রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৪৯ এএম


শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষ প্রশাসকের অভাব:কাজে সমন্বয়হীনতা

শরীফুল আলম সুমন

প্রকাশিত: ০৮:৪২, ২৮ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫১, ২৮ আগস্ট ২০১৯

শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষ প্রশাসকের অভাবের ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরসহ অন্যান্য দপ্তরে কাজে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাই তাঁদের পদের মূল্যায়ন করতে পারছেন না, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এমনকি শিক্ষা খাতের একাধিক প্রকল্পের পরিচালকের অদক্ষতায় প্রকল্পগুলোতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।

সাধারণত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদেরই শিক্ষা প্রশাসনে পদায়ন করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ উচ্চপদেই জুনিয়রদের প্রাধান্য রয়েছে। জানা যায়, সপ্তম ব্যাচের কর্মকর্তা থাকার পরও শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ দুই কর্মকর্তা ১৪তম ব্যাচ থেকে পদায়ন পেয়েছেন। এ ছাড়া যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় আছেন তাঁদেরই ঘুরেফিরে ভালো পদে দেওয়া হচ্ছে। এতে সিনিয়র সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। সিনিয়র সদস্যদের জুনিয়র কর্মকর্তার কাছে এসিআরের জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে, যা অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।

আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিনটি উইংয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিন কর্মকর্তার সঙ্গে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ ওই তিন কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতাকালে প্রভাবশালী তিন প্রতিমন্ত্রীর পিএসের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে তাঁদের সঙ্গেও কাজকর্মে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাউশি অধিদপ্তর, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি, নায়েম, ডিআইএ, ঢাকা আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস, শিক্ষার বিভিন্ন প্রকল্পসহ একাধিক দপ্তরের অবস্থান রাজধানীতে। আর এসব দপ্তরের বেশির ভাগেই উচ্চপদে আছেন জুনিয়র কর্মকর্তারা। সাধারণত আগে কোনো শিক্ষকের বড় কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকার পর চাকরির শেষ দিকে দপ্তরপ্রধান করা হতো। কিন্তু এখন সিনিয়রদের সেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে সিনিয়রিটি একটি বড় ক্রাইটেরিয়া। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই সততা, দক্ষতা ও সরকারের প্রতি কমিটমেন্ট আছে কি না তা দেখতে হবে। যখন কাউকে পদায়ন দেওয়া হয় তখন এ বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ সিনিয়রদের হতাশায় রেখে শিক্ষার উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’

জানা যায়, মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি ১০ শতাংশ কোটায় প্রফেসর পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একটি সময় তিনি সৌদি আরবের কিং খালেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেছেন। অনেক সিনিয়র শিক্ষক থাকার পরও তাঁকে মহাপরিচালক বানানোয় সন্তুষ্ট নন শিক্ষা ক্যাডারের বেশির ভাগ কর্মকর্তা।

মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরীও ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তাঁর এই উচ্চপদে আসীন হওয়া নিয়েও সন্তষ্ট নন শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা। তবে তিনি এর আগে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান মাউশির পরিচালক (ফিন্যান্স অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) পদে নতুন। অনেক কর্মকর্তার দাবি, তিনি কাজকর্ম খুব একটা বুঝে উঠতে পারছেন না। সম্প্রতি পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদটিও শূন্য হয়েছে। সেখানে দক্ষ লোক পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া অধিদপ্তরের সাধারণ প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালক মো. রুহুল আমিন তাঁর পদে তাল মেলাতে পারছেন না। এমনকি সম্প্রতি সরকারি স্কুল-কলেজে চতুর্থ শ্রেণির সাত শতাধিক কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও প্রশাসন শাখার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এসব কর্মচারীর পদায়নের ব্যাপারেও এই শাখার বিরুদ্ধে বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ একাধিক দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরে সাফল্য দেখাতে পারছেন না। এমনকি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মূল কাজ কারিকুলামের উন্নয়ন হলেও সংস্থার চেয়ারম্যান বিনা মূল্যের বই ছাপানোর জন্য দরপত্র, কাগজ কেনা, পরিদর্শনসহ নানা কাজেই বেশি সময় পার করছেন। এনসিটিবি বর্তমানে একটি সিন্ডিকেটের হাতেও বন্দি হয়ে পড়েছে।

শিক্ষার বাহ্যিক উন্নয়ন বলতে অবকাঠামো উন্নয়নকেই বোঝায়। কিন্তু সেই অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ ঈদের আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে আছেন। কিন্তু এরই মধ্যে কাজকর্মে স্থবিরতা নেমে এসেছে। ঠিকাদারি সংশ্লিষ্ট কাজ হওয়ায় নতুন দরপত্র শুরু করতে এবং কাজ যথাসময়ে শেষ করতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে দক্ষ ও যোগ্য প্রধান প্রকৌশলী খুঁজে পাচ্ছে না মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটিজ’। কিন্তু চার বছর পার হলেও এখনো প্রকল্পের মূল কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পিডি অধ্যাপক মোহাম্মদ দিদারুল আলম তিন মাসে প্রকল্পের কোনো অগ্রগতিই ঘটাতে পারেননি। এই পিডি আগে ‘রাজধানীতে ১১ স্কুল ও ৬ কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পেও জট পাকিয়ে ফেলেছিলেন। সেটি ফেলে রেখে এই প্রকল্পে যোগ দেন।

‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পও বেশ জটিল অবস্থায় আছে। তিন বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের মূল কাজ ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন হলেও এখনো তা শুরুই করা সম্ভব হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বারবার দরপত্র স্থগিত হয়েছে। অভিযোগ আছে, বর্তমান পিডি অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারছেন না। তাঁর অদক্ষতায় প্রকল্পই বন্ধ হওয়ার পথে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের (এক হাজার ৫০০ কলেজ) উন্নয়ন প্রকল্প’ হুমকির মুখে পড়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। আগের প্রকল্প পরিচালক এস এম আলমগীর কবির প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আশফাকুস সালেহীন অনেক চেষ্টা করেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে পারছেন না। মূলত পিডিদের ব্যর্থতায়ই প্রকল্পটি ঝুলে গেছে।

দেশের জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি জেলা স্কুলগুলোতে দীর্ঘদিন অবকাঠামোর উন্নয়ন হয় না। অনেক স্কুলেই এখনো ব্রিটিশ আমলের ভবন রয়েছে। ফলে সরকার ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন’ প্রকল্প নামে প্রায় দুই বছর আগে তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক প্রফেসর মো. নাসির উদ্দিন। কিন্তু মাউশি অধিদপ্তরের অসহযোগিতায় এখনো প্রকল্পের মূল কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি। অথচ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র আড়াই বছর বাকি। এই প্রকল্প নিয়ে বিদেশ সফরের প্রতিই ঝোঁক মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের।

একসময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করা প্রশাসন ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একটি প্রকল্পের সফলতা-ব্যর্থতার সব দায়ভার সংশ্লিষ্ট পিডির। তাঁর দক্ষতার ওপরই প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্ভর করে। আবার তাঁর অদক্ষতায়ই প্রকল্প ঝুলে যেতে পারে। একটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো বা কাজ শুরু করার দায়ভারও ওই পিডিরই নিতে হবে। আসলে দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন না দেওয়ায়ই অনেক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।’

তবে গত ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছাবিনিময়কালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প ঠিক করে তা বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাজেট দিয়েছি এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছি। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে প্রকল্প অনুযায়ী তাদের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।’

কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প ঠিক করলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারছে না।

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, ‘কয়েকটা প্রকল্পে কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু শিগগিরই তা কেটে যাবে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর