শনিবার ২০ জুলাই, ২০১৯ ১৫:২২ পিএম


যে স্কুলে বেতন প্লাস্টিক পণ্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৫০, ১১ মে ২০১৯  

অন্যরকম এক স্কুল। ব্যাগের বোঝা নেই, সিলেবাস শেষ করার তাড়া নেই, শিক্ষক-শিক্ষিকার চোখ রাঙানি নেই। পড়াশোনার ধরণ একেবারেই আধুনিক। অবাক হওয়ার মতো বিষয় এ স্কুলের শিক্ষা-ফি। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে ‘অক্ষর’ নামে স্কুলটি।

বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে দূষণ রোধ করতে ভারতের আসামের গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে পামোহিতে একটি স্কুল প্লাস্টিক-দূষণ প্রতিরোধে নতুন পথের দিশা দেখাচ্ছে। পড়াশোনার খরচ বাবদ এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের জমা দিতে হয় প্লাস্টিক, পলিথিন, বা এ ধরনের সামগ্রী।

স্কুলের দুই প্রতিষ্ঠাতা পারমিতা শর্মা এবং মজিন মুখতার জানিয়েছেন, স্বপ্ন ছিল এমন একটা স্কুল তৈরি করা যেখানে গড়পড়তা শিক্ষা নয়, পড়ুয়াদের নানা বিষয়ে উৎসাহী করে তোলা যাবে। তার প্রথম পদক্ষেপটাই হলো প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা।

পারমিতা বলেন, স্কুল তখনও শুরু হয়নি। এই এলাকায় পা দিলেই পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধে নাভিশ্বাস উঠত। পরে জানতে পারি এখানকার মানুষজন সারাদিনের ব্যবহার করা প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলে, যার বিষ ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় গোটা এলাকা। অভিভাবকদের সঙ্গে শিশুরাও এই প্লাস্টিক পোড়ানোর কাজে অংশগ্রহণ করে। একটা বিরাট এলাকা জুড়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ডাঁই করে আগুন দিয়ে দেন বাসিন্দারা। এই প্লাস্টিক যে কতটা বিষাক্ত, প্রাণহানির কারণ সেটা এলাকাবাসীকে বোঝাতেই অনেকদিন সময় লাগে বলে জানিয়েছেন পারমিতা। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুরু হয় শিশুদের স্কুলে ধরে আনার কাজ।

মজিন বলেন, শুরুতেই সাফল্য মেলেনি। ২০১৬ সালে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন। ২০১৯ সালে সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। আশপাশের এলাকা থেকেও বাচ্চাদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে আনেন অভিভাবকরা।

তিনি আরো বলেন, বেতন হিসেবে কানাকড়িও নেয়া হয় না। বরং শিক্ষার্থীদের কড়া নির্দেশ দেয়া আছে, নিজের বাড়ির বা এলাকার, যেখানে যত প্লাস্টিক রয়েছে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সব কিছু নিয়ে এসে জড়ো করতে হবে স্কুলে। কোনো প্লাস্টিক পোড়ানো যাবে না। গড়ে সপ্তাহে ২৫টি করে প্লাস্টিকের যেকোনো সামগ্রী জমা করতেই হয় স্কুলে।

সপ্তাহে যত প্লাস্টিক জমা হয় স্কুলে, সেগুলো দিয়ে ইকো-ব্রিক তৈরি করা হয় অক্ষরে।

মজিন জানান, স্কুলের ভিতরেই প্লাস্টিক থেকে বায়োডিগ্রেডেবল সামগ্রী তৈরির অনুমোদন দিয়েছে নর্থ-ইস্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। ছাত্রছাত্রীরাই বানায় এই ইকো-ব্রিক। একটা প্লাস্টিকের বোতলের ভিতরে অন্তত ৪০টি প্লাস্টিক বর্জ্য ঠেসে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা হয় এই ইকো-ব্রিক। এই বোতল বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায়। বাড়ি তৈরিতে বা কোনো নির্মাণ কাজে ইটের বদলে পরিবেশবান্ধব এই ইকো-ব্রিক ব্যবহার করা হয়। যার ফলে ইট-ভাটার দূষণও রোধ করা যায়।

এই স্কুলের আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্রছাত্রীদের স্বনির্ভর করে তোলার প্রচেষ্টা।

পারমিতা বলেন, ইকো-ব্রিক তৈরি করে স্কুলের বেশিরভাগ খরচ তোলে শিক্ষার্থীরাই। তাছাড়াও নানা হস্তশিল্পের জিনিসপত্রও তৈরি করে তারা নিজেরাই। বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে স্কুলে রয়েছে সোলার প্যানেল। সেগুলিরও দায়িত্বে রয়েছে ছাত্র-ছাত্রীরাই।

২০১৭ সালে মজিন ও পারমিতার কাজের প্রশংসা করে জাতিসংঘ। ২০১৮ সালে এই স্কুলের খরচ চালানোর দায়িত্ব নেয় অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। আসামের ‘অক্ষর’কে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লির পাঁচটি সরকারি স্কুল। মুম্বাইতেও এমন স্কুল তৈরির জন্য অক্ষর ফাউন্ডেশনের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশ জুড়ে এমন ১শ’টিরও বেশি স্কুল তৈরির স্বপ্ন রয়েছে মজিন-পারমিতার।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর