রবিবার ২১ অক্টোবর, ২০১৮ ১৮:৪১ পিএম

Sonargaon University Dhaka Bangladesh
University of Global Village (UGV)

যোগ্য শিক্ষক বাছাইয়ে এনটিআরসিএর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ০৮:৪৩, ১০ আগস্ট ২০১৮  

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে কয়েক বছর আগে। আশা ছিল স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন, তাদের আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক পাবে। যদিও শুধু এই একটিমাত্র বিষয় যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তার পরেও এক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে গঠন করা হয় এনটিআরসিএ বা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ। ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও টাকা-পয়সার লেনদেন করে বহু অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষকতার মতো একটি মানব ও সমাজ গঠনমূলক কাজে ঢুকে পড়েছেন। ২০১৫ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের হাতে গেলেও সমস্যার পাহাড় টপকে শিক্ষক নিয়োগে আশার আলো আর দেখা যায়নি। এনটিআরসিএর গাফিলতি ও দুর্নীতির কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শূন্য পদের চাহিদা দিতে চায় না, তারা ম্যানেজিং কমিটির পরামর্শে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়ার এক কালচার তৈরি করেছেন।

গত ১০ জুলাই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে সর্বশেষ (এক থেকে এগারো) শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ স্কুল-কলেজ পর্যায়ে উত্তীর্ণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ প্রার্থীর মেধা তালিকা প্রকাশ করেছে। সারা দেশে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য আসনে নিয়োগের জন্য এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়। কিন্তু প্রকাশিত মেধা তালিকা নিবন্ধিত শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কারণ তালিকাটি নানামাত্রিক ভুলে পরিপূর্ণ। তালিকায় পুরুষ শিক্ষকের নামে নারী শিক্ষকের নাম, নারীর জায়গায় পুরুষের নাম, একই ব্যক্তি ও একই বিষয়ে শিক্ষকের নাম ভিন্ন তালিকায় ভিন্ন নামে স্থান পেয়েছে। নামের বানান-নম্বর ভুলসহ বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি ধরা পড়েছে। শত শত অভিযোগ প্রার্থী তাদের ফল সংশোধনের আবেদন করে কোনো প্রতিকারও পাননি।

এনটিআরসিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য আসনের তালিকা চাওয়া হয়েছে। এ তালিকায় বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এসব শূন্য পদে যোগ্য বিবেচিতদের নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ করা হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের নতুন আইন ও নীতিমালা অনুসারে সুপারিশকৃতদের নিয়োগ দিতে হবে প্রতিষ্ঠানকে। এক্ষেত্রে আর কোনো ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই প্রতিষ্ঠানটির। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের জন্য ওই আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনটিআরসিএ সূত্র বলছে, আগামী এক মাসের মধ্যে শূন্য আসনের তালিকা মন্ত্রণালয় ও বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে চাওয়া হয়েছে। তারই ভিত্তিতে চাহিদা তালিকা প্রকাশ করার প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে তালিকা পাওয়ার আগেই এনটিআরসিএ যে মেধা তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে অসংখ্য ভুলভ্রান্তি চিহ্নিত হওয়ায় প্রার্থীরা হতাশ ও বিপাকে পড়েছেন। কুমিল্লার এক শিক্ষক জানান, তিনি নবম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১০ জুলাই মেধা তালিকায় নিজের নামে দেখে তিনি হতাশ। তিনি কলেজ পর্যায়ে বাংলা বিষয়ে ৭৩৬ ও স্কুল পর্যায়ে ১ হাজার ২৩৩ নম্বর মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, মেধা তালিকায় তার রোল নম্বর স্থান পেলেও তার নামের স্থানে একজন নারী প্রার্থীর নাম দেখে হতভম্ব হয়ে ঢাকায় আসেন এবং এনটিআরসিএতে গিয়ে অভিযোগ করেন। তিনি লিখিত অভিযোগ করলেও তা কবে নাগাদ বা আদৌ তালিকায় প্রতিস্থাপন হবে কিনা, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। তাকে বলা হয়েছে পরে খোঁজ নিতে। অনেক পরীক্ষার্থী প্রকাশিত ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে নিয়োগকারী সংস্থা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন বলে পত্রিকায় দেখলাম।

৯ এপ্রিল ২০১৮, সোমবার ১৪তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষার ফলে স্কুল-২ পর্যায়ে ৬২৪ জন, স্কুল পর্যায়ে ১৫ হাজার ৩৬২ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ৩ হাজার ৮৭৭ জনসহ মোট ১৯ হাজার ৮৬৩ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩১৮। স্কুল পর্যায়-২এ ২৩টি, স্কুল পর্যায়ে ২৩টি এবং কলেজ পর্যায়ে ৩৫টিসহ মোট ৮১টি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্ট প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় স্কুল পর্যায়ে ৫ লাখ ৩ হাজার ৩৮ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ৩ লাখ ৩ হাজার ৬১২ জনসহ মোট ৮ লাখ ৬ হাজার ৬৫০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ফল প্রকাশের পর অসঙ্গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন পরীক্ষার্থীরা।

৪০ নম্বর পেলে বিজ্ঞপ্তিতে পাস করার কথা বলা হলেও অনেকেই ভালো পরীক্ষা দিয়ে রোল না পেয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। মো. মাজহারুল ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, ‘জীবনে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষায়ই ফেল করিনি, অথচ ১৪তম নিবন্ধনের স্কুল, কলেজ দুই পর্যায়ে ফেল দেখাচ্ছে। কিন্তু ১৩তমে আমার উপজেলায় আমিই প্রথম হয়েছি। সেই আমিই আবার ১৪তমতে ফেল। শুনলাম যাদের উপজেলায় পোস্ট ফাঁকা নেই, তাদের পাস করায়নি। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো, আমার উপজেলায় যদি পোস্ট না থাকে তাহলে কেন আমাকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো এবং আমার মতো লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ৭৫০ টাকা, যাতায়াত খরচ আরো ১০০০ টাকা নেয়া হলো।’ এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। যে উপজেলায় শিক্ষক প্রয়োজন নেই, সেই উপজেলার কোনো প্রার্থী পরীক্ষা দিয়ে ভালো করলেও তাকে ফেল করানো হবে, এটি কোন অদ্ভুত নিয়ম? তাহলে বলা হতো যে, অমুক উপজেলায় কোনো পদ খালি নেই, অতএব ওখান থেকে কাউকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।

অন্য একজন পরীক্ষার্থী ফলাফলে অসঙ্গতির কারণ তুলে ধরে বলেছেন, ফলাফল প্রস্তুতি ছিল অনেক দিন আগে। যখন প্রস্তুত ছিল তখন ১৬৬টি রায়ের কপি তাদের হাতে পৌঁছেনি। সেই জন্যই ১৩তমের মতো উপজেলায় শূন্য পদ অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। চাঞ্চল্যকর তথ্য বটে! এনটিআরসির চেয়ারম্যান অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার সঙ্গী হিসেবে স্থান পাননি অনেকে। তাই চেয়ারম্যানকে অপদস্থ করতে ফলাফলে অসঙ্গতি করা হয়েছে বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তাদের নিজেদের মধ্যে রেষারেষির বলি হচ্ছেন সাধারণ নিবন্ধনকারীরা। আইনি জটিলতার কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতার মধ্যে নতুন এ ফলের অসঙ্গতি নিয়ে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধিত নিয়োগবঞ্চিত জাতীয় ঐক্য পরিষদ আইন লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই চলছে আমাদের শিক্ষক নিয়োগ, মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের কাজ। কবে আসলে বিষয়টিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে?

একটি দৈনিক পত্রিকার লেখা থেকে জানলাম যে, সারা দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় হাজার হাজার শূন্যপদ থাকলেও কর্তৃপক্ষ চার বছরে মাত্র ছয় হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে, যা ২০১৬ সালে সংঘটিত হয়। যথাসময়ে নিয়োগ না হওয়ায় লাখ লাখ নিবন্ধিত শিক্ষক হতাশায় দিন পার করছেন। প্রথম থেকে দ্বাদশ নিবন্ধিত শিক্ষকদের নিবন্ধন পরীক্ষা মোটামুটি একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলেও ত্রয়োদশ নিবন্ধন থেকে পরীক্ষা সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে বিসিএসএর আদলে যেমন— প্রথমে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও পরে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এনটিআরসিএ থেকে বলা হয়েছিল, ত্রয়োদশ ব্যাচের নিবন্ধনকারীদের আলাদাভাবে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হবে। বাছাই প্রক্রিয়া ভিন্নতর হওয়ায় সম্ভবত কর্তৃপক্ষ এরূপ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সেটির ব্যাপক প্রচার, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিষয়টিতে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এনটিআরসিএর বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন এলোমেলে সিদ্ধান্ত, সময়মতো শিক্ষক নিয়োগ না দেয়ার কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাতিল করে আবার আগের মতো ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা জানি না, তবে এটি করা হলে তা শিক্ষার জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। এরই মধ্যে বহুলোক তথাকথিত ম্যানেজিং কমিটিকে ম্যানেজ করে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করে এ মহান পেশাটির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আবার সেই পুরনো সিদ্ধান্তে চলে গেলে তা জাতির শিক্ষার ক্ষেত্রে এক হুমকির সৃষ্টি করবে।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি ইউনিট বা সেল উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি দেখভাল করা শুরু করল কেন? আমরা তো সবাই জানি এসব জায়গা হচ্ছে ‘দুর্নীতির আখড়া’। এসব জায়গায় অর্থ বিনিময় ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তার পরেও কেন এটি করা হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ একটি ‘বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন’ গঠন করার কথা বলে আসছেন। কিন্তু কেউ তা গুরুত্ব দেয়নি। আবার শোনা যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন (এনটিএসসি) গঠনের উদ্দেশ্যে আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে, যেটি আলোচনার জন্য ২২ জুলাই বসার কথা। জানি না বসেছে কিনা। এ কমিশন গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। আর প্রস্তাবনা ও সুপারিশ চলছে বহু বছর ধরে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা হবে প্রার্থীদের। ওই পরীক্ষাগুলোর ওপর ভিত্তি করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। এটি করা হলে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেকটাই স্বচ্ছতার মধ্যে চলে আসবে। আর আমরা হয়তো ১০০ ভাগ না হলেও বর্তমান অবস্থার চেয়ে বহুগুণ ভালো শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাপনা উপহার পাব, যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার কাজ অনেকটাই সহায়ক হবে।

 

লেখক: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর