বুধবার ০৩ জুন, ২০২০ ১২:১০ পিএম


শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানের এমপিও কোড জটিলতা

কাজী মুহাম্মদ নূরুল হক

প্রকাশিত: ১১:০৭, ২০ মে ২০২০  

দেশে বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত একচতুর্থাংশ শিক্ষার্থী নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। বর্তমানে এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ শুরুতে চিরাচরিত নিয়মানুশারে বেসরকারী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের বিধিবদ্ধ নিয়মানুশারে কতিপয় কাম্য শর্ত পূরন করেই পাঠদান অনুমতি লাভ করতে হয়।

পরবর্তীতে পাবলিক পরীক্ষার ফরাফলসহ আরো কিছু মৌলিক শর্ত পূরন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড শর্তপূরনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে।

এ নিয়ম মেনেই যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন শিক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক আরোপিত শর্ত পূরন পূর্বক স্বীকৃতি লাভ করতো সে প্রতিষ্ঠান তখন এমপিও প্রাপ্তির আবেদন করে বিধিমোতাবেক এমপিওভুক্ত হতো। কিন্ত সমস্যা তৈরী হলো বিগত ২০০৪ সালে এ নিয়মতান্ত্রিক চলমান প্রক্রিয়া ততকালীন সরকার অজ্ঞাত কারনে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে তত্বাবধায়ক সরকার ২ বছর এ দিকে মনোযোগ দেয়নি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই ২০১০ সালে একটি  এমপিও নীতিমালা তৈরী করে নীতিমালার আলোকে ১৬২৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ,কলেজ,মাদরাসা, কারিগরি স্কুল)  এমপিওভুক্ত করে। যদিও নীতিমালা অনুযায়ী সব যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখন এমপিওভুক্ত করা নানা কারনে সম্ভব হয়নি। তখনকার বাকী সব যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবির প্রেক্ষিতে ততকালীন শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, এমপিওভুক্তির চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ২০১০ সালের পর প্রতি বছরই মাননীয় সংসদ সদস্যদের নিকট এমপিও দেয়ার আশ্বাস দিয়েও ততকালীন শিক্ষমন্ত্রী নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে পারেননি। এমনকি মন্ত্রী মহোদয়কে জাতীয় সংসদেই এবিষয়ে বেশ কয়েকবার মাননীয় সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের মূখে পড়তে হয়েছে ।

অন্যদিকে সারাদেশের ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা  এমপিও প্রাপ্তির ন্যায্য দাবীতে রাজপথে সোচ্চার হয়।  এ দাবীর প্রতি এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর নতুন এমপিওনীতিমালার আলোকে অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে প্রাপ্ত যোগ্য সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করে ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মোট ২ হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমপিও ভুক্তির জন্য নির্বাচিত ঘোষনা করেন। অবশ্য বিগত ৩০ এপ্রিল চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে ২ হাজার ৬৫০টি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই এসকল নতুন এমপিওপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা যাতে বকেয়াসহ বেতনভাতা পান সে জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরসমূহ তড়িঘড়ি করে চলমান লকডাউন  ও সীমিত সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের আবেদন গ্রহন করেছে। আবেদন গ্রহন কালীন সার্ভার জটিলতা, বেতন কোড জটিলতা ও আবেদন করার প্রক্রিয়ার তুলনায় সময়ের স্বল্পতার জন্য এ সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত (৬০ ৭০)% শিক্ষক- কর্মচারী আবেদন সম্পন্ন  করতে পারে নাই। আপাতত ঈদের পরে  এ সমস্যার সমাধান হবে।

কিন্তু এমপিওভুক্ত নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানের এমপিও কোড জটিলতার সমাধান কিভাবে হবে এবিষয়েই প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানরা দুশ্চিন্তায় আছেন।

চলমান নীতি মালায় এমপিও ইনডেক্স থেকেই অভিজ্ঞতা ধরা হয়। সে হিসাবে ইনডেক্স না থাকার অজুহাতে দীর্ঘ ১৫-২০ বছর পরে এমপিওভুক্ত হওয়া এসকল প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানরা এক ধাপ নিচের কোডে বেতন পাবেন।  আরো ১২-১৫ বছর কর্মরত থাকলেই কেবল তারা  স্ব পদের বেতন কোডে বেতনভাতা পাবেন । অথচ ২/৪/৫ বছর পরে তাদের অনেকে অবসরে চলে যাবেন। এই মানবিক সংকট উত্তরনে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট নিম্নবর্নিত বিষয়টি সুবিবেচনার আবেদন করছি ।

এক. যে কারনেই হোক প্রতি বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সক্ষমতা রাষ্ট্রের ছিলোনা বিধায়  দীর্ঘ ১৫/২০ বছর পর এসকল প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে।  সেজন্যই বয়সকাল গণনা নিয়ে এ জটিলতা তৈরী হয়েছে। নিয়মিত বছর বছর এমপিওভুক্ত হলে এ জটিলতা হতোনা।

দুই. যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রধান দীর্ঘ ১৫/২০ বছর যাবত বিনা বেতনে এ সকল প্রতিষ্ঠানের পাঠদান অনুমতি, একাডেমিক স্বীকৃতি এমনকি এমপিওভুক্তির সকল শর্তপুরনের সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
তিন. তাই যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান ও সহকারী প্রধানদের নিয়োগের তারিখ থেকে বয়সকাল গননা করা না হলে তারা দুটি মারাত্নক ক্ষতির মধ্যে পড়বে ।

একেতো দীর্ঘ ১৫-২০বছর যাবত বিনা বেতনে রাষ্ট্রকে শিক্ষা বিস্তারে সহযোগিতা করে আসছে। অপরদিকে ভবিষ্যত আর্থিক ক্ষতি নিয়েই প্রধানের কাম্য অভিজ্ঞতা না হতেই অবসরে চলে যাওয়ার মতো অমানবিক ভাগ্য ভরন করতে হবে।
এ সকল সমস্যার সমাধান মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই করাই শ্রেয়। অর্থাত যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানের তারিখ থেকে বয়সকাল গননা করাই এর একমাত্র সমাধান। তাহলে এ সকল শিক্ষকরা অতীতে যেমন একদিকে অর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে অপরদিকে ভবিষ্যতে অন্তত খালিহাতে অবসরে যাওয়ার অমানবিক ভাগ্য ভরন করতে হবেনা।

এ ক্ষেত্রে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি নজির গ্রহন করা যায়।  সেটি হলো কোন সংস্থা/প্রকল্প  থেকে রাজস্বখাতে জনবল সংযুক্ত হলে আর্থিক সুবিধা না পেলেও বয়সকাল গননা করা হয়।
 
তাই একযুগেরও বেশী সময় পর যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নতুন এমপিওভুক্ত হয়েছে সেসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যথাযথপ্রক্রিয়ায় নিয়োগকৃত শিক্ষকদের যোগদানের তারিখ থেকে বয়সকাল গননার বিষয়টি একটি পরিপত্রের মাধ্যমে সমাধা করার  জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট মানবিক আবেন করছি ।

লেখকঃ কেন্দ্রীয় সভাপতি, ননএমপিও মাদরাসা শিক্ষক সমিতি ও
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশন।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর