শনিবার ৩০ মে, ২০২০ ১৫:১৪ পিএম


শিক্ষকদের ত্রাণ বিতরণ এবং কিছু বাস্তবতা

প্রকাশিত: ১৬:৩৪, ১৬ এপ্রিল ২০২০  

চলমান সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই কিছুদিন বৈশাখী ভাতা বা একদিনের বেতন সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার পক্ষে বিপক্ষে কিছু শিক্ষক সোস্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ( আমি নিজেও পক্ষে ছিলাম)। অবশেষে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে বৈশাখী ভাতার ২০% কেটে নিয়ে সেই স্যাপ্টার ক্লোজ করেছেন। ইদানিং নতুন করে ত্রান বিতরণ কাজে পুরুষ শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার দাবি নিয়ে কিছু শিক্ষকবন্ধুকে আবারো সোস্যাল মিডিয়ায় সরব হতে দেখেছি।

দেখা যাচ্ছে অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতি আঁচ না করে শুধুমাত্র আবেগের ঠেলায় বা নিজেকে অতি সৎ কিংবা অতি মানবিক হিসেবে জাহির করার জন্য ত্রান বিতরণে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার জন্য সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। যার ফলস্রুতিতে সুনামগঞ্জ জেলার চাতক উপজেলার পুরুষ শিক্ষকদের তালিকা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট প্রেরণের চিঠিও অনেক শিক্ষকের নজরে এসেছে নিশ্চয়। ত্রান বিতরণের মতো মহতী এবং মানবিক কাজে সম্পৃক্ত থাকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু এখানে সমস্যাও আছে।

বাংলাদেশের সব এলাকার পরিবেশ পরিস্থিতি এবং মানুষের মন মানসিকতা এক নয়। আবার সব শিক্ষকের কর্মস্থল নিজ এলাকায় নয়। আমার কর্মস্থলে দেখেছি, কোটি টাকার সম্পদের মালিক এবং মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করে এমন মানুষও ত্রানের জন্য লাইন ধরে। কয়েক দিন আগেও একটি বেসরকারি সংস্থার ত্রান বিতরণের সময় মারামারি করে চারজন গুরুতর আহত হয়েছে। জনরোষ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চেয়ারম্যান মেম্বার ত্রানসামগ্রী ফেলে কৌশলে এলাকা ত্যাগ করেছেন। আমি ১০০ টাকা উপবৃত্তি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা একজন সম্মানিত প্রধান শিক্ষককে মারার জন্য জুতা হাতে নিয়ে ধাওয়া করতে দেখেছি।

বেচারা প্রধান শিক্ষক ম্যারাথন দৌড়ে হাটু সমান কাঁদা মাড়িয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারলেও সম্মান বাঁচেনি (ঘটনাটি সম্ভবত ২০১১ সালের এবং আমারই উপজেলার অন্য একটি ক্যাচমেন্ট এলাকার)। এমন পরিস্থিতিতে গুটিকয়েক মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রানসামগ্রী বিতরণ করা একজন শিক্ষকের জন্য কতটা কঠিন হবে একটু ভেবে দেখুন। যদি শতভাগ মানুষ ত্রান না পায় তাহলে সমস্ত জনরোষের কবলে পড়বে তালিকা প্রনয়নকারী নিরীহ শিক্ষক বেচারা। যেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় টুকানো অযুহাতে শিক্ষক লাঞ্চনার খবর আসে। সেখানে ত্রানসামগ্রী বিতরণ করার মত (মানবিক কিন্তু ঝুঁকিপুর্ণ) কাজে শিক্ষকদের ব্যবহার করে তাঁদের জন্য পেশাগত ঝুঁকি তৈরি করা আদৌও উচিত হবে কি? বাংলাদেশের প্রায় ৬২ হাজার জনপ্রতিনিধি আছে। তাঁরা সবাই কিন্তু চোর নয় এবং তাঁরা জনগণের ভোটেই জনগণের সেবার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ।

 মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ প্রকৃতির জন প্রতিনিধির কারণে তাঁদের সবার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আজকে চারদিকে জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের কাছে ত্রান চোর হিসেবে ধিকৃত হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা ত্রান চুরি করলে সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে এবং নিচ্ছেনও (গতকালও নয় জন বরখাস্ত হয়েছে)। আমরা কেন তাদের কাজে উপযাচক হয়ে হাত দেব? আমাদের শিক্ষকরা সবাই ফেরেস্তা এটা হলফ করে বলার সুযোগ আমার আপনার কারো কি আছে? কেউ কেউ নিজেদের নিরপেক্ষ দাবী করছি।

বাস্তবে আমরা কতটুকু নিরপেক্ষ? যদি আমরা শতভাগ নিরপেক্ষ হই তাহলে পরীক্ষার উত্তরপত্রে নাম্বার দেওয়া নিয়ে কেন এত প্রশ্ন উঠে? সামষ্টিক মুল্যায়ন পদ্ধতি এবং নৈর্ব্যক্তিক অভিক্ষা এখনো তুলে দেওয়া হচ্ছে না কেন? এক উপজেলার সমাপনী পরীক্ষার খাতা অন্য উপজেলায় মুল্যায়ন করতে হয় কেন? আমি আশংকা করছি যে, শিক্ষকদের দ্বারা ত্রানসামগ্রী বিতরণ করাতে গিয়ে যদি দুয়েকজন ব্যতিক্রম কিছু ঘটান (ত্রান আত্মসাৎ করেন) তখন শিক্ষকদের মান সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে একটু চিন্তা করুন। সোস্যাল মিডিয়ায় এসব পোস্ট দেওয়ার আগে সব শিক্ষকের কথা একবার ভাবুন। আপনার প্রস্তাবের পক্ষে সকল শিক্ষকের সম্মতি থাকবে কিনা একবার চিন্তা করুন। শিক্ষকরা সারা বছরই নানাবিধ অপেশাধার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এবার একটু ক্ষান্ত দিন, প্লিজ।

(কপিঃ Nur Mohammed স্যারের টাইম লাইন থেকে)

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর