শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২০ ১১:৩৩ এএম


যে অনিয়ম করেছেন খালেকসহ তিন ডিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:০১, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮   আপডেট: ০৮:১৭, ১ মার্চ ২০১৮

নেত্রোকোনা সদর উপজেলার শাহ সুলতান ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক তাপস তালুকদার। সম্প্রতি তিনি এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রে সংযুক্ত কাগজপত্র ঠিক নেই বলে নেত্রোকোনো সদরের উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল বাতের ১০ হাজার টাকা উৎকোচ নেন। এরপর আবেদন আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের উপ পরিচালকের কাছে আসলে তিনি ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু তা না দেওয়ায় তার এমপিও এখন পর্যন্ত হয়নি। একই অবস্থা নেত্রোকোনার কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আল-আমিন, আটপাড়া উপজেলার শুনই উচ্চ বিদ্যালয়ের মোজাম্মেল হকের।

যে ডিডি এই অনিয়মের জন্য দায়ি তিনি ময়মনসিংহ আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের উপ-পরিচালক আব্দুল খালেক।

এছাড়া জামালপুর সদরের কাষ্টসিংগা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার জুনিয়র মৌলভী মো. আসাদুল ইসলাম রুকন, জামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মেরফুল আনসারী, কৈডোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুর রহমান, মেলান্দহের জাহানার লতিফ মহিলা কলেজের সহকারি লাইব্রেরিয়ান মো. ইমদাদুল হক, দেওয়ানগঞ্জের ঝিলে বাংলা সুগার মিল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মশিউর রহমান ও শফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহনের মাধ্যমে এমপিও দেওয়া হয়। আর এই ঘুষ গ্রহণ করেন ময়মনসিংহের ডিডি আব্দুল খালেক (২৭ ফেব্রুয়ারি তাকে বদলি করা হয়), স্টেনো টাইপিস্ট আবুল কালাম আজাদ ও নৈশ প্রহরী নুর হোসেন। এছাড়া জামালপুর সদর উপজেলার শিক্ষকদের এমপিওর জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. আফরোজা বেগম ও অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মমিনুল ইসলাম ঘুষ গ্রহণ করেন।

গত ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে এক গোপনীয় প্রতিবেদন পাঠানো হয়। সেখানে ঘুষ গ্রহনের দায়ে দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারি ও শিক্ষককে প্রমানসহ অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায় আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ পরিচালক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের বিরুদ্ধে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রনালয় গত ১২ফেব্রুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে নির্দেশ দেয় মন্ত্রনালয়। ইতিমধ্যে মাউশি অধিদপ্তর তাদের মধ্য থেকে ১২ জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে শাস্তি মূলক বদলি করেছে। মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ময়মনসিংহের ডিডি আবদুল খালেককে নড়াইল জেলার শিক্ষা অফিসার হিসাবে বদলি করেছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়। আর ময়মনসিংহের উপ পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে ঠাঁকুরগাও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামানকে।

এছাড়া একই আদেশে কুমিল­ার আঞ্চলিক উপ পরিচালক মোহাম্মদ হোসেনকে চাঁদপুরের হাসান আলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বদলী করা হয়েছ। আর কুমিল­ার উপ পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে চট্টগ্রামের জেলা শিক্ষা অফিসার হোসনে আর বেগমকে।

এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি খুলনার উপ পরিচালক টি এম জাকির হোসেনকেও বদলি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রতিবেদনেই আরো দুই জন  উপ পরিচালকের নাম রয়েছে। যাদেরও শীঘ্রই বদলি করা হবে বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সাত বিভাগের ৩৮৪ জন শিক্ষক-কর্মচারির উদাহরন দেওয়া হয়। যাদের কেউ ঘুষ দিয়ে এমপিও নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ঘুষ না দেওয়ায় তাদের এমপিও হয়নি। আর এসব শিক্ষক-কর্মচারির কাছে ঘুষ গ্রহণের তালিকায় পাঁচজন উপপরিচালক রয়েছেন। তারা হচ্ছেন ময়মনসিংহের আব্দুল খালেক, কুমিল­ার মোহাম্মদ হোসেন, রাজশাহীর শারমীন ফেরদৌস চৌধুরী, খুলনার টি এম জাকির হোসেন ও রংপুরের মোস্তাক হাবিব। কর্মকর্তাদের তালিকায় আরো রয়েছেন ১৬ জন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, ৭৯ জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, ইনস্পেক্টর অব স্কুল একজন, শিক্ষক ছয়জন এবং কর্মচারি ১৭ জন। প্রতিবেদনে মোট ১২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারির নাম উলে­খ করা হয়। এছাড়াও আরো অর্ধশতাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের জন্য শুধুমাত্র আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কথা বলা হয়। তাদের কোনো নাম উলে­খ করা হয়নি।

এসব বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের কিছু সংখ্যককে দূর-দূরান্তে— বদলি করা হয়েছে। তালিকায় নাম থাকা অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে বদলীসহ বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারির মেখল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মো. রমিজ উদ্দিন ওই উপজেলার তখনকার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. সেলিম রেজাকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দেন। রাজশাহীর বোয়ালিয়া উপজেলার খাদেমুল ইসলাম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মেহেতাজ পারভীন ১৫ হাজার ও মওদুদা হাসনিন ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেন বোয়ালিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাহিদ হোসেনকে। একই কাজের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসের কম্পিউটার অপারেটর উজ্জ্বলকে প্রত্যেকের দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা করে। নড়াইল জেলার বিভিন্ন উপজেলার নয়জন শিক্ষক এমপিও’র জন্য জেলা শিক্ষা শিক্ষা অফিসার রনজিৎ কুমার, প্রধান সহকারি জালাল উদ্দিন ও অফিস সহকারি মো. ফোরকানকে ঘুষ দেন। তাদের প্রত্যেকের এমপিও’র জন্য দিতে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা কলেজের প্রভাষক মো. গোলাম মুর্তজা তার এমপিও’র ফাইল না ছাড় করায় জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে দেখা করেন। তখন ওই কর্মকর্তা তার এমপিও’র জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু তিনি সেই টাকা না দেওয়ায় তার এমপিও’র আবেদন এখনো পাঠানো হয়নি। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার কাশিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. জাহিদুল হক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আল আজাদকে তার এমপিও’র জন্য ২৫ হাজার টাকা ঘুষ প্রদান করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. মাহবুবা আক্তার তার এমপিও’র জন্য জেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহীন আকতারকে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করেন। বরিশালের বানাড়িপাড়ার হাজী তাহের উদ্দিন ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক সখিনা বেগম সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. অলি আহাদকে এমপিও’র জন্য ৬০ হাজার টাকা প্রদান করেন। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার শচীন্দ্র ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক শিমুল জাহান তার এমপিওর জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের প্রোগ্রামার সম্পদ রায় ও কর্মচারি মো. জালালকে পৃথকভাবে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করেন।

 ডিডিদের নিয়ে দৈনিক সমকালের একটি প্রতিবেদন পড়ুন : মাউশির আঞ্চলিক অফিস মানেই ঘুষের হাট

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর