মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০:২০ এএম


শিক্ষাপঞ্জির ক্ষতি পোষাতে ব্যবস্থা নিন

অধ্যাপক ম. হালিম

প্রকাশিত: ১২:১৬, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০  

করোনাকালীন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বার্ষিক শিক্ষাপঞ্জি এ দুঃসময়ের আঘাতে এলেমেলো হয়ে গেছে। এর ফলে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শিক্ষার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা সংকটে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আমাদেরও জরুরি ভিত্তিতে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ৩ অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত ছয় মাস আঠারো দিন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাঙ্গনের বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও সরকার অনলাইন টিভি ক্লাস এবং ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে; তথাপি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশই সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারেনি। বাংলাদেশের পরিবেশ ও অবস্থানগত কারণে তা সম্ভবও নয়।

আজ বা কাল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে হবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপঞ্জিতে আবার ফিরে যেতে হবে। যতটা পারি ক্ষতি পূরণ করতে হবে। তার আগে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারব। স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মানতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অবশ্য নীতিমালা ঘোষণা করে পূর্বাহেপ্তই অভিভাবকদের জানাতে হবে। এক. সব ছাত্র-ছাত্রীকে অবশ্য মাস্ক পরে স্কুলে আসতে হবে। দুই. স্কুলে ঢুকলেই তাদের দেহের তাপমাত্রা মাপতে হবে। স্বাভাবিকের চেয়ে গায়ে বেশি তাপমাত্রা ও হালকা ঠাণ্ডা-কাশি থাকলেই তার অভিভাবককে ডেকে বাড়ি পাঠাতে হবে। তিন. শ্রেণি শিক্ষক প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে হাত ধুয়ে ক্লাসে ঢোকাবেন! এর জন্য প্রতিষ্ঠানপ্রধান স্কুলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখবেন। তার আগে ক্লাস রুমগুলো ভালো করে পরিস্কার করতে হবে। বেঞ্চ-টেবিল স্প্রে করাতে হবে। শিক্ষকমণ্ডলী এসব কিছু বাস্তবায়ন করেই পাঠদানে অংশ নেবেন। তাদের মনে রাখতে হবে, হাজার হাজার অভিভাবক তার সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠাবেন, তাদের সুস্থভাবে গড়ে তোলা ও শিক্ষার সব সুযোগ প্রদান আপনাদের পবিত্র দায়িত্ব।

শিক্ষাবর্ষের ৩৬৫ দিনের সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য ছুটি এবং পরীক্ষার দিনগুলো বাদে সময় হিসাব করে কারিকুলাম বোর্ড সিলেবাস ও বইপুস্তক প্রণয়ন করে। কিন্তু এ বছর করোনার আক্রমণ ছয় সাত মাস সময় কেড়ে নিয়েছে। তাই সময়ের স্বল্পতায় সিলেবাস অবশ্যই কমাতে হবে। সব বিষয়ের সিলেবাস কাটছাঁট করা গেলেও ইংরেজি বিষয়ের গ্রামার শিক্ষায় মাঝখানে গ্যাপ রেখে তা স্বল্প সময়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সত্যিই খুব কঠিন। তবু শিক্ষকদের সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সুধীজনের অনেকেই বলছেন, বর্তমান শিক্ষাবর্ষকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করা হোক এবং পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ দশ মাস করা হোক। এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে কাটছাঁট সিলেবাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জ্ঞান শিক্ষার্থীরা অধিক গ্রহণ করতে পারবে। পরবর্তী ক্লাসে তা অধিক সহায়ক হবে! তবে সময় যতই বাড়ানো হোক না কেন, বোর্ড নির্ধারিত পরিপূর্ণ সিলেবাস পড়ানো এ শিক্ষাবর্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবার পিইসি বা ইবতেদায়ি পরীক্ষা এবং জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। অভিভাবক-শিক্ষার্থী-শিক্ষক এজন্য স্বস্তির মধ্যে আছেন; কারণ পরীক্ষাগুলোতে এ প্লাস পাওয়ার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষকরা কোমলমতি শিশুদের ওপর পড়াশোনার যে চাপ প্রয়োগ করে দিন-রাত প্রাইভেট কোচিংয়ে যেতে শিশুদের বাধ্য করে তা আপাতত হচ্ছে না। এ চাপে তাদের মেধার বিকাশ না ঘটে ক্ষতিই হয়। তাই স্বাভাবিক নিয়মে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার স্বল্প সিলেবাস সম্পূর্ণ করে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মাসিক পরীক্ষার মাধ্যমে কম চাপে মেধা মূল্যায়ন করে রেকর্ড রাখতে হবে। পিইসি-জেএসসি সমাপনী পরীক্ষায় যেসব বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হতো, সেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে যার যার বিদ্যালয়ে পরীক্ষা নেবে। এ পরীক্ষা ৫০ নম্বরের নেওয়া যেতে পারে। তবে আগের মতো এমসিকিউ বাদ দিয়ে এককথায় উত্তর পদ্ধতি চালু করলে শিক্ষার মান বাড়বে।

এইচএসসির শিক্ষার্থীরা গত এপ্রিল থেকে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার জন্য বাসায় বসে আছে। করোনায় তাদের জীবন স্থবির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। তবু ধৈর্য ধারণ করতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী ও সচিব মহোদয় বারবার বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পনেরো দিন পরই পরীক্ষা শুরু হবে। তবে তার আগে শিক্ষা বোর্ডকে অবশ্যই প্রতিটি কেন্দ্রের উপকেন্দ্র বাড়াতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পরীক্ষা গ্রহণে প্রতিটি কেন্দ্র সচিবকে দায়িত্ববান হতে হবে। পরীক্ষার সময় দেড় মাস কোনোক্রমেই কাম্য নয়। পরীক্ষার রুটিন নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।

করোনার দুর্যোগ কেটে যাবে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আবার হাসি-আনন্দে ক্লাসে স্বাভাবিক পাঠে মনোযোগী হবে। এই কঠিন সময়ে দেশের গুণী শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবক তাদের মতামত জানিয়ে শিক্ষাপঞ্জি বাস্তবায়নে যথার্থ ভূমিকা রাখবেন। আজ আমাদের এটাই প্রত্যাশা।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর