মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ১৭:০৭ পিএম


মেধাবীরা শেষ পছন্দে রাখেন শিক্ষকতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:৪৫, ৫ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ০৮:৫৫, ৫ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগের লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার হওয়া। বিসিএসে ২৬টি ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে একটি শিক্ষা। কিন্তু মেধাবীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে প্রশাসন, পররাষ্ট্র, ট্যাক্স ইত্যাদি। পছন্দের তালিকায় শেষ দিকে থাকে শিক্ষা। শিক্ষা ক্যাডারে অনেক বেশি পদ থাকায় অনেকে শেষ পছন্দ হিসেবে শিক্ষাকে রাখেন, যাতে চাকরিটা হয়। আর একেবারে অন্য কোনো চাকরি না পেয়ে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকতায় আসেন বেশির ভাগ চাকরিপ্রার্থী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে প্রার্থীর পছন্দের তালিকায় শিক্ষকতা নেই, তিনি জোর করেও এই চাকরিতে মন বসাতে পারেন না। ফলে শিক্ষকতা শুরু করলেও চেষ্টায় থাকেন অন্য চাকরির। যাঁরা শেষ পর্যন্ত পেশা বদলাতে পারেন না তাঁরা প্রাইভেট, কোচিংসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে এখন রাজনৈতিক পরিচয়, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন এক নম্বর যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে মেধাবীদের স্থান নেই। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

এ অবস্থায় সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও আজ শনিবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০১৯’। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলোচনাসভা, সেমিনারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকছে দিবসটির কার্যক্রম। শিক্ষক দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘তরুণ শিক্ষকরাই পেশার ভবিষ্যৎ’। তবে বিশ্বের অন্য দেশে এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য যথাযথ হলেও বাংলাদেশে ভিন্ন। কারণ দেশের তরুণদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ নেই। যাঁরা আসেন তাঁরা বেশির ভাগই বাধ্য হয়ে।

বিশ্বের অনেক দেশেই প্রথম মর্যাদাবান পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। আর্থিকভাবেও শিক্ষকরা বেশি বেতন পান। ফলে তরুণ, মেধাবীদের প্রথম পছন্দের চাকরি শিক্ষকতা। ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা শেষ করা সবচেয়ে মেধাবীরা আসেন শিক্ষকতায়। সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হতে হলে এক বছরের একটি কোর্স করতে হয়। সেখানে সবচেয়ে যাঁরা ভালো করেন তাঁরা সুযোগ পান প্রাথমিকে, এরপর মাধ্যমিকে, সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক এবং সোশ্যাল রিসার্চের গত বছরের এক গবেষণায় দেখা যায়, চীনের ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করেন, শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই গড় মাত্র ৩৫ শতাংশ। বিশেষ করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয়, সেখানে এসব দেশের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করছেন। তার অন্যতম কারণ, মর্যাদা আছে বলে ভালো শিক্ষক পাওয়া এবং ধরে রাখাও সহজ হয় এসব দেশে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘যারা মেধার চর্চা করতে পারবে, তাদেরই শিক্ষকতায় আসা উচিত। একজন শিক্ষককে তার বিষয়ের আপডেট খবর রাখতে হবে। কিন্তু সেই চিন্তাধারার লোকের ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে। কিভাবে সহজভাবে ওপরে ওঠা যায়, সেই চিন্তা বেশির ভাগ তরুণের। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষকতায় আসতে চায় না। এ ছাড়া মেধাবীদের শিক্ষকতায় টানতে আরেকটু সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।’

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু মেধাবী শিক্ষক থাকলেও তাদের অনেকে পিএইচডিসহ উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে আর ফেরেন না। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৩৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৮০ জন। এর মধ্যে দুই হাজার ৯৬ জন শিক্ষা ছুটিতে। যাঁরা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে আর দেশে ফেরেন না।

ইউজিসিও তাদের প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, প্রতিবছর দেশের সদ্য স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত সেরা শিক্ষার্থীরা পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। পরে তাঁদের বেশির ভাগ দেশে ফেরেন না। এতে দেশ মেধাবী তরুণদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলছেন, সরকার কিভাবে মেধাবীকে মূল্যায়ন করছে ভেবে দেখতে হবে। মেধাবীদের মধ্যে যাঁরা বিদেশে চাকরি করছেন তাঁদের অনেকে দেশেও কাজ করতে চান। কিন্তু তাঁদের সুবিধা দরকার তা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কিভাবে মেধাবীদের ধরে রাখতে হবে সেই চিন্তাও সরকারকে করতে হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় পুরোটাই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এসব স্কুলে এত দিন নিয়োগ দিত স্কুল ম্যানেজিং কমিটি। যারা টাকার বিনিময়ে যোগ্যতা না দেখেই শিক্ষক নিয়োগ দিত। যদিও ২০১৫ সালের পর থেকে শিক্ষক নিয়োগে আর ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা বেশি পিছিয়ে পড়ছে।

প্রাথমিকের শিক্ষকরা মর্যাদার দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে। যদিও সরকার প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছে। তবে তাঁঁদের বেতনের দিক থেকে এখনো দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়নি।

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির মুখপাত্র এস এম ছায়িদ উল্লা বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষকদের স্থান সবার ওপরে। অথচ আমাদের দেশের প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হলেও বেতন এক গ্রেড নিচে। এখন যাঁরা শিক্ষকতায় আসছেন তাঁরা সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। সরকার যদি শিক্ষকদের এইটুকু মর্যাদা না দেয় তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে মেধাবীরা আর প্রাথমিক শিক্ষায় আসবেন না।’

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর