বৃহস্পতিবার ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৮:০৫ পিএম


যেভাবে প্রাথমিক শিক্ষা হবে জীবনমুখী

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রকাশিত: ০২:৩০, ১৯ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০২:৩২, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

শিক্ষার সঙ্গে কল্পনাশক্তি প্রয়োগের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কল্পনাশক্তি মানুষের মধ্যে চিন্তাশক্তি সৃষ্টি করে। এ চিন্তাশক্তির প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ঘটতে পারে। এর কারণ হচ্ছে, সব মানুষ একরকমভাবে ভাবতে পারে না; বরং ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মানুষ ভাবতে পারে বলে ভাবনার বৈচিত্র্য পৃথিবীকে নতুন নতুন ধারণা দিয়ে প্রভাবিত করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে শিশুদের ভাবনা গতানুগতিক ও একমুখী না হয়ে আধুনিক ও বহুমাত্রিক হতে পারে।

প্রকৃতিকে শিক্ষার একটি উপাদান হিসেবে প্রয়োগ করা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে শিশুদের প্রকৃতিবান্ধব করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। রবীন্দ্রাথের শিক্ষাচিন্তায় প্রকৃতি, মানুষ ও শিক্ষার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বয় ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথ তার শিক্ষা দর্শন থেকে মনে করতেন, শিক্ষা হতে হবে উদার ও খোলা প্রকৃতির বুকে, উন্মুক্ত আকাশের নিচে।

চার দেয়ালের মধ্যে অবরুদ্ধ শিক্ষাকে তিনি খোপওয়ালা বড় বাক্স ও যান্ত্রিক শিক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি শান্তিনিকেতনে বসে প্রকৃতি, মানুষ ও শিক্ষার সমন্বিত প্রভাব নিয়ে গবেষকের মতো হাতে-কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এ গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রকৃতির সংস্পর্শে শিশুর দেহ-মন বিকশিত হয়। প্রকৃতির অবারিত বৈচিত্র্য থেকে অর্জিত শিক্ষায় প্রাণের টান থাকে, যা মানুষের ভেতরের ঘুমন্ত সত্তাকে বের করে এনে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মনোভাব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।

চার দেয়ালের মধ্যে গতানুগতিক ধারার প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের মনের ভেতরের ভাবনাগুলোকে উদার না করে বরং তা রক্ষণশীল করে তুলছে। মন আরও বড় হয়, উদার হয়; যখন প্রকৃতি শিক্ষায়তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার মনোভাব গড়ে তোলা যেতে পারে। এর কারণ হল, বইয়ের পাতায় কোনো একটি বিষয়ের ছবি ও আলোচনা থাকলেও প্রকৃতিতে তা বাস্তবে দেখা ও বোঝা যায়। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহও বাড়ে।

কাল্পনিক শিক্ষা বাস্তব শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়ে শিক্ষার্থীর মনে ইতিবাচকভাবে রেখাপাত করে। যেমন বইয়ের মধ্যে একটি বা দুটি গাছের ছবি ও বর্ণনা থাকলেও প্রকৃতির মধ্যে নানা বৈচিত্র্য ও শ্রেণির বৃক্ষরাজির প্রত্যক্ষ দেখা মেলে। মুক্ত আলো, মাটি, পানি ও বাতাসের সান্নিধ্যে এসে শিক্ষার্থীর মন বাস্তবতাকে খুব কাছাকাছি দেখে আনন্দিত হয়।

প্রকৃতি থেকে অর্জিত শিক্ষা শিক্ষার্থীর চিন্তাকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে তা আমৃত্যু জ্ঞানের উপাদানে পরিণত হয়। প্রকৃতির বুকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের পাখি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেতে পারে। এ পাখি থেকে শেখার মতো অনেক কিছু আছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন নতুন চিন্তাধারা তৈরি করতে পারে। আবার পাখিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যও আছে। এ বৈচিত্র্য শিক্ষার্থীদের চিন্তারধারাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এক সময় এ চিন্তা পরিণত হয়ে পৃথিবীকে বদলে দেয়ার অসীম সম্ভাবনা রাখে। বিমানের ডানাগুলো পাখির ডানাকে অনুকরণ করে তৈরি করা হয়েছে। এ ধারণা এসেছে মানুষ যখন পাখিকে উড়তে দেখেছে।

মানুষের মনেও উড়ার ইচ্ছা সৃষ্টি হয়েছে। পাখিকে কেন্দ্র করে মানুষের ধারণা থেমে থাকেনি; বরং নানাভাবে মানুষ পাখির ডানাকে বিশ্লেষণ করে তার ব্যবহারের পরিধি বাড়িয়ে চলেছে। সম্প্রতি নিউ সায়েনটিস্ট ম্যাগাজিন তাদের একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে, গাংচিলের বাতাসে ভাসমান থাকা, শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং প্রবল গতিতে ওপরের দিকে ওঠার ক্ষমতা দেখে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পাইলটবিহীন রিমোট-কন্ট্রোলচালিত এক বিমান নির্মাণ করেছে।

ন্যাশনাল আ্যরোনটিকস্ অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনেক পায়ের আদলে এক ধরনের রোবট উদ্ভাবন করেছে, যেটির হাঁটার ধরন অনেকটাই বৃশ্চিকের মতো। ফিনল্যান্ডের প্রকৌশলীরা ছয় পা-সম্বলিত এক ধরনের ট্র্যাক্টর তৈরি করেছে, যেটি অনেকটা বড় কীটপতঙ্গের মতো করে উঁচু-নিচু ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে পারে। পাইনগাছের ফল যেভাবে খোলে ও বন্ধ হয়, সেটিকে অনুসরণ করে বিজ্ঞানীরা ছোট ছোট ফ্ল্যাপযুক্ত এক ধরনের কাপড় বানিয়েছেন। ব

বক্সফিশের পিচ্ছিল দেহকে বিবেচনায় নিয়ে এক ধরনের পিচ্ছিল বৈশিষ্ট্যের গাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। শামুকের ঝাঁকুনি কমানোর বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রেখে বিভিন্ন গবেষক শরীরের ওপরের অংশকে আবৃত করে রাখার জন্য হালকা ও শক্ত ধরনের মানববর্ম তৈরি করেছে। উদ্ভিদকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভিদের প্রাণ আছে বলে প্রমাণ করেছেন।

এভাবে প্রকৃতি মানুষের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়েছে বহুমাত্রিক ধারায়। প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের শিক্ষার্থীদেরও চিন্তাধারাকে আনন্দধারায় পরিণত করে প্রকৃতি এগিয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখে। প্রকৃতির সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বিভিন্ন খেলার উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। যে খেলার উপাদানগুলো শিক্ষা উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হলে শিক্ষার্থীদের মনে যেমন আনন্দ যোগ হবে; তেমনি তাদের শেখার আগ্রহ বাড়বে।

এ খেলার শিক্ষা উপকরণগুলো গবেষণার মাধ্যমে বের করে আনতে হবে। শিক্ষা গবেষক এবাদ আলী শিক্ষা উপকরণ হিসেবে বিশেষায়িত জ্যামিতি বক্স আবিষ্কার করেছেন। এটিকে একটি আনন্দদায়ক শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এখানে বিশেষ মাপের ২২টি কাঠি আছে।

শিক্ষার্থীরা তাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে এ কাঠিগুলোর মাধ্যমে বিন্দু, রেখা, সরল রেখা, বক্ররেখা, সমান্তরাল রেখা, তীর, ভেক্টর রেখা, কোণ, সমকোণ, সূক্ষ্ম কোণ, স্থুল কোণ, প্রবিদ্ধ কোণ, একান্তর কোণ, অনুরূপ কোণ, বিপ্রতীপ কোণ, সরল কোণ, সন্নিহিত কোণ, পূরক কোণ, সম্পূরক কোণ, ত্রিভূজ, সমকোণী ত্রিভূজ, সূক্ষ্ম কোণী ত্রিভূজ, স্থুল কোণী ত্রিভূজ, সমবাহু ত্রিভূজ, সমদ্বিবাহু ত্রিভূজ, বিসমবাহু ত্রিভূজ, চতুর্ভূজ, বর্গ, রম্বস, আয়তক্ষেত্র, কর্ণ, ট্রাপিজিয়াম, বৃত্ত, কেন্দ্র, ব্যাস, ব্যাসার্ধ, ভূমি, লম্ব, অতিভূজ, বৃত্তচাপ বৃত্তের স্পর্শক, ছেদক, জ্যা নিজেরাই তৈরি করতে পারবে। বাংলায় এক থেকে নয়, বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা তৈরি ও খেলার মাধ্যমে এ কাঠিগুলো দিয়ে শিক্ষার্থীরা আম, কলা, পাতা, ছাতা, মাছ, পাখি, কুলা, জগ, বালতি, রোবট, বাড়ি, আপেলসহ বিভিন্ন প্রকৃতি ও আকৃতির শৈল্পিক ধারণা সৃষ্টি করতে পারবে।

এ ধরনের আরও সৃজনশীল খেলার কাঠামো তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মনোজগতকে প্রভাবিত করা যেতে পারে। শিশুদের গল্পের মাধ্যমে শেখানোর কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। জীবনাচরণের বিষয় থেকে শুরু করে বাংলা, ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞানসহ সব বিষয়ে গল্পের উপাদান থাকলে, তা শিক্ষার্থীকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

পাঠ্যবইগুলো লেখার ক্ষেত্রেও সহজবোধ্য ও গল্পের আদলে বিষয়গুলোর লেখা থাকলে, তা শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করতে পারে। মুখস্থকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। শিক্ষা যত আনন্দদায়ক হবে, শিক্ষার্থীর আচরণকে সেটি ততো মানবিক ও সৃজনশীল হতে সহায়তা করবে। এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনোবিজ্ঞানীদের দিয়ে শিশুর মনকে বিশ্লেষণ করে শিশুর মেধার বিকাশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হল, কীভাবে শিক্ষার্থীদের চাপমুক্ত রেখে শিক্ষাকে উদার, সর্বজনীন ও আনন্দদায়ক করা যায়। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হল, এস্তোনিয়া এবং ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি নেই। বয়সভিত্তিক মেধাকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নভিত্তিক ফলাফল কেবল পৃথক পৃথকভাবে অভিভাবকদের দেখানো হয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের মূল্যায়নের বিষয়ে না জানলেও যে জায়গাগুলোতে তাদের দুর্বলতা ও ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো ক্রমান্বয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পূরণ করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা নিজের বন্ধুদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখে থাকে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মতো করে শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ না দিয়ে বরং বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা টানতে হয় না। বিভিন্ন ধরনের গবেষণালব্ধ বইগুলো শিক্ষায়তনের মধ্যেই থাকে। কারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থেকে শিক্ষায়তনের মধ্যেই জ্ঞান অর্জন করে থাকে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে জীবনমুখী ও জ্ঞানভিত্তিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা উপাদান, শিক্ষা পদ্ধতি, ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতিসহ সর্বজনীন বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে; তবেই প্রাথমিক শিক্ষা হয়ে উঠবে চিন্তাশক্তি বের করার পরিপূরক।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর -যুগান্তর

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর