মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৪:৪০ পিএম


র‌্যাগিং: অজানা উৎকণ্ঠায় শিক্ষার্থী

জাহিদুর রহমান

প্রকাশিত: ০৯:০৮, ১২ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৯:০৮, ১২ জানুয়ারি ২০২০

প্রতি বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের অনেক শিক্ষার্থীকে এক অজানা উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হয়। এ সময় শুরু হয় অধিকাংশ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ক্লাস। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যসূচি, শিক্ষক বা আনুষঙ্গিক বিষয়াদির চেয়ে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয় র‌্যাগিং। প্রতিবছর এমন অনেক সংবাদ আমরা পেয়ে থাকি, যেখানে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়রদের কাছ থেকে র‌্যাগিংয়ের নামে প্রচণ্ড হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই তাদেরকে একধরনের মানসিক দাসত্বের নিগড়ে বন্দি হতে হয়। ফলে কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কেউ আবার অপমানে আত্মহননের চিন্তাও করেন। র‌্যাগিংয়ের নজির খুঁজতে খুব বেশি পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর আবারও জোরেশোরে সামনে চলে এসেছে র‌্যাগিং বিষয়টি। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ নেতাদের নির্মম নির্যাতনে মৃত্যু হয় ফাহাদের। এ ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। ঘটনার জেরে ২৬ শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বুয়েট কর্তৃপক্ষ।

গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত র‌্যাগিংয়ের নামে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালানো হয় প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীর ওপর।

সেই ঘটনার আবার ভিডিওচিত্রও ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ২০১৮ সালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় নবীন শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিংয়ের নামে অর্ধনগ্ন করে শৌচাগারে সেলফি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন ছোট-বড় হাজার হাজার র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকে। অনেকক্ষেত্রে চরম আকারে রূপ না নিলে সেগুলো প্রকাশ্যে আসে না।

২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিংয়ের ওপর জরিপ পরিচালনা করে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরোনো শিক্ষার্থীদের সখ্য গড়ে তোলার জন্য যে আনুষ্ঠানিক পরিচিতি প্রথা, সেটাকে র‌্যাগিং বলে অভিহিত করা হলেও বাস্তবে যা চলছে, তা এক কথায় টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতনের মতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েও কোনো অভিযোগ জানায়নি। ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, র‌্যাগিং খুবই নির্দয়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক।

আজকের দিনে র‌্যাগিংয়ে যারা নেতৃত্ব দেন, তাদের অধিকাংশ কিন্তু শুধু সিনিয়র নন, তারা ছাত্র রাজনীতি করার সুবাদে নিজেদের অনেক ক্ষমতাবান মনে করেন। এমন মানসিকতা থেকেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেটির নাম দেওয়া হয়েছে গেস্টরুম কালচার। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ র‌্যাগিং বা গেস্টরুম কালচারকে অতি স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করেন। যে কারণে পরের বছর সিনিয়র হওয়ার পর তারা নিজেরাও জুনিয়র শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ দিতে শুরু করেন।

এভাবে র‌্যাগিং সংস্কৃতি উত্তরাধিকারসূত্রে এক বর্ষের শিক্ষার্থীদের থেকে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে হস্তান্তর হতে থাকে। র‌্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। কেবল র‌্যাগিংয়ের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের বহিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব সারে। অনেকক্ষেত্রে সেটাও হয় না, তদন্ত প্রক্রিয়াতেই আটকে থাকে অভিযোগের বিষয়। তবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই `র‌্যাগিং কালচার` নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। র‌্যাগিংয়ে যুক্ত থাকার দায়ে কয়েকজনকে স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়েছে। র‌্যাগিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক ব্যাধি, যার কুফল সুদূরপ্রসারী। তাই আমরা আশা করব, র‌্যাগিং বন্ধে সরকারের যে ঘোষণা এসেছে, তা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে।

শিক্ষানবিশ আইনজীবী (সমকাল)

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর