপাতালে নিয়ে যাও। শিশুটি এক হাতে মুরগিছানা, আরেক হাতে টাকা নিয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে যায়। শিশুটির সরলতা ও মানবিকতায় অভিভূত এক নার্স হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই লালচানহিমার ছবি তোলেন। পরে সাংগা সেইস নামের একটি আইডি থেকে ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করা হয়। ভারতের শীর্ষস্থানীয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভি জানিয়েছে, ফেসবুকে শেয়ার হওয়া লালচানহিমার ওই ছবিতে লাইক পড়েছে এক লাখ ২৪ হাজার, মন্তব্য এসেছে ১১ হাজার এবং শেয়ার হয়েছে ৮৭ হাজারবার। দুনিয়াজুড়ে ভাইরাল হওয়া ওই ছবির কথা এখন সবার মুখে মুখে। এতে একটি কোমলমতি শিশুর প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ, দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যপরায়ণতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তেমনি আরেকটি শিশু তার কর্তব্যবোধ ও দায়িত্ব সচেতনতার জন্য বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল মাত্র কয়েকদিন আগে। সে শিশুটি আমাদের দেশের নাঈম ইসলাম। গত ২৮ মার্চ দুপুরে বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার ব্রিগেডের পানির পাইপের ফাটা জায়গা চেপে ধরে সে বিখ্যাত হয়েছে। নাঈমের সে ছবিও প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল। নাঈমের পানির পাইপের ফাটা জায়গা চেপে ধরার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে রক্ষা করা। সে বলেছে, আগুনে পুড়ে মানুষ মারা যাবে- এ শঙ্কা থেকেই সে পাইপের ফুটো বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করেছিল। বনানীর ওই অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার তুলনায় নাঈমের ত্রাণচেষ্টা একেবারেই নগণ্য। যেটুকু পানির অপচয় সে রোধ করতে পেরেছিল, তা হয়তো আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কিছুই নয়। তবুও ওই কাজের দ্বারা সে যে দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যবোধ এবং মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তার তাৎপর্য বিশাল। যেখানে আমাদের সমাজ আজ অমানবিকতার মহামারীতে আক্রান্ত, দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যবোধ যখন অধিকাংশ মানুষের চিন্তা-চেতনা থেকে প্রায় উধাও হতে বসেছে, সেখানে শিশু নাঈমের এ কর্তব্যবোধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য কী।

মিজোরামের শিশু লালচানহিমা ইচ্ছা করলেই চাপাপড়া মুরগির বাচ্চাটিকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারত। কেউ তাকে কিছু বলতে বা করতে পারত না; কিন্তু সে তা করেনি। তার কচিমনে নিশ্চয় এ বোধটি জন্মেছিল যে, যেহেতু মুরগির বাচ্চাটি তার সাইকেলের নিচে চাপা পড়েছে, তাই ঘটনার দায় যেমন তার, তেমনি ওটাকে বাঁচিয়ে তোলাও তার দায়িত্ব। এ মূল্যবোধ কি আমাদের সবার মধ্যে এখন আছে? এ প্রশ্নে হ্যাঁ বাচক জবাব বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতায় আশা করা বাতুলতা মাত্র। বরং আমরা ঠিক এর উল্টো চিত্রই দেখতে পাই। প্রতিদিন আমাদের দেশের সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনও ঘটনাস্থলে, কখনও নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার সময় আহত ব্যক্তির জীবনাবসান হচ্ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাস, ট্রাক বা মোটর গাড়িচালক পালিয়ে যায় বা যাওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় আহত ব্যক্তি রাস্তায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিবেকহীন চালক তার দেহ বা মাথার ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যায়। এর ফলে আহত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গাড়ির ধাক্কায় পথচারী আহত হওয়ার পর চালক যদি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করত, তাহলে আহত ব্যক্তি হয়তো বেঁচেও যেতে পারত। কেউ হয়তো বলতে পারেন, গণপিটুনির ভয়েই চালকরা দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এ অজুহাত তাদের অমানবিকতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কেননা প্রশ্ন দায়িত্বশীলতার। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা একই ঘটনায় দ্বিতীয় অপরাধ বলেই গণ্য করা যায়।

দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তখন এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাক। অর্পিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাকেই আমরা দায়িত্বশীলতা বলি। যারা তা করেন, তারা দায়িত্বশীল হিসেবেই গণ্য হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখতে ব্যর্থ হন। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথাই বলি। এটি একটি দুর্ঘটনা সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পেছনে জমির মালিক, ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্নিষ্ট সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা কি দায়ী নয়? রাজউক অনুমতি দিয়েছিল উল্লিখিত প্লটটিতে ১৮ তলাবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের। কিন্তু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ সেটিকে ২৩ তলা পর্যন্ত তুলেছে। এখন রাজউক বলছে, রূপায়ণ ও জমির মালিক যৌথভাবেই এ অবৈধ কাজটি করেছে। যদিও গ্রেফতার হওয়া জমির মালিক ইঞ্জিনিয়ার ফারুক বলেছেন, রূপায়ণ তার বাধা মানেনি। তবে এখানে তিন পক্ষেরই সততা ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি জড়িত। প্রথমত, রাজউকের অনুমোদনের বাইরে গিয়ে ভবনটি ১৮ তলা থেকে ২৩ তলা করে রূপায়ণ সরাসরি আইন ও নিয়মের লঙ্ঘন করেছে; যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে জমির মালিক রূপায়ণের এ অবৈধ নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে সমান অপরাধ করেছেন। আর রাজউক কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে যে দায়িত্বহীনতা ও কর্তব্যে অবহেলার পরিচয় দিয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য বলেই সবাই মনে করেন। এমন তো নয় যে, রূপায়ণ এক রাতের মধ্যেই ভবনটির অবৈধ পাঁচটি ফ্লোর নির্মাণ করে ফেলেছিল। রাজউকসহ সব সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই তা নির্মিত হয়েছে দিনের পর দিন। কিন্তু তারা বাধা দেননি। প্রয়োজনে এ বিষয়ে তারা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারতেন। এখন রূপায়ণ তাদের অনুমতি ছাড়াই এ অবৈধ নির্মাণকাজ করেছে- রাজউক কর্তৃপক্ষের এ কৈফিয়ত কি গ্রহণযোগ্য? আমরা জানি, নির্মিত একটি ভবন ব্যবহারের আগে সরকারি বেশ কয়েকটি দপ্তর-অধিদপ্তর বা বিভাগের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে কি সে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল? যদি নেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি দপ্তরের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাকে এ জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এফ আর ভবনের সঙ্গে যতগুলো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জড়িত, সবগুলোর বিরুদ্ধেই দায়িত্বহীনতার অভিযোগ স্পষ্ট। রাজউক যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত, তাহলে রূপায়ণ নির্দিষ্ট নকশার বাইরে গিয়ে ভবনটি নির্মাণ করতে পারত না। আবার ভবনটির নিরাপত্তা সংশ্নিষ্ট বিষয়গুলো দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, তারা যদি তা পালন করত, তাহলে হয়তো এ প্রাণসংহারী দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।

দায়িত্বশীলতা বা কর্তব্যপরায়ণতা কাউকে মেরেকেটে শেখানো যায় না। এটা যার যার বিবেকবোধ থেকেই জাগ্রত হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের বিবেকবোধ যেমন ভোঁতা হয়ে গেছে, তেমনি স্বার্থের ঠুলির আড়ালে ঢাকা পড়েছে আমাদের চোখ। ফলে আমার যেটা কর্তব্য, সেটা ভুলে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে শিশুরা আমাদের চোখে আঁটা সে ঠুলি খুলে দেয়, নাড়া দেয় বিবেকের দরজায়। তখন আমরা নড়েচড়ে বসি। ভুলে যাওয়ার কথা নয়, গত বছরের আগস্ট মাসে এবং কয়েকদিন আগে এই শিশুরাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দায়িত্বহীনতা ও কর্তব্যে অবহেলার কথা। সতীর্থদের করুণ মৃত্যুতে তারা সুশৃঙ্খল অথচ বজ্রকঠিন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বুঝিয়ে দিয়েছে, কী করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশুদের রাস্তায় নেমে আসা, বনানীর রাস্তায় ফুটো পাইপ চেপে ধরে আগুন নেভাতে নাঈমের সহযোগিতা করা আর ভারতের মিজোরামের শিশু লালচানহিমার আহত মুরগির বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার মর্মার্থ একই। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের দৃষ্টান্ত।

শিশুদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তো আমাদের। অথচ এখন দেখছি, নানা ঘটনায় শিশুরাই আমাদের শিক্ষকের ভূমিকায় আবির্ভূত হচ্ছে। কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন, `ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।` নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিশুরা, পাইপ ধরা নাঈম আর মিজোরামের লালচানহিমা একদিন পিতা হবে। সেদিনও তারা দায়িত্ব আর কর্তব্যবোধের বিষয়টি নিশ্চয়ই স্মরণে রাখবে। একটি সুন্দর দেশ, একটি সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে এই খুদে শিক্ষকরাই বোধকরি আমাদের ভরসা।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর