শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ২২:১২ পিএম


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: গৌরবের ৬৬ বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

ড. মো. মাসুদ পারভেজ রানা

প্রকাশিত: ০৮:৪৯, ৬ জুলাই ২০১৯  

আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিনটি। প্রতি বছরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবার উপস্থিতিতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নানা রঙের আলোর বাহারে সুসজ্জিত ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে মেতে উঠছে প্রাণের মেলা। স্বমহিমায় উজ্জ্বল প্যারিস রোডে চলছে ছাত্রছাত্রীদের দীপ্তিময় পদচারণা। বর্ষার অবগাহনে সবুজে ভরে উঠেছে মতিহার চত্বর। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীদের প্রাণে লেগেছে এক নতুন দোলা। সব ব্যর্থতাকে মুছে ফেলে নতুন আশায় প্রদীপ্ত হওয়ার প্রত্যাশা সবার অন্তরে। এক মনোমুগ্ধকর ও উৎসবমুখর পরিবেশের সূচনা হয়েছে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে কোণে।

গৌরবের এই ৬৬ বছর পূর্তিতে শহীদ ড. শামসুজ্জোহার কথা স্মরণ করতে চাই। যার অবদান এবং আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিজের জীবনের চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের জীবন আর অধিকার যে কত বড়, তার আত্মত্যাগ সেটি প্রমাণ করে। মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশ নামক একটি দেশের জন্মলাভে শহীদ শামসুজ্জোহার অবদান কত গভীরে, তা আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করি। আমরা বিশ্বাস করি, তার আত্মত্যাগ হানাদার বাহিনীকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশিরা পিছপা হওয়ার জাতি নয়, অধিকার আদায় তাদের অঙ্গীকার, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা তাদের ধর্ম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যত অর্জন সেগুলোর সর্বাগ্রে রয়েছে শহীদ শামসুজ্জোহাসহ অন্য শহীদদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ সমর্থন।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা প্রশংসনীয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি সমাদৃত। কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, জীব ও ভূবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কৃষি সংশ্নিষ্ট প্রায় অর্ধশত বিভাগে ছাত্রছাত্রীরা অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়। সমসাময়িক সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা ভেবে নতুন বিভাগের সূচনা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বিভাগে রয়েছে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত বিদেশ-ফেরত শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক পরিচালিত হেকেপ প্রজেক্ট অধিকাংশ বিভাগগুলোয় আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের জন্য চলমান কারিকুলাম উন্নয়ন কর্মশালা নিজ নিজ বিষয়ের পাঠ্যক্রমকে অধিকতর যুগোপযোগী ও প্রায়োগিক করে তোলার জন্য সহযোগিতা করছে। কারিকুলাম উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চার বছরেেময়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে পাঠানো হয়েছে। চাহিদামতো অনুদান পেলে বিভাগগুলোর ক্লাসরুম ও গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হবে।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির ধারায় যুক্ত হয়েছে ৫০ বছরমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান। ইতিমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। সব শিক্ষকের মতামত পেশের জন্য প্রশাসন থেকে অবহিত করা হয়েছে। আমরা আশা করব, ৫০ বছরব্যাপী এই মাস্টারপ্ল্যান যেন শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এই অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিদেশি শিক্ষক নিয়ে আসার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে মানসম্মত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু বিদেশি শিক্ষক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে আসতে পারে, তার ব্যবস্থাও করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রণয়ন এবং অনাহূত বন্ধ ও সেশন জ্যাম পরিহার করে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েই উপকৃত হবে। শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উন্নতমানের গবেষণা পরিচালনা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। লেখাপড়ায় মনোযোগী করে তোলার জন্য মেধাবী ও অভিজ্ঞ ছাত্রছাত্রীদের চাকরিতে প্রাধান্য দিতে হবে।

বিগত দিনগুলোতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলার পথে অনেকবার হোঁচট খেয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতবিরোধ অথবা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অনেকবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থেকেছে, অনেক ছাত্র প্রাণ হারিয়েছে, অনেকে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকরাও অন্তর্কলহ ও রাজনৈতিক কারণে প্রাণ দিয়েছেন। জন্মদিনের এই শুভক্ষণে আমরা আশা করব, আর যেন কোনো শিক্ষক বা ছাত্র অকালে প্রাণ না হারায়। মুক্ত জ্ঞানচর্চার এই প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিসচেতন মানুষের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। উন্নয়নকামী আদর্শভিত্তিক যে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনও অযৌক্তিক নয়। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে রাজনীতি শিক্ষা ও চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনীতির এই চর্চা যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্ম না দেয়। মনে রাখতে হবে, এটি একটি শিক্ষালয়। রাজনীতির নামে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার জায়গা এটি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে শুধু লেজুড়বৃত্তিক ও ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড কারও কাছেই কাম্য নয়। এমন কর্মকাণ্ড স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির স্বার্থ হাসিল করলেও সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে নেতিবাচক ভাবধারার জন্ম দেয়। ফলে সফলতার পরিবর্তে সব উন্নয়নকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। আশা করি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন সবাই এটি অনুভব করবেন এবং মঙ্গলজনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া ও গবেষণায় অধিকতর মনোযোগী করে তোলার জন্য সবাই প্রত্যয়ী হবেন।

একটি দুঃখের কথা বলেই লেখাটি শেষ করতে চাই। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রথম কর্মস্থল বড়কুঠিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে। বিষয়টি শিক্ষক সমাজসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। বড়কুঠি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকড়, এর প্রাণের সঞ্চার হয়েছে এখানে। বড়কুঠি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরিচয়, এর বিশাল অস্তিত্বজুড়ে রয়েছে বড়কুঠির স্মৃতি। মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার শিকড় হারাল। গৌরবময় ইতিহাসের সূচনাকে হত্যা করল। প্রশ্ন হলো, বড়কুঠিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানায় রেখে বাংলাদেশের একটি হেরিটেজ হিসেবে উন্নয়ন ও সংরক্ষণ করা কি যেত না? তাহলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বরেন্দ্র জাদুঘরের মালিকানাও কি হারাতে যাচ্ছে? জন্মদিন পালনের এই উৎসবমুখর লগ্নে দুঃখজনক এই খবরটি প্রত্যাশিত ছিল না। এর ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি হয়তো থেমে থাকবে না; কিন্তু ৬৬ বছরের ইতিহাসে বিশাল কালো দাগ হয়ে রইল বড়কুঠির মালিকানা হস্তান্তর। দায়িত্বশীল মহল অবশ্যই এই ব্যথা অনুভব করবেন বলে আশা রাখি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে পাবে তার পরিচয়ের সূচনা ও শিকড়কে। পরিশেষে প্রত্যাশা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অমর হোক, আলোয় আলোয় ভরে তুলুক সমগ্র জাতিকে, বাংলাদেশকে।

অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর