শনিবার ০৪ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩১ পিএম


শিক্ষানীতি নাকি চূড়ান্ত,নীতির অপনীতিগুলো কার স্বার্থ রক্ষা করবে?

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সরকার

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১০:৪৭, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আমি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সরকার। আঠারো বছর শিক্ষকতা করি কলেজে। কলেজ শিক্ষক নামেই পরিচিত। পদবি প্রভাষক। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবন্ধুরা প্রায় সবাই অধ্যাপক; আমি প্রভাষক। সুতরাং বেতনভাতাদির বিষয়ে অন্য কোনো প্রশ্ন এখানে না টানাই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফল নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছি একটা মোহে। প্রাইভেট পড়াতে নয়, প্রাইভেট টিউশনি করতেও নয়। মোহ ভাঙলে দেখি সময় শেষ। এখন শিক্ষকতা না করলে বড়জোড় দোকানি হতে পারি, সাংবাদিকতা করতে পারি, লেখালেখি করতে পারি। শেষোক্ত দুটি করতে গেলে সংসার থাকবে না। যদি সত্যিকার সাংবাদিকতা করি, তাহলে জীবনও থাকবে না। তাহলে কী করবো?

একটি বড়ো সংসার টানতে গিয়ে তাহলে আমাকে শিক্ষকতার পাশাপাশি কী করতে বলবে সরকার?
স্তরবিন্যাসটি কবে ঠিক হবে সেটা সরকারও বলতে পারবে না। সরকার মনে হয় দিশেহারা হয়েছে বিশাল উন্নয়ন বাজেট দিয়ে। সরকারের ভেতরে-বাইরে এতোদিন ছিল বড়ো বড়ো, চোর, চামচা, ধড়িবাজ। এখন ডাকাত, ছিনতাই, হন্তারক। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে দেশ উন্নয়ন একটি বড়ো বাধা। স্তর তিনটি থাকলে ক্ষতি কী ছিল? চারটি কেন? অবকাঠামোগত সমস্যা? ২০১০ সালে সেটা বুঝে কাজটি করতে গেলেন না কেন?

অবশ্য, আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও এমন দশা দেখেছিলাম। তিনটি ব্রিজ ছিল দুই লেনের আর মহাসড়ক চারলেন। বাহ্! কী চমৎকার দৌড় প্রতিযোগিতা! এক জায়গায় এসে একেবারে স্থির।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও যে দৌড় প্রতিযোগিতায় সরকার নামছে বা তার চেলা-চামুণ্ডাদের নামাচ্ছে তাতে করে সেই মহাসড়ক ও ব্রিজের মতোই হয়ে যাবে কিনা ভাবার বিষয় আছে।

প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি সরকার করে দিবে। সরকারের এখতিয়ার আছে জানি, সক্ষমতা নেই, সক্ষমতা নেই এবং সক্ষমতা নেই। খুব জোর দিয়ে কথাটি বলছি এই কারণে যে, সেনাছাউনিতে পরিচালিত বা সেনা, বিমান, নৌ, পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে সরকার কিছুই করতে পারছে না। পারবেও না। কারণ, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের আপন পুত্র। এযাবৎ যতগুলো শিক্ষাবিধি, নীত বা প্রবিধান হয়েছে, তার কোনোটাই মানেনি সেনানিবাসের কোনো প্রতিষ্ঠান। সরকার কী করতে পেরেছেন তাদেরকে?

নোট-গাইড নাকি এখনো বাজারে নেই। দাবিটি হচ্ছে পুস্তক ব্যবসায়ী ও প্রকাশকদের। এগুলেঅর নাম এখন সহায়ক বই। দারুণ ব্যবস্থা! আপনি তাদের বিরুদ্ধে যাবেন, যান। আমরা দেখবো আপনাদের সক্ষমতা। আপনার সরকারি দপ্তর, পরিদপ্তর, অধিদপ্তর কিংবা সংস্থায় যখন ঘুষ লেন-দেন হয় তখন কি প্রকাশ্যে হয় কোনোটা? প্রকল্পের টাকা বাটোয়ারা করে খাওয়ারও সিস্টেম রপ্ত আছে সরকারি মানুষের। কাজ পাইয়ে দিতে গিয়ে কাগজ প্রস্তুত করার কাজটি বৈধভাবেই হয়! হয় বুঝি? অনেক পুরানো কথা হলো গাইড নিষিদ্ধ হচ্ছে।

এবার আসি প্রাইভেট টিউশনির কথায়। বিষয়টি একেবারেই গোলমেলে। নীতিতে নাকি বলা হয়েছে কোনো শিক্ষক তার প্রতিষ্ঠানের কোনো ছাত্রকে পড়াতে পারবে না। শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি হয়তো কোথাও কোথাও বাধ্য করার বিষয় আছে। সেখানে দেখভাল না করে সবার জন্য নিষিদ্ধ হলে ফল কি আসলেই ভালো হবে?

যারা শিক্ষক নন, তারা পড়াতে পারবেন। এটা কোন নীতিতে পড়ে? প্রশ্নটা তো আমার মতো লাখ শিক্ষকের হওয়া জরুরি। বন্ধ মানে তোমার জন্য হলে আমার জন্যও। তুমি পড়াবে আমি পারবো না এই নীতিটি ঠিক হতে পারে না। আইন বিধি যাই করুন, দরকার ছিল শিক্ষাকে বাঁচানো, শিক্ষকদের বাঁচানো। আগে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ দিন। আমি নিশ্চিত করে বলছি, পেটে ক্ষিধা নিয়ে, নিজের সন্তানকে সরকারি প্রাইমারিতে পড়িয়ে, পিতা-মাতাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে কোনো শিক্ষক ভালো করে পাঠদান করতে পারেন না। পারা উচিতও নয়।

সরকার যদি ভাবেন, জাতি ভালো শিক্ষিত হলে আপনার বা আপনাদের শক্তির ভীত নড়বড়ে হবে, যত বোকাশিক্ষিত করা যায়, ততই ভালো তাহলে আমার কোনো কথা নেই প্রস্তাবও নেই।

আমার মনে হয় একটা মহামারী দেশে দেখা দিলে সরকার বুঝবে অনলাইনেও শিক্ষার দরকার আছে। আপনারা মনে হয় শুনেছেন, চীনেরউহান প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ। কিন্তু ক্লাস হয় অনলাইনে। আমার কলেজে ২৭০০ ছাত্রীর মানসিক সক্ষমতা এক নয়। ওরা হয় অপলাইনে নয় অনলাইনে পড়বে। শিক্ষকের কাছে অনলাইনে পড়লে কোন ধরনের ক্ষতি হবে, সে বিষয়টি সরকার স্পষ্ট করেছে কিনা আমি জানি না। যদি না কের থাকেন তাহলে অবশ্যই ষ্পষ্ট করতে হবে।
মনে রাখা দরকার- গরু দিয়ে হাল চাষ হয় বা হতো, ছাগল দিয়ে নয়। এখন আর গরুকে দিয়ে সেই কষ্টটি করানো হয় না।

আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি গরুর সীমাহীন কষ্টকে লাঘব করেছে। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকবে, কোনো শিক্ষকের থাকবে না অশিক্ষকদের থাকবে সেটা দেয়া যেতে পারে না। আসুন, যৌক্তিকভাবে শিক্ষানীতির অপদিকগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। সরকারকে আঙুল দিয়ে দেখাই, অশিক্ষকদের স্বার্থ সরকার কেন রক্ষা করতে যাচ্ছে-তার কারণ অনুসন্ধান করি, সেখানে যদি নীতিহীনতা থাকে বা বিশাল লেনদেন থাকে তাহলে শিক্ষা বাঁচানোর আন্দোলন করি।

সম্পাদক, রূপসী বাংলা নিউজ ডট কম


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর