মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২০:১৯ পিএম


শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন সময়ের দাবি

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার

প্রকাশিত: ০৯:৫৮, ২২ জুলাই ২০১৮  

ওইসিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী (২৫ জুন ২০১৩), আমেরিকায় একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন ৩৭,৫৯৫ ডলার বেতনে। ১৫ বছর চাকরি করার পর ওই শিক্ষকের বেতন হয় ৪৬,১৩০ ডলার। তিনি সর্বোচ্চ ৫৩,১৮০ ডলার বেতন পেতে পারেন। দি ইউনাইটেড স্টেটস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের (বিএলএস) তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের গড় বেতন ৫৩,১৫০ ডলার। আমেরিকার মাথাপিছু আয় ও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের বিরাট পার্থক্য থাকায় আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের তুলনা যৌক্তিক নয়, একথা ঠিক। তবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে আমেরিকার মতো আমাদেরও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বহুগুণ এগিয়ে রয়েছে। উইকি অ্যানসার ডটকমের মতে, ভারতে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসে বিশ হাজার রুপি সম্মানী পান। ভারতের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকিছু মিলে মাসে তাদের মাথাপিছু সম্মানী দাঁড়ায় ২৬,২৯২ রুপি। যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বেতন ৬ হাজার ৪০০ টাকা (গ্রেড ১১) ও প্রশিক্ষণবিহীনরা ৫ হাজার ৯০০ টাকা (গ্রেড ১২) বেতন পান। অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকের বেতন ৫ হাজার ২০০ টাকা (গ্রেড ১৪) এবং প্রশিক্ষণ নেই এমন সহকারী শিক্ষকরা ৪ হাজার ৯০০ টাকা (গ্রেড ১৫) বেতনে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন

তিন. ১৯৭৩ সালে সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের সরকারের পক্ষ থেকে বেতন-ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে নানাক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও তিনি এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা প্রাথমিক শিক্ষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও সারা দেশে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সম্মান ও সম্মানী এবং সহকারী শিক্ষকদের সম্মানী বাড়িয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবতার নিরিখে প্রাথমিক শিক্ষকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থার অবসানে যথেষ্ট নয়। বর্তমান পে-কমিশনের প্রতিবেদন এ অবস্থার অবসানে কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। প্রায় সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষক ও অর্ধ লাখ প্রধান শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি প্রায় সমসংখ্যক পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট আদৌ দূর করতে পারবে কি-না, এমন আশংকা তাদের চোখে-মুখে।
চার. জাতিসংঘের ইউনেস্কো ও আইএলওর যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে রেকম্যান্ডেশন কনর্সানিং দ্য স্ট্যাটাস অব টিচারস প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা মানুষের সব পর্যায়ে ব্যক্তিত্ব বিকাশে সরাসরি ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণ দিতে গিয়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, রাষ্ট্রের জাতি গঠনে প্রাথমিক শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের পিতাই কেবল একক পিতৃত্বের দাবিদার হতে পারেন না। একটি শিশুকে যিনি প্রাথমিক জ্ঞান, শিক্ষা দিয়ে মানুষ করে তোলেন তার দান কোনো অংশেই কম নয় (শারমিন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা, ঐতিহ্য, ২০১৪, পৃ. ১৪৬)। প্যারিস সম্মেলন পঠিত প্রবন্ধ ও তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্যে প্রায় একই সুর বেজেছে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত দর্শনের বাস্তব রূপ আজও অধরা থেকে গেছে। আমরা এখনও প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে পারিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সম্পর্কেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আমেরিকা, ইউরোপ, ভারতসহ প্রায় প্রতিটি দেশ তাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চ বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ওই পেশায় নিযুক্ত হতে উৎসাহিত করছে। সত্যিকার অর্থে একজন উচ্চমানের কারিগরের পক্ষেই একটি উচ্চমানের শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একজন মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করতে পারে। আর মেধাবী শিক্ষার্থীরা তখনই শিক্ষকতায় আসবে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আগ্রহী হবে; যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চপর্যায়ের সম্মান ও সম্মানী প্রদান করা হবে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়টি বহু আগে উপলব্ধি করেছে বলেই তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের থেকে বহু এগিয়ে রয়েছে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমেরিকা বা ইউরোপের মতো উৎপাদনমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাইলে এখনই সরকারকে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ শিক্ষায় অগ্রগামী দেশগুলোকে অনুসরণ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে। আমেরিকা অথবা ইউরোপের মতো না হোক, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী প্রদান করতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর