মঙ্গলবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:৩২ পিএম

Sonargaon University Dhaka Bangladesh
University of Global Village (UGV)

শিক্ষকতার বাইরে থেকেও তারা অধ্যাপক হলেন!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:৪৭, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ০৮:৪৮, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য। সে হিসেবে কালাচাঁদ শীলের সরকারি কলেজে দর্শনের শিক্ষকতা করার কথা। তবে প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি পাঠদানের বাইরে রয়েছেন। এ সময় তিনি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) উপপরিচালক পদে কাজ করেছেন। অর্ধযুগ শিক্ষকতার বাইরে থাকলেও গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হয়েছেন। উল্লেখ্য, নায়েমের উপপরিচালক (প্রশাসন) ড. শাহেদুর রহমানও শিক্ষকতার বাইরে রয়েছেন প্রায় পাঁচ বছর।

এই দু`জনের মতো বিভিন্ন সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে যান না। তদবির আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর তারা প্রেষণে, অথবা প্রেষণ বহির্ভূত পদে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নির্বিঘ্নে চাকরি করছেন। পদোন্নতির যোগ্য হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো ক্লাসরুমে পাঠদানের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অথচ খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই এই শর্ত মানছে না। পদোন্নতি পাওয়া এমন আরেকজন শিক্ষক ড. মাহবুবা ইসলাম পাতা। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য হিসেবে তার মূল পদ সরকারি কলেজের শিক্ষক। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মনিটরিং উইংয়ে উপপরিচালক পদে। উদ্ভিদবিদ্যার এই শিক্ষক চাকরি জীবনে এক বছরেরও কম সময় কলেজে কাজ করেছেন। তবে একদিনও ক্লাসে যাননি। এর পরও তিনি সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন গত ১০ সেপ্টেম্বর। বিসিএস ১৪তম ব্যাচের এ শিক্ষক চাকরির শুরুর দিকে একটি সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে কিছুদিন কাটালেও ১৯৯৮ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি হয়ে আসেন। মাঝখানে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য ছুটিতেও ছিলেন। ২০০১ সালের পর মাউশির সহকারী পরিচালক পদ দিয়ে শুরু করে বর্তমানে উপপরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। একই উইংয়ে ১৭ বছর চাকরি করে শিক্ষা প্রশাসনে তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকার রেকর্ড গড়েছেন।

একই অবস্থা মাউশির আরেক উপপরিচালক খুরশিদ আলমের। তিনিও চাকরি জীবনে কলেজে না পড়িয়ে ২০০৩ সাল থেকে শিক্ষা ভবনে আছেন। অর্থনীতির এ শিক্ষক অধ্যাপক পদে পদোন্নতিও পেয়েছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী ২০০৯ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। অর্থনীতির এই শিক্ষকও সম্প্রতি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক বাংলার শিক্ষক মো. আবুল বাশার এবং ডিআইএ থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া ব্যবস্থাপনার শিক্ষক রাশেদুজ্জামানও প্রায় সাড়ে নয় বছর ক্লাস রুমের বাইরে থাকলেও `বঞ্চিত` হননি পদোন্নতি থেকে।

মাউশি অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিভাগের উপপরিচালক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার ২০০৯ সালে ঢাকা বোর্ডে উপসচিব হিসেবে পদায়ন পান। এরপর ২০১৩ সালে মাউশি অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে তিনি উপপরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুল আলম প্রামাণিকের একান্ত সচিব ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে নায়েমে কাজ করছেন উপপরিচালক রিয়াদ চৌধুরী। সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামানও পাঁচ বছরের বেশি ক্লাসরুমের বাইরে। মাউশি অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আবুল কাশেম ২০০৪ সাল থেকে ও সহকারী পরিচালক (শারীরিক শিক্ষা) মো. সাইফুল ইসলাম রয়েছেন ২০০৫ সাল থেকে। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার অবশ্য সমকালকে বলেন, তিনি মাউশিতে থাকতে চান না। তাকে অন্য কোথাও পদায়ন করা হলে তিনি চলে যাবেন।

চার থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত ঘুরেফিরে যেসব কর্মকর্তা ক্লাসরুমের বাইরে চাকরি করছেন, তাদের মধ্যে আরও রয়েছেন- নায়েমের প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ এসএম রবিউল ইসলাম, সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ আলী, শায়েলা পারভীন, সায়েমা রহমান, আসমা আক্তার খাতুন, স্বপন কুমার নাথ, সাবিহা ইয়াসমিন ও সাহিদা সুলতানা।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুল (বিএসআর) ১৯৮১-এর ৫, ৬ ও ৭ বিধি অনুযায়ী, শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপকে পদোন্নতির জন্য পাঁচ বছর, সহযোগী অধ্যাপকের জন্য তিন বছর এবং অধ্যাপক পদের জন্য দুই বছর অর্থাৎ ফিডার পদে ১০ বছর থাকতে হবে। ফিডার সার্ভিস বলতে, শিক্ষা ক্যাডারের মূল পদ সরকারি কলেজে কর্মরত থাকতে হবে। এছাড়াও সব ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের শুরুতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস ও শিক্ষানবিশকাল শেষ করে চাকরি স্থায়ী করা বাধ্যতামূলক। পদোন্নতির জন্য পরীক্ষায় পাসও বাধ্যতামূলক। যারা এসব যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবেন, তাদের চাকরির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে পরীক্ষায় প্রমার্জন সাপেক্ষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হবেন। কিন্তু আইন ভঙ্গ করে, ২০০৬ সাল থেকে এক যুগের বেশি ক্লাসরুমে না গেলেও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষা ক্যাডারে বেশ অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আদালতে এ নিয়ে মামলা পর্যন্ত হয়েছে।

আবার, বছরের পর বছর ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাসরুম বহির্ভূত পদে চাকরি করছেন এই শিক্ষকরা। অথচ ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা একটানা তিন বছরের বেশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থায় থাকতে পারবেন না। তিন বছর পর তারা শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন। টানা দুই বছর শিক্ষকতার পর আবার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাইলে পদায়ন নিতে পারবেন।

জারি করা ওই নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি কলেজের শিক্ষকরা চাকরি জীবনে তিনবারে সর্বোচ্চ ছয় বছরের বেশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থায় নিয়োগ পাবেন না। নীতিমালায় বলা হয়, কোনো কর্মকর্তাকে একটি দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা ও প্রকল্প থেকে বদলি করে অন্য কোনো দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থায় বদলি করা যাবে না। মধ্যবর্তী সময়ে তাকে কোনো কলেজে নূ্যনতম দুই বছর শিক্ষকতা করতে হবে। এতে আরও বলা হয়, একজন কর্মকর্তা সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবারে সর্বমোট ছয় বছরের বেশি দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থায় থাকতে পারবেন না। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো কারণে ওএসডি হিসেবে কর্মকালকে বিবেচনা করা হবে না। অথচ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজেই এখন এ নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নের দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন `বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি`র সভাপতি ও রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকার বলেন, তারা চান নীতিমালা মেনেই পদায়ন করা হোক। তাহলে সব কর্মকর্তাই চাকরি জীবনে কখনও না কখনও অফিসিয়াল ফাইল ওয়ার্কের সুযোগ পাবেন। এতে একজন কর্মকর্তা ক্লাসরুমে পাঠদান ও অফিসিয়াল পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন উভয় কাজেই দক্ষ হয়ে উঠবেন।

 সমকাল

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর