সোমবার ২৫ মে, ২০২০ ১৯:২৫ পিএম


রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা সংক্রমণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩:৫৪, ৯ এপ্রিল ২০২০  

করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিহ্নিত পাঁচটি ক্লাস্টারের (একটি জায়গায় কম দূরত্বের মধ্যে অনেক রোগী) দুটি রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু রাজধানীর ওই দুটি এলাকাতেই কেবল সংক্রমণ সীমিত নেই। এখন প্রায় পুরো রাজধানীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত রাজধানীর ৪৬টি এলাকায় সংক্রমণ পাওয়া গেছে। দেশে চিহ্নিত মোট রোগীর ৫৬ শতাংশই রাজধানীর বাসিন্দা।

ঢাকা মহানগরীর বাইরে ঢাকা জেলাসহ ২২টি জেলায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে। গতকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ২১৮ ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৩ জন (৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ) ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) দেওয়া তথ্যে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

সংক্রমণ ঠেকাতে রাজধানীর যেসব জায়গায় রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেখানে সীমিত পরিসরে ভবন বা গলি লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা হচ্ছে। গত রাত পর্যন্ত রাজধানীর অন্তত ৫৪টি জায়গায় এ ধরনের লকডাউন করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। রাজধানীর বাইরে গতকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল—এই ছয়টি জেলা পুরো লকডাউন করা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব এলাকায় নতুন আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে লকডাউন করছে প্রশাসন। কোথাও কোথাও এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে লকডাউন করছেন। কিন্তু সব জায়গায় লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

গতকাল নতুন শনাক্ত ৫৪ জনের মধ্যে ৩৯ জনই রাজধানীর বাসিন্দা। গত রোববার পর্যন্ত রাজধানীর ২৯টি এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ছিল ৪২টি এলাকায়। গতকাল সংক্রমিত এলাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬-এ। রাজধানীর মিরপুর ও পুরান ঢাকা অঞ্চলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরার মতো অভিজাত এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
মোট আক্রান্তের ৫৬ শতাংশ রাজধানীর বাসিন্দা। ৪৬টি এলাকায় রোগী চিহ্নিত। মিরপুর ও পুরান ঢাকায় বেশি।

মিরপুরে শনাক্ত ২৭ জন
বৃহত্তর মিরপুরে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৭ জন। গতকাল নতুন করে ওই অঞ্চলের ১০ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ২৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে মিরপুরে।

মিরপুরের টোলারবাগ এবং বাসাবোকে আগেই ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করে আইইডিসিআর। উত্তর টোলারবাগে ২১ মার্চ ও ২২ মার্চ পরপর দুই ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁদের সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশফেরত কারও সংস্পর্শে যাওয়ার ইতিহাস ছিল না। তাঁদের মৃত্যুর ঘটনাকে দেশে সংক্রমণের নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

গত মঙ্গলবার পর্যন্ত টোলারবাগে মোট ৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যায়। গতকাল আরও ৩ জন শনাক্ত হয়। টোলারবাগে এখন মোট শনাক্তের সংখ্যা ১০। এর বাইরে মিরপুর ১-এ গতকাল নতুন ৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত মিরপুর ১-এ ৮ জন এবং মিরপুর ১০, ১১ ও শাহ আলীবাগে ২ জন করে ৬ জন, কাজীপাড়া, মিরপুর ১৩ ও পীরেরবাগে ১ জন করে ৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

মিরপুরের টোলারবাগ এলাকা এবং পাঁচটি ভবন লকডাউন করেছে পুলিশ। এর মধ্যে টোলারবাগ লকডাউন রয়েছে গত ২৪ মার্চ থেকে। এর আগে স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগে ওই এলাকা লকডাউন করেছিলেন। দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার বাসিন্দারা প্রথম দিকে বিধিনিষেধ মানতে চাননি। এরপর থানা থেকে পালাক্রমে পুলিশ সদস্যরা পাহারা দেওয়া শুরু করেছেন। একজন উপপরিদর্শকের নেতৃত্বে পাঁচজন পুলিশ সদস্য পাহারা দেন। কোনো বাসিন্দার কিছু প্রয়োজন হলে মালিক সমিতি ব্যবস্থা করছে।

পুরান ঢাকায় শনাক্ত ২৯
রাজধানীর জনবহুল এলাকা পুরান ঢাকা। সেখানেও সংক্রমণ বাড়ছে। বৃহত্তর পুরান ঢাকায় গতকাল পর্যন্ত ২৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ওই অঞ্চলে গতকাল নতুন ৬ জন চিহ্নিত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পুরান ঢাকার ওয়ারীতে ৯ জন, লালবাগে ৫ জন, সোয়ারীঘাটে ৩ জন, ইসলামপুরে ২ জন, বাবুবাজারে ২ জন এবং হাজারীবাগ, উর্দু রোড, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, কোতোয়ালি ও বংশালে ১ জন করে শনাক্ত হয়েছে।

ওয়ারী এলাকার র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট ও বনগ্রামের দুটি গলি লকডাউন করেছে পুলিশ। ওয়ারী থানার ওসি মো. আজিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দুটি এলাকায় তাঁরা টহল বাড়িয়েছেন এবং সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছেন। তাঁরা মানুষের শতভাগ সহযোগিতা পাচ্ছেন না, তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডিতেও বাড়ছে
ধানমন্ডি এলাকায়ও সংক্রমণ বাড়ছে। গতকাল নতুন করে ধানমন্ডি ও জিগাতলায় চারজনের মধ্যে সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে। ধানমন্ডিতে এখন পর্যন্ত ৯ জন শনাক্ত হয়েছে। এর পার্শ্ববর্তী জিগাতলায় ৩ জন, গ্রিন রোডে ২ জন এবং সেন্ট্রাল রোড, শাহবাগ ও বুয়েট এলাকায় ১ জন করে আক্রান্ত আছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর অঞ্চলে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮ জন করোনা রোগী চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে ৬ জন এবং আদাবর ও বসিলায় আছে ১ জন করে।

পুলিশের ধানমন্ডি অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহিল কাফি প্রথম আলোকে বলেন, কোন এলাকা বা ভবনের বাসিন্দা শনাক্ত হয়েছেন সে বিষয়টি আইইডিসিআর তাঁদের জানায় না। তাঁরা নিজেরা ধানমন্ডি ৬/এ-এর একটি বাসার কথা জানতে পেরেছিলেন। সেই বাসা লকডাউন করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়মিত তথ্য দেওয়া হলে তাঁরা আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

বাড়ছে উত্তরা, গুলশানেও
গত মঙ্গলবার গুলশান এলাকায় প্রথম একজন রোগী চিহ্নিত হয়। গতকাল আরও ৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এখন গুলশানে মোট শনাক্ত আছে ৬ জন। উত্তরায় নতুন ২ জন মিলিয়ে এখন শনাক্ত রোগী আছে ৫ জন। এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৩ জন, তেজগাঁওয়ে ২ জন এবং নিকুঞ্জ, আশকোনা ও মহাখালীতে ১ জন করে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গুলশান এলাকায় লকডাউনের খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার আক্রান্তরা নিকুঞ্জ, বাড্ডা ও বসুন্ধরা এলাকায়। এই তিনটি এলাকায় লকডাউন করা হয়েছে।

বাসাবোতে বাড়েনি
এখন পর্যন্ত একক জায়গা হিসেবে রাজধানীর বাসাবো এলাকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই এলাকায় ৯ জনকে শনাক্ত করা হয়। অবশ্য কয়েক দিন ধরে সেখানে নতুন রোগী শনাক্ত হয়নি। ওই এলাকা লকডাউন অবস্থায় আছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো এলাকা বা ভবন লকডাউন ঘোষণা করা মানে কেউ সেখান থেকে বের হতে পারবেন না এবং বাইরে থেকে কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। কারও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দরকার হলে প্রয়োজন সাপেক্ষে একজন বের হতে পারবেন। প্রয়োজন শেষ হওয়ামাত্র তিনি আবার আবাসস্থলে ফিরে যাবেন।

ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত বাসাবোর রাস্তায় আগের দুই দিনের তুলনায় গতকাল লোকজন কম দেখা গেছে। তবে বিভিন্ন বাসার ছাদে তরুণদের আড্ডা দিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া খাবার বা ওষুধ কেনার জন্য অনেককে বের হতে হয়েছে। পাড়ার ভেতর কিছু চায়ের দোকানও খোলা ছিল। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এখানকার বালুর মাঠে, কাজী অফিস, ছায়াবীথি, বাসাবো পাটোয়ারি গলি, মাদারটেকের নতুনপাড়া মাঠে তরুণেরা আড্ডা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ির আওয়াজ শুনলে তাঁরা সরে যান।

বাসাবোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ওহাব কলোনি। একেকটি ছোট্ট ঘরে ৫ থেকে ৬ জন থাকেন। গরমের কারণে তাঁরা কেউই ঘরে থাকছেন না। অনেক বাসায় নিয়মিত গৃহকর্মী আসছেন। ডিশ, ইন্টারনেট বিল নিতেও বাসায় লোকজন যাচ্ছেন।

বাসাবোর কাছেই নন্দীপাড়ার একটি গলি লকডাউন করেছে পুলিশ। নন্দীপাড়া ব্রিজ পার হলেই হাতের বাঁয়ে পড়ে গলিটি। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গলির মুখে কাঠ দিয়ে অস্থায়ী গেট করে দিয়েছে সবুজবাগ থানার পুলিশ। গেটে লেখা আছে, ‘সাবধান, করোনা আক্রান্ত গলি, মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরে প্রবেশ করুন’। সেখানে এই প্রতিবেদক ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে ১১ জনকে গেট দিয়ে যাতায়াত করতে দেখেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের মুখে মাস্ক ছিল না। হাতে গ্লাভস ছিল না কারোরই।

সবুজবাগ থানার ওসি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, গলির ভেতর মূলত নয়টি ভবন লকডাউন করা হয়েছে। এই ভবনগুলোতে যাতায়াতে কড়াকড়ি রয়েছে।

অন্যান্য এলাকা
এর বাইরে যাত্রাবাড়ীতে ৫ জন, পুরানা পল্টনে ২ জন এবং বেইলি রোড, ইস্কাটন, মগবাজার, রামপুরা, শাহজাহানপুর ও বাড্ডায় ১ জন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত থাকায় গতকাল মগবাজারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন লকডাউন করা হয়। এর আগে মগবাজার এলাকায় আরেকটি ভবন লকডাউন করা হয়েছিল।

রমনা থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একেকটি ভবনে ৪০ থেক ৫০টি ফ্ল্যাট থাকে। এর মধ্যে অনেক চিকিৎসক, ব্যাংকার থাকেন; যাঁরা জরুরি সেবার আওতায় পড়েন। তাঁদের লকডাউন বলেও আটকে রাখা যায় না।

দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। তখন শনাক্ত হয়েছিল তিনজন রোগী। এক মাসের মাথায় সেটা দাঁড়িয়েছে ২১৮ জনে। কোনো দেশে সংক্রমণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সেটাকে সংক্রমণের চতুর্থ স্তর ধরা হয়। বাংলাদেশ এখন সেই স্তরে। সরকার আশঙ্কা করছে, চলতি মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। রাজধানীতে সংক্রমণের চিত্রও সে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর