শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৩:৪৬ পিএম


যে কারণে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সময়ের দাবী

শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী

প্রকাশিত: ০৮:৪৯, ৩১ আগস্ট ২০১৯  

 

আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ, নৈতিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা তথা উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়। বিনা মূল্যে মাধ্যমিক পর্যন্ত বই বিতরণ, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ও ঈর্ষনীয় সাফল্যে মাধ্যমিক শিক্ষক সমাজ আশান্বিত হয়েছিল।

কিন্তু অত্যন্ত দু:খের ও পরিতাপের বিষয় হল উক্ত শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে ২০১২ সালে অনুমোদিত হওয়ার ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও জাতীয় শিক্ষানীতি প্রস্তাবিত ‘স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই, যা শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদন্ড মাধ্যমিক স্তর- দুর্বলতার খোলস থেকে রেরুতে পারছেনা।

১৯৮০ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল প্রায় ৫ হাজার। কালক্রমে এর পরিধি বাড়তে থাকে। ব্যানবেইজের ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৫,৭৩২ টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৪৯ টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২,৫৩৩ টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১,২৩৪ টি স্কুল এন্ড কলেজসহ সর্বমোট ১৯,৮৪৮ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করেন School & Inspection branch । এর সাথে রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ২,৫৫৭টি, ¯স্নাতক কলেজ ১,১২৬টি, ¯স্নতক(সম্মান) কলেজ ৫৬৮টি ও ¯স্নতকোত্তর কলেজ ১৬৮টি সহ মোট ৪,৪১৯ টি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সর্বমোট ২৪,২৬৭টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অথচ ইতোপূর্বে মাত্র ১,২৬৪ টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ‘কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ৯,৬৫৬ টি মাদ্রাসার জন্য পৃথক ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ গঠিত হয়েছে।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কিত কিছু সুপারিশ যা বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমিক শিক্ষা বিষয়ক অংশ পর্যালোচনা করলে নি¤েœাক্ত বিষয়াদি পরিলক্ষিত হয়। উক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হলে মাধ্যমিক স্তরে গতির সঞ্চার হতো যা সরকারের রূপকল্প ১৯৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। জাতীয় শিক্ষানীতির উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো-

১। শিক্ষা প্রশাসনে বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দুইটি পৃথক অধিদপ্তর যথাক্রমে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ গঠন করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা- ৬৪)
২। মাধ্যমিক স্তর হবে (৮ম-১২শ) এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
(জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা- ১৩)
৩। খেলাধুলার সরাঞ্জারাম ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা করা হবে। গ্রন্থাগার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গ্রন্থাগারিক পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেয়া হবে। (শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৪। শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের মধ্যে ১:৩০ এ উন্নীত করা হবে। (শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৫। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আগ্রহী এবং সঠিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষে সকল স্তরের শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয় গভীরভাবে বিবেচনাপূর্বক পুনর্বিন্যাস করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা - ৫৮)
৬। সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা - ৫৮)
৭। মেধা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন করা হবে।
(জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা - ৫৯)
৮। আধুনিক যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা প্রশাসন গড়ার লক্ষে মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা প্রশাসনকে প্রয়োজনানুসারে সংস্কার করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৯। মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে ক্ষমতা, দায়িত্ব, ও কর্তৃত্বকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। জেলা শিক্ষা অফিসারের পদটি জেলার অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে সুসামঞ্জস্য করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
১০। একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ জোরদার করার লক্ষে বিদ্যালয়ের সংখ্যানুপাতে বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ সৃষ্টি করতে হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
১১। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যানুপাতে সরকারি স্কুল, কলেজ, টি টি কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জেলা শিক্ষা অফিস, আঞ্চলিক অফিস ও অধিদপ্তরে প্রয়োজনানুসারে কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)

বিশাল আকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বর্তমানে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ হিমসিম খাচ্ছে, ক্ষেত্র বিশেষে ব্যর্থ হচ্ছে। নানাবিধ কাজের সামাল দিতে গিয়ে সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। তাই মাউশির কাজের গতি আনয়ন তথা সরকাররের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী মানসম্মত আধুনিক, যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে ‘স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় শিক্ষাণীতি বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবী। আশা এবং বিশ^াস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।


সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস)
চট্টগ্রাম অঞ্চল।
সহকারী শিক্ষক, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল।

 

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর