শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:৪৩ পিএম


শিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক রাজনৈতিক লঙ্কাকান্ড ও আমাদের মাথাব্যথা

সজীব বণিক

প্রকাশিত: ১৬:৩০, ২০ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৭:৫৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯

বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন মারফতে জানতে পারলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান যুবলীগের দায়িত্ব নিতে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এ জন্য নাকি তিনি ভিসির পদ ছাড়তেও রাজি আছেন। এরকম কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের উপাচার্য হয়েও কিভাবে যুবলীগের নেতৃত্বে আসতে চান এ নিয়ে সোশ্যাল যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা। এদিকে আমারও এ নিয়ে তৈরী হয়েছে যত প্রশ্ন! উদ্বেগ হচ্ছে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কেন পদের মর্যাদা রাখতে পারেন না! তবে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে নিচে নামার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন বর্তমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের এক প্রকার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার ধরন দেখে।তার মানে বর্তমানে যারা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের দায়িত্বে আসেন তাদের সকলের উদ্দেশ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন নয় নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যে?

যাক, নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটু বলা যাক, কিসের ভিত্তিতে শিক্ষার পাঠে আজ আমরা অমনোযোগী।

বিশ্ববিদ্যালয় মানে যেখানে ঘিরে সার্বজনীন সংকীর্ণতামুক্ত সামাজিক শিক্ষার উন্মেষ ঘটবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে তৈরি হবে এবং যাঁদের কাজ হবে জ্ঞানবিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করা, আগামী প্রজন্মের জন্যে নতুন কিছু আবিস্কার করা এবং প্রগতির পথে মানবসমাজকে পরিচালিত করা।

কিন্তু বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান নিয়ে আমরা কতোটুকু সন্তোষ্ট? শিক্ষার্থীরাই কতোটুকু শিক্ষা গ্রহণ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে বীক্ষা রচনা ও মানবসমাজকে আলোকিত করছে তা স্বভাবতই আমাদের মাঝে প্রশ্ন জাগে!

অনেকেই জানেনা হয়তো,বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে উপাসনালয়ের একটা সম্পর্ক রয়েছে! যেখানে বিশ্ববীক্ষার সন্ধান এবং বিশ্বজগতের সাথে মানবাত্মার সম্পর্কের দিক নির্দেশনা সম্বলিত গভীর অভিনিবেশ নিয়ে আলোচনা করার কথা।

কিন্তু বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ছাত্র-শিক্ষকের রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যায় তাতে আমরা বুঝতে পারি শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের ভবিষ্যত মেসেজ কি দিতে যাচ্ছি।

তাছাড়া যেখানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভালো ফলাফলের শিক্ষার্থীই গুরুত্ব পাবার কথা সেখানে অনেক সময় অভিযোগ উঠে দলীয় প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে। অন্যদিকে সমণ্বিত ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটা মডেলে দাঁড় না করানোর ফলে একদিকে ক্লাসরুমের গড় মান যেভাবে পড়ে যাচ্ছে তেমনি ভর্তি পরীক্ষা থেকে শিক্ষকদের বাড়তি আয়ের উৎস থাকলেও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির নেই শেষ।

তথা বর্তমান শিক্ষায় কাঠামোগত স্বরূপ বিবর্তনের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অনেকাংশে বিবর্তন লক্ষণীয়।অথচ মধ্যযুগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল সনাতন ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এবং বংশপরম্পরায় সেটাকে অবিচল শ্রদ্ধায় বাঁচিয়ে রাখা। এই রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘ সংগ্রামে যুক্ত থাকতে হয়েছে এবং সময়ে সময়ে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়েছে। কিছুদিন আগে এক লেখকের কলাম পড়েছিলাম ,তিনি লিখেছিলেন ১৮ ও ১৯ শতকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নেতৃত্বের মাধ্যমে শিল্পায়িত সমাজ-বাস্তবতায় সমাজের দৃষ্টিকোণ পাল্টেছে, এনলাইটেনমেন্টের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ধরণও পাল্টেছে। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন করে তৈরী হয়েছে এক প্রকার রাজনৈতিক বলয় যা মানুষকে রাজনৈতিক জীব হিসেবে নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনীতির প্রকৃত শিক্ষা চর্চার বাহিরে গিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রকে করে তুলছে অস্থিতিশীলতায়।

একবার ভেবে দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান যেখানে জীবনযাপনে অর্থপূর্ণে সক্ষম করে তোলার কথা ছিল , অর্থপূর্ণ জীবন কীভাবে অর্জন সম্ভব তা শেখানোর কথা ছিল সেটা আজ কতোটুকু দৃশ্যমান ?

আমরা যদি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রের গতিময়তা লাভ ও আধুনিক সমাজের কথা চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু বিদ্যাশিক্ষার চর্চা অনস্বীকার্য।

কারণ একটা বিশ্ববিদ্যালয় কে ঘিরেই তৈরী হয় ব্যক্তির চিন্তাশিক্ষা এবং নিয়ত জ্ঞানসাধনার মাধ্যমে মানবসমাজ তথা দেশের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিধারার পথ।

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব নিহিত থাকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সত্য অনুসন্ধান ও অভিমুখিতায় যার পুরোটা নির্ভর করে চিন্তা ও মতামতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের উপর। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিন্তা ও মতামতের পূর্ণ স্বাধীনতা কতোটুকু প্রকাশ করতে পারছে তাও নিয়ে উদ্বেগ আছে অনেকের মাঝে।

তাই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল অর্জিত জ্ঞানের সংগ্রহশালা এমন ভাবা মোটেও ঠিক নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সংরক্ষিত জ্ঞানের আলোকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক ।কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা তৈরী হয়েছে পুরোটা রাজনীতির বলয়ে।যেখানে রাজনীতির কারণে বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন কাজে সরকারের বরাদ্দ টাকার টেন্ডার নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মাঝে কিংবা বিরোধীদলের নেতাদের মাঝে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধতে দেখা যায়,দেখা যায় ছাত্র-শিক্ষক কিংবা ছাত্র-ছাত্র বা ক্ষমতাসীন দলগুলো নিজেদের মাঝে দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটাতে।অতএব এমন অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে পড়াশোনার চর্চা কতোটুকু হচ্ছে কিংবা ছাত্র-শিক্ষক ক্লাসে কতোটুকু মনোযোগী তা বলা বোধগম্য নয়।

আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কটের কারণে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়। ফলে সাধারণ ছাত্রের ওপর ছাত্র সংগঠনগুলোর চলে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ।তাই সেখানে দেখা যায়,বিভিন্ন টর্চারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অসামাজিক ও নেতাদের স্বার্থে কাজ করতে বাধ্য করছে যা কখনোই আদর্শ রাজনীতির চর্চা হতে পারেনা।

অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কটের কারণে গণরুম ও গেস্টরুমে বসবাসের ও অধ্যয়নের ন্যুনতম পরিবেশ নেই ফলে শিক্ষার্থীদের উদার ও মুক্তচিন্তায় বিকশিত হবার পথে বাধাস্বরূপ প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।

অন্যদিকে শিক্ষক রাজনীতিও শিক্ষা ব্যবস্থাকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে । শিক্ষক হবেন সামাজিক মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দৃষ্টিভঙ্গিতে নৈর্বক্তিক ও প্রসারিত, স্বপ্নে উদার এবং সঞ্চারী, প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় এবং উন্নত, কর্মে দক্ষ এবং সাধক ও সর্বোপরি বৃহৎ মানবসমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। একজন শিক্ষকের মধ্যে এই গুণাবলির সমন্বয় ঘটলে তিনি শিক্ষার্থীর হৃদয় ও চিন্তায় দীর্ঘকালীন ছাপ রাখতে পারেন। এটি শিক্ষার্থীর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ন্যায়নিষ্ঠতার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় ,শিক্ষকদের পড়ার মান নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সমালোচনা।

পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা না থাকায় শিক্ষকেরা যুক্ত হচ্ছেন রাজনীতিতে। ফলে গড়ে তুলেছে সাদা,নীল দল। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট ও পাঠদানের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা ও জবাবদিহিতা না থাকার কারনে উচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকেরা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না করিয়ে অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও সান্ধ্যকালীন কোর্সে সময় দিয়ে শিক্ষার্থীদের সেশন জটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের তো বিশ্ববিদ্যালয় তার কারিকুলাম চাপিয়ে দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্য ঐ শিক্ষার্থীর পছন্দের জায়গা খুঁজে বের করে সে মাপে তার বিকাশের ব্যবস্থা করা। মূলত এ ব্যবস্থা না থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্লাসে কিছু শিখতে পারছে না তেমনি ভালো কাজে উৎসাহ পাচ্ছে না।

তাছাড়া আমরা অনেক সময় লক্ষ্য করি, যেকোনো প্রকার গবেষণায় অনুদান প্রাপ্তিতে দলগত পরিচয়ের অভিযোগ উঠতে। যা শিক্ষা ও গবেষনার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অশনি সংকেত। তাই পলিটিক্যাল লেয়াজু না করার ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় পেশায় আসতে না পারার কারণে যারা রাজনৈতিক লবিং এ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন তারাই ক্লাস ও গবেষণায় সময় না দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তোষামোদে ব্যস্ত থাকেন । ফলে প্রকৃত শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। অতএব এসব বন্ধ না করলে দেশের শিক্ষা হয়ে উঠবে অপরাজনীতির বলয়ে। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের জীবনে হতাশা, উত্তেজনা, আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা সঠিকবিদ্যাচর্চার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের ফেরাতে না পারলে ক্লাসের শিক্ষার মান নেমে যাবে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত যা শিক্ষার্থীদের যেকোনো ধরনের চাহিদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এবার সারাংশে যদি বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি সারা বছর রাজনীতি চলে তাহলে শিক্ষার মান বাড়বে কিভাবে! আমিও চাই সবকিছু সমান তালে চলতে হবে কিন্তু শিক্ষার মাঝে যদি রাজনৈতিক বলয় তৈরী হয় তাহলে তো ক্ষমতার অপব্যবহার হবেই সবসময়। আর যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সারা বছর রাজনীতিক অস্থিতিশীলতায় ডুবে থাকে তাহলে শ্রমজীবী, মুটে, মজুর, কুলির ছেড়া পকেটের পয়সা কেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যয় করার যৌক্তিকতা কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভাবা উচিত, এমন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরী করার কারখানা নয়। আর যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরী করার কারখানা হয় তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্বশাসিত বলা হয় কেন? রাষ্ট্র নিজেই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে । অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকের রাজনৈতিক দাপট কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত রেখে সব ধরণের কার্যক্রমের সুবিধা দেয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

বার্তা প্রেরকঃ সজীব বণিক

শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস প্রতিবেদক,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর