সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ৩:৫০ এএম


শিক্ষকদের প্রত্যাশা বেতন বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা

মো: নজরুল ইসলাম রনি

প্রকাশিত: ২০:১৬, ৪ অক্টোবর ২০১৯  

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ৫ অক্টোবর। শিক্ষকঃ সুন্দর বিশ্ব বিনির্মাণের প্রবক্তা । এই দিবসটি শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের দিন এবং শিক্ষক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শুভক্ষণ। অবজ্ঞা-অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিবছর দিবসটি আলো-আঁধারে সিক্ত হয়ে চলেছে। ৫ আক্টোবর ফিরে এলে প্রতিবছর আমারা প্রত্যাশার প্রহর গুণি। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ প্রতিবছর পালন কর হয় “বিশ্ব শিক্ষক দিবস”। শিক্ষকতা এক মহান পেশা। পৃথিবীর সকল দেশের শিক্ষক সমাজের নিকট এদিন অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশিদিন আগের নয়।

১৯৯৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন “এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল” (Education International) গঠিত হয়, এ আন্তর্জাতিক সংগঠন জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার অর্থবহ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ক্রমাগত অনুরোধ ও আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গ্রহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর মহা-পরিচালক ড.ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর “বিশ্ব শিক্ষক দিবস” পালনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।

১৯৯৪ সালের পর থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই যথাযোগ্য মর্যাদায় “বিশ্ব শিক্ষক দিবস” পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কিত সাফল্যকে সমুন্নত রাখাসহ আরো সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর থেকে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে এই দিবসটি যথারীতি পালিত হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগি ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভুমিকা রাখে। দিবসটি উপলক্ষে ইআই প্রতিবছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে যা জনসচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এ দিবসটি পালনে সরকারিভাবে তেমন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি এবং এদিনটিতে কোন সরকারী ছুটি নেই। ফলে শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে।

শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়, একটি মহান ব্রত । ব্রতচারী মনোভাব নিয়ে শিক্ষকগন নিরক্ষকে সাক্ষর এবং শিক্ষিত করে তোলেন বলেই তাদেরকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। আমরা শিক্ষক সরল জীবন যাপন এবং মহৎ চিন্তা বুকে পোষন করেই এ পেশাকে বেছে নিয়েছি। আমরা গভীর ভাবে বিশ্বাস করি ‘‘Quality Teachers For Quality Education”


বাংলাদেশে দুটি ধারায় শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে আসছে। একটি সরকারী অন্যটি বেসরকারী। বেসরকারী শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় ৯৮ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা বেসরকারী পর্যায়ে প্রায় ৫ লাখ। প্রতিবার “বিশ্ব শিক্ষক দিবসের” এই দিনে শিক্ষকদের দুঃখ গাঁথা জীবনী- লেখনী কিংবা র‌্যালীর মাধ্যমে কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হলেও সহসা পরিবর্তন হচ্ছে না কিছুই। দেশে প্রায় ৩৭ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে। এটি ভাল উদ্যোগ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এজন্য ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে জাতীয়করণে শিক্ষক সমাজে চরম ক্ষোভ ও অন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সর্বশেষ বেশ কয়েকটি সংগঠন নিয়ে আমরা “এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াঁজো ফোরামের” ব্যানারে গত বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তীব্র শীতে হাজার হাজার শিক্ষক প্রথম দশদিন “অবস্থান ধর্মঘট” এবং পরের দশদিন “আমরণ অনশনে” ছিলাম চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে। পরবর্তীতে ২৯ জানুয়ারি ২০১৮ সরকারের পক্ষ থেকে ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং তারই প্রেক্ষিতে পরে বিলম্ব হলেও বাস্তবায়ন হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একইসাথে স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথম বৈশাখী ভাতাও প্রদান করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কিন্তু বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডে আজ ৬ শতাংশের পরিবর্তে অতিরিক্ত ৪ শতাংশসহ মোট ১০ শতাংশ কর্তন করায় শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এতে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। অবিলম্বে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডে শিক্ষকদের বেতনের অতিরিক্ত কর্তন বন্ধসহ টাকা কর্তনের বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি। আমাদের বিশ্বাস তিনি শীঘ্রই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-বৈষম্য দূরকরতঃ সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে জাতীয়করণ ঘোষণা দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবেন।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ও মুখপাত্র , এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াঁজো ফোরাম।
প্রধান শিক্ষক, মীরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুল

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর