বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল, ২০২০ ১২:৩৪ পিএম


শাবিতে ১৫১ ছাত্রলীগ নেতার ছাত্রত্ব নেই ১৩০ জনেরই

ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট ব্যুরো

প্রকাশিত: ১০:৫৩, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে রয়েছে- ছাত্রত্ব না থাকলে সংগঠনে থাকতে পারবেন না। কিন্তু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) শাখা ছাত্রলীগের জন্য যেন সে নিয়ম মানার কিছুই নেই। এক বছরের কমিটির সাত বছর পূর্ণ করতে চলা এ ইউনিটটি বর্তমানে চলছে ‘অছাত্র’ ও ‘আদু ভাই’দের হাত ধরে। ১৫১ সদস্যের কমিটির ১৩০ জনেরই ছাত্রত্ব নেই। এছাড়া বিবাহিত, চাকরিজীবী ও গত তিন-চার বছরে ক্যাম্পাস বা ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নয়- এমন নেতার সংখ্যাও ১২০ পেরিয়েছে। দীর্ঘদিনেও কমিটি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়া নেতা ও কর্মীদের অনেকে রাগে-ক্ষোভে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। ফলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এ শাখার সব ধরনের কাজকর্মে।

২০১৩ সালের ৫ মে বর্তমান কমিটি ঘোষিত হয়। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তিনবার পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি এ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই সহসভাপতি রুহুল আমিনকে ওই বছরের ১০ অক্টোবর কাউন্সিল করার দায়িত্ব দিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। কিন্তু আড়াই বছরেও সম্মেলন নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এই ইউনিটের জ্যেষ্ঠ দুই নেতা।

২০১৭ সালের জুলাইয়ে শাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থকে সাংবাদিক নির্যাতন ও এক স্কুলছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তিনি এখন ক্যাম্পাসছাড়া। ২১ সহসভাপতির একজনেরও ছাত্রত্ব নেই। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন ছাড়া আর কেউ ক্যাম্পাসেই নেই।

নেতাকর্মীরা জানান, তবে মাঝে মধ্যে নিজের অবস্থান জানান দেন ‘ইয়াবাসম্রাট’খ্যাত সহসভাপতি তরিকুল ইসলাম। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বললেও প্রশাসনের মদদে এখন তাকে হলেও অবস্থান করতে দেখা যায়। ২০১৮ সালের ২১ মার্চ তরিকুল ইসলামের ছোড়া গুলিতে তার নিজেরই এক কর্মী আহত হন। একই বছর তার ইয়াবা সেবনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

সূত্র মতে, আরেক সহসভাপতি আবু সাঈদ আকন্দ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হওয়ার আগেই ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। অঞ্জন রায় সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। চাকরিরত আছেন ৫ জন। এর মধ্যে তুহিনুর রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, নুরে আলম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ধনী রাম রায় বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে ও শরিফুল ইসলাম বুলবুল বেপজাতে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া নুরে আলম, মুহিবুল ইসলাম মিছবা, মনিরুজ্জামান মনির ও ইমরান হাসান নয়ন বিবাহিত। পাঁচ বছর আগে ক্যাম্পাস ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় ব্যবসা করছেন আবদুল কাদির রেদওয়ান। অন্যরাও দু-তিন বছর ধরে ক্যাম্পাসে নেই। গত দুই বছরে কোনো অনুষ্ঠানেও এদের কাউকে দেখা যায়নি।

শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান ছাত্রত্ব হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোর্স সম্পন্ন না করায় সিন্ডিকেট তার ছাত্রত্ব বাতিল করে। নয় যুগ্ম সম্পাদকের মধ্যে মৃন্ময় দাশ ঝুটন বাদে কারোরই ছাত্রত্ব নেই। তবে তিনি পদ পাওয়ার জন্য একটি কোর্সের পরীক্ষায় ইচ্ছা করে অংশ নিচ্ছেন না। ঝুটন পদ পাওয়ার কিছুদিন আগে ছাত্রলীগে সক্রিয় হন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কর্মীরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পোস্টও দিয়েছেন সম্প্রতি। যুগ্ম সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম সবুজ ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত। হাফিজ আল আসাদ, আরিফ আহমেদ ক্যাম্পাসে নেই তিন বছর। সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন আরিফুল ইসলাম। ফিরোজ আহমেদ ঢাকায় চাকরি করছেন, শেখ যুবায়েরও চাকরি করছেন। ইয়াসিন আরাফাত ও আশরাফুল ইসলাম অন্তু ছাত্রলীগে সক্রিয় নয় বছরদুয়েক ধরে। সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম ফাও খাওয়া ও ভর্তি জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। বিবাহিত মোস্তাক মিয়াজি কৃষি ব্যাংকে চাকরি করছেন। তার সন্তানও রয়েছে। দোলন আহমেদ জার্মানিতে পড়াশোনা করছেন। একাধিক মামলার আসামি আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানেরও ছাত্রত্ব নেই। ক্যাম্পাসে অন্তত দুই বছর ধরে নেই বাকি সাংগঠনিক সম্পাদকরা।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৮ মে ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের তৎকালীন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন। সে সময়টাতে সর্বশেষ ২০১৪-১৫ সেশনের দু’জন কমিটিতে স্থান পায়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো সেশনজট না থাকায় ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থীরা এখন মাস্টার্স শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। সব মিলিয়ে সংগঠনটির কমিটির ১৫১ নেতার মধ্যে অন্তত ১৩০ জনেরই ছাত্রত্ব নেই। যে ২১ জনের ছাত্রত্ব আছে তাদের ১৪ জনের স্নাতকোত্তর এ বছরের জুলাই নাগাদ শেষ হয়ে যাবে।

সূত্র মতে, জাতীয় দিবসগুলোতেও সেভাবে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে না এই ইউনিটটি। অসংখ্য গ্রুপিং থাকায় প্রোগ্রামগুলোতে উপস্থিতির হারও খুবই নগণ্য। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলে থাকলেও বাইরে থাকেন সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান। অভিযোগ রয়েছে, যতদিন পারা যায় যে কোনো উপায়ে কমিটি টিকিয়ে রাখতে হবে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিজেদের মধ্যে এমন মধ্যস্থতা করায় ধীরে চলো নীতিতে চলছে এই ইউনিটটি। নেতাকর্মীরা জানান, এ অবস্থায় হতাশ তারা। দীর্ঘ সময়ে কমিটি না হওয়ায় আসছে না নতুন নেতৃত্বও। অনেকেই ছাত্রলীগের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। ছাড়ছে সংগঠন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান যুগান্তরকে বলেন, কমিটিকে টিকিয়ে রাখার কোনো উদ্দেশ্য নেই। বছরখানেক আগে বিষয়টি অনুধাবন করেছি। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটির দাবি জানিয়েছি। যাদের ছাত্রত্ব শেষ তাদের আমরা আগের মতো ডাকি না।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, শাবি ছাত্রলীগের কমিটি অনেক পুরনো। তাই অনেকেরই ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেছে। আমরা পরিকল্পনা করছি, শিগগিরই সাংগঠনিক সফরে গিয়ে শাবিসহ সিলেটের সব ইউনিটের সম্মেলন করে নতুন কমিটি করে দেয়ার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকাসক্ত, অছাত্র ও বিতর্কিতদের ছাত্রলীগে কোনো স্থান নেই। কারও বিরুদ্ধে এসবের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান জয় যুগান্তরকে বলেন, আমাদের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই বেশি। শাবি ছাত্রলীগের কমিটির খুবই বাজে অবস্থা। দ্রুত সম্মেলন করে নতুন কমিটি দেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ছাত্রলীগে মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী ও অছাত্রদের কোনো স্থান নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ রয়েছে। -যুগান্তর

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর