শুক্রবার ২৪ মে, ২০১৯ ১৯:১১ পিএম


শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনিয়মই যেন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:১৮, ৯ মে ২০১৯  

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে টাকা ছাড়া কোন কাজ চলে না। খোদ শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির ডজন খানেক অভিযোগ ওঠেছে।

শিক্ষা কর্মকর্তা হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তদন্ত শুরু করেছে জেলা শিক্ষা অফিস। জেলা অফিস থেকে পাঠানো দুই সদস্যের তদন্তদল গত সোমবার থেকে উপজেলার বিভিন্ন স্কুলের ৪০ শিক্ষকের কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন।

 

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, গত বছরের জুলাই মাসে যোগদানের পর থেকে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে হিটলারুজ্জামান নানা অজুহাতে হয়রানি করে বিভিন্ন মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। এসব কারণে শিক্ষকদের মাঝে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। হিটলারুজ্জামান উপজেলার ১০৯টি সরকারি প্রাথকি বিদ্যালয়ে উন্নয়নমূলক কাজের টাকা থেকে পাঁচ হাজার, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৫০ হাজার টাকা বিদ্যালয়গুলোতে না দিয়ে নিজে আত্মসাত করেন। উপজেলার বাংলা বাজার জয়নাল আবেদীন ও দার্গনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটি নব জাতীয়করণ হওয়ায় সাতজন শিক্ষকের বকেয়া বিল পাশ ও কাগজপত্রের অগ্রগতি করার জন্য বিশ হাজার টাকা করে এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় হিটলার। ছোটদের শেখ হাসিনা নামক চারটি বই সরকারিভাবে আটশত টাকা বিক্রি করার নির্দেশনা থাকলেও হিটলারুজ্জামান উপজেলার ১০৯টি সরকারি, ৬০টি কিন্ডার গার্ডেন থেকে চারটি বই এক হাজার টাকা করে বিক্রি করেন।

একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, গত বছর অক্টোবর মাসে সোনাগাজীতে নতুন করে ৪৬ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পায়। ওই সব শিক্ষকদের কাছ থেকে যোগদানপত্র সংগ্রহ ও সার্ভিস বই প্রস্তুত করা বাবত দুই হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া গত বছর উপজেলায় উন্নয়ন মেলার নাম দিয়ে ১০৯টি বিদ্যালয় থেকে এক হাজার টাকা করে এক লাখ নয় হাজার টাকা হাতিয়ে নেন শিক্ষা কর্মকর্তা হিটলারুজ্জামান। তাঁর বিরুদ্ধে গত বছর প ম শ্রেণির মডেল ষ্টেট পরীক্ষার নামে প্রতিজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০ টাকা প্রায় দুই লাখ বিশ হাজার টাকাও আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিময়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে মৌখিক ভাবে অনুমতি দিয়ে ডেপুটেশনে পাঠিয়েছেন তিনি। এছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের নির্দেশে হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করতে গত সোমবার জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ আলম ও মো. ফিরোজ আহমদ ও সোনাগাজীতে যান। তাঁরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বসে আর এম হাট কে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম শরিয়ত উল্যাহ, উত্তর চর চান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল চন্দ্র রায়, সোনাগাজী মাদরাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক একরামুল হক, দক্ষিণ চর দরবেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজমুল করিম, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও অভিযুক্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিটলারুজ্জামানসহ ৪০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ শিক্ষা কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন।

তদন্ত কর্মকর্তাদেরকে শিক্ষকরা বলেন, হিটলার অনেকদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের নানা ভাতা, প্রশিক্ষণ ভাতাসহ নানা খাতে টাকা কর্তন করে চলেছেন। গত ২০১৭ ও ২০১৮ অর্থবছরে তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা আত্মসাত করেছেন। হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে উপজেলার ১০৯টি স্কুলের উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের বরাদ্দ থেকে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া, বদলি বাণিজ্যসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষকেরা লিখিত বক্তব্যে জানায়, সোনাপুর বাংলাবাজার জয়নাল আবদীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দার্গন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষকের কাছ থেকে তাদের আটকে থাকা বেতন-ভাতাদি চালু করে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করেন। ওই ৭ শিক্ষক সোমবার লিখিত বক্তব্যে বিষয়টি উল্লেখ করেন।

 

নাম প্রকাশে অনিশ্চুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, তদন্ত চলাকালে তারা হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ আলম হিটলারুজ্জামানের পক্ষে সাপাই গেয়ে তাদেরকে কটাক্ষ ও দমক দেন। পরে তিনি হিটলারুজ্জামের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও তারা জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হিটলারুজ্জামান বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। দুই-চারজন শিক্ষক ব্যতীত বাকীরা সবাই তাঁর পক্ষে তদন্ত দলকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। এতে তার কোন সমস্যা হবে না।

তদন্ত দলের প্রধান জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলমের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় নি।

তদন্ত দলের অপর সদস্য জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহমদ বলেন, তাঁরা তদন্তকালে হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সুনিদিষ্ট আট-দশটি বিষয়ে অনিয়ম ও দূর্নীতির সত্যতা পেয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, সোনাগাজীর শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হিটলারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠায় জেলা অফিস থেকে দুই সদস্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছেন। তদন্ত দলের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শক্রমে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর