রবিবার ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৮:৫১ পিএম


শিক্ষায় ধারাবাহিক মূল্যায়নের পন্থা উদ্ভাবন করলো মাউশি

আফতাব তাজ

প্রকাশিত: ১০:১৮, ৮ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১০:৩১, ৮ অক্টোবর ২০১৯

জাতীয় শিক্ষাক্রমের আলোকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়টিকে ধারাবাহিক মূল্যায়নের একটি পন্থা উদ্ভাবন করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে সারাদেশে স্কুল পর্যায়ে বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলছে। দেশব্যাপী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলমান এই কার্যক্রমের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ । এই ধারাবাহিক মূল্যায়নে দুইটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে এক. এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি, দুই. ভিডিও চিত্র ধারণ। সম্ভাব্য নমুনা প্রশ্নের আলোকে মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য, স্মৃতিচারণ, সাহসিকতার গল্প নিয়ে শিক্ষার্থীরা তৈরি করছে প্রতিবেদন এবং ভিডিও।

কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে একটি ভালো রেজুলেশনের ভিডিও তৈরি করার জন্য যেসব ইনস্ট্রুমেন্ট প্রয়োজন তা বেশির ভাগ স্কুলেই নেই। ফলে তারা মানসম্মতভাবে এ কাজটি করতে পারছেনা। এটি তৈরি করার জন্য অলাদা অর্থও কোথাও থেকে দেয়া হয়নি। ফলে শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীদের নিজ খরচে এ কাজটি করতে হচ্ছে।

কেমন চলছে এই ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম, কিইবা এর উদ্দেশ্য? এসম্পর্কে ধারবাহিক এই মূল্যায়ন পন্থার প্রবক্তা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক `এডুকেশন বাংলা`কে `বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ এই কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের কারিকুলামে থাকা ধারাবাহিক মূল্যায়নের বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে চাই। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধ এই দুটো বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছি। এই দুটো বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা বই বহির্ভূত বাস্তব জ্ঞান লাভের পাশাপাশি আবেগটাও অনুভব করতে পারছে। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরও শাণিত হচ্ছে। আমরা মনে করি এই কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে শিক্ষার্থীদের একটা নিবিঢ় যোগাযোগ স্থাপিত হবে অর্থাত্ দুই প্রজন্মের মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরি হবে। এছাড়াও শিক্ষার্থীরা এলাকার বদ্ধভূমি, রণাঙ্গন অথবা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্নগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারবে। তিনি আরও বলেন এই ভিডিওটি তৈরি করতে তেমন ইন্সট্রুমেন্টেরও প্রয়োজন নেই। একটি ক্যমেরা দিয়েই তা করা সম্ভব।

মহপরিচালক আরও বলেন, আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী। আমাদের সমস্থ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জাতীকে একটা চমত্কার ডকুমেন্টারি উপহার দিতে চাই। এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি শিক্ষার্থীরা খুবই আগ্রহের সাথে কাজগুলো করছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের খুবই অনুপ্রাণিত করছেন। নিজেরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। আশা করছি আমরা সামনের বছর এ কাজটি আরও বিস্তৃত আকারে করতে পারবো।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ শিরোনামে চলমান ধারাবাহিক মূল্যায়নের কাজটা শিক্ষার্থীরা খুব আনন্দঘন পরিবেশেই করছে । এর মাধ্যমে তারা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে সরাসরি শুনতে ও জানতে পারছে। আমাদের কারিকুলামের মধ্যে কিন্তু পরিষ্কারভাবে ধারাবাহিক মূল্যায়নের কথা বলা আছে। কিছু নির্দেশনার মধ্য থেকেই ধারাবাহিক মূল্যায়ন করতে হয়। শিক্ষার্থীর চিন্তন দক্ষতা কিংবা একজন শিক্ষার্থী মানুষ হিসাবে কেমন , সে মানুষকে কতটা শ্রদ্ধা করে, সে দেশকে কতটা ভালোবাসে, সে কতটা দায়িত্বশীল, মানুষের প্রতি সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জায়গাগুলো কিন্তু কখনোই খাতা কলম দিয়ে বিচার করা যায় না। এরজন্য সারা পৃথিবীতেই ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট চালু আছে। আমাদের এখানেও ধারাবাহিক মূল্যায়নটি বহু আগে থেকেই স্কুল বেইজড অ্যাসেসমেন্ট নামে চালু ছিলো। কিন্তু এটা আমরা নিয়মিত করতে পারিনি। এমনকি এর নাম্বারটাও আর কিছুতেই ফাইনাল পরীক্ষার যুক্ত করতে পারিনি।

ধারাবাহিক মূল্যায়নের পর একটা ক্রেডিট যদি শিক্ষার্থীরা ফাইনাল পরীক্ষায় না পায় তাহলে শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী কারোরই এ ব্যাপারে আগ্রহ থাকে না। আমাদের দেশে ফলাফল নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় যা হয়। এখন আমরা ২০ নম্বরের একটি ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট চালাতে চাচ্ছি। বলা যায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ এক ধরনের পাইলটিং। এটির প্রবক্তা আমাদের বর্তমান মহাপরিচালক মহোদয়। তাঁর নির্দেশনা এবং সার্বিক সহযোগিতায় আমরা সারাদেশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের কাজটি সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছি।

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মজয়ন্তী আগামী বছর। বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের মুক্তির জন্য, এদেশের মানুষের জন্য জীবনটা উত্সর্গ করে গেছেন। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব কাছে থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে কিভাবে দেখেছেন, বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন ছিলো সেই স্বপ্নপূরণে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, কিভাবে তিনি যুদ্ধে গেছেন এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সহজেই শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে। বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একজন মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু স্বত:স্ফূর্থভাবেই বলে থাকেন। এই ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আবেগের জায়গার সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এতে করে দেশটাকে আরও কাছে থেকে জানতে পারবে এবং দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ আরও বাড়বে। তাদের জন্য একটা প্রশ্নমালা তৈরি করে দিলেও প্রাসঙ্গিতা বজায় রেখে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধাদের যেকোনো প্রশ্ন করতে পারছে। তবে উপস্থাপন করছে নিজের মতো করেই। একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্পে অনেক সাহসিকতার কথা থাকে, চ্যালেঞ্জের কথা থাকে এবং এগুলো তিনি মন উজাড় করেই বলেন। আমরা তা-ই চেয়েছিলাম। সামগ্রিক আবহটা আমাদের শিক্ষার্থীদের খুব ভালোভাবেই অনুপ্রাণিত করছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরেরর সহকারি পরিচালক ( মাধ্যমিক) মো. আমিনুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ শিরোনামের ধারবাহিক মূল্যায়নের কাজটি এবছর মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে কার্যক্রমটি চালাচ্ছি। ধারাবাহিক মূল্যায়নের এই কার্যক্রমটি বর্তমানে অসাধারণভাবে গতি পেয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এটা করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি। আমরা দেখছি শিক্ষার্থীরা শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাদের মোবাইল, মা-বাবার মোবাইল কিংবা শিক্ষকের মোবাইল ব্যবহার করে খুব ভালোভাবেই প্রতিবেদন ও ভিডিও ধারণের কাজটি করছে। মাঠ পর্যায়ে কাজটা করতে কিছুটা সীমাবদ্ধতা ছিলো তবে শিক্ষার্থীদের গতির কাছে সীমাবদ্ধতা কোনো বাঁধা সৃষ্টি করতে পারেনি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য কোনো নম্বর দেয়া নয়, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করুক। প্রাথমিকভাবে বলতে পারি এক্ষেত্রে আমরা সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

এডুকেশন বাংলা/এজেড



সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর