রবিবার ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ১৮:৪৭ পিএম


যে কারণে অনার্স মাস্টার্স কোর্স চালুর ব্যাপারে কঠোর হলো সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:২১, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১১:৩৮, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

যত্রতত্র অনার্স-মাস্টার্স কোর্স খোলা যাবে না বলে সরকারের এ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা এরই মধ্যে চিঠি দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানা যায় সরকারের নজরদারির অভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিগ্রি কলেজগুলোতে খোলা হচ্ছে অনার্স মাস্টার্স কোর্স। নামমাত্র অনুমতি নিয়ে অনার্স কোর্সের নামে কলেজগুলো নিয়োগ বাণিজ্য করছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে ডিগ্রি কোর্সের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে অধিক খরচে মানহীন কলেজগুলোতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

একাধিক শিক্ষক জানান, কোনো কোনো বেসরকারি কলেজে শিক্ষকদের নামমাত্র আড়াই হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা সম্মানী দেয়। অনেক কলেজ সেটাও আবার প্রতিমাসে দেয় না। তারা বলেন, শিক্ষক নিয়োগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেক ক্ষেত্রে সরকারের আইনকে তোয়াক্কা করে না। এনটিআরসিএ`র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিধান থাকলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ক্ষেত্রেই সেটা মানে না। এর মূল কারণ কলেজ কর্তৃপক্ষের নিয়োগ বাণিজ্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাণিজ্য। কোনো বিষয়ে অনার্স কোর্স অনুমোদনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ধাপে ধাপে কলেজ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

সংশ্নিষ্টরা জানান, বেসরকারি কলেজের অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকরা সরকারি বেতন-ভাতা পান না, এমপিওভুক্ত হতে পারেন না। সরকারের এ নীতি পরিবর্তনের জন্য `বেসরকারি অনার্স-মাস্টার্স কলেজ শিক্ষক পরিষদ` দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

এই সংগঠনের নেতা এবং কুড়িগ্রামের একটি বেসরকারি কলেজের প্রভাষক হারুণ অর রশিদ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একের পর এক কলেজে অনার্স খোলার অনুমোদন দিচ্ছে অথচ শিক্ষকদের কোনো দায়দায়িত্ব তারা নিচ্ছে না। অদ্ভুত কারণে শিক্ষকদের বেতনের কথা না ভেবে এখনও ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র বেসরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালু করছে। এর কারণ বোধগম্য নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেসরকারি অনার্স কলেজগুলোতে শিক্ষকদের দুর্দশার কথা জানার পরও বেতনের দায়ভার কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। তারা ইতোপূর্বে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বেতনের পথ তৈরির কথা ভাবে না। এতে কলেজ কর্তৃপক্ষ বেপরোয়াভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এই শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা না হলে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান থাকবে না।

জানা গেছে, যত্রতত্র অনার্স খোলার নেপথ্যে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য। সরকারের নজরদারির অভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিগ্রি কলেজগুলোতে খোলা হচ্ছে অনার্স কোর্স।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে যত্রতত্র অনার্স কোর্স খোলার তীব্র সমালোচনা করা হয়। সভায় বলা হয়, উপযুক্ত শিক্ষক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ছাড়াই উপজেলা ও মফস্বল এলাকার কলেজগুলোতে চার বছরের স্নাতক (অনার্স) শ্রেণির কোর্স চালুর অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে দেদারছে। আবার অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালুর জন্য এমপিওভুক্ত না করার শর্তে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দেখা গেছে, পরেবর্তী সময়ে ওই শিক্ষকরা আন্দোলনে নামছেন এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকরা মামলা করে নিজেদের পক্ষে রায়ও পাচ্ছেন, তাদের এমপিওভুক্তিসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি যত্রতত্র অনার্স কোর্স চালুর অনুমতি সীমিত করার সুপারিশ করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র এসব কলেজ প্রতিষ্ঠা বা অনার্স ও ডিগ্রি (পাস কোর্স) খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। লাগামহীনভাবে রাতারাতি স্নাতক পর্যায়ের কলেজ গজানোর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দিতে প্রতি বছরেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোটি কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা প্রদানের জন্য যে মানের শিক্ষক নিয়োগ করার কথা, বেশিরভাগ কলেজে সেটা কখনোই অনুসরণ করা হয় না। ফলে উচ্চশিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠান অধিভুক্তির ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যা, তিন বছরের ফলাফল, অবকাঠামো, পাঠাগার ও বই ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মানা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা বিশেষভাবে `ম্যানেজ` হয়ে অনেক কলেজকে অধিভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।

শর্তসাপেক্ষে অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদন দেওয়ার পর কলেজগুলোকে তদারকি ও অধিভুক্তি নবায়নের নিয়ম রয়েছে। তবে বাস্তবে একবার অধিভুক্তির পর দ্বিতীয়বার কোনো কলেজ পরিদর্শনের নজির নেই বললেই চলে। তদারকির অভাবে অধিকাংশ কলেজ ইচ্ছামতো চলছে। শুধু তাই নয়, অনার্স কোর্সের অনুমতি পাওয়ার পর কলেজগুলো `বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ` নামকরণের প্রতিযোগিতায় নামে।

অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালুর বিদ্যমান নীতিমালা বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, সরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালুর অনুমতি না দিলে সেখানে শিক্ষক পদায়ন করা হয় না। তাই অনেক সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বেসরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালুর ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব কাগজপত্র সবররাহ ও শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করা হয়, পরে তা আর মানা হয় না।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর