সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২০ ৬:৩১ এএম


মুজিববর্ষে কার কি দাবি

আফতাব তাজ

প্রকাশিত: ১২:২১, ১৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৯:২৩, ১৭ মার্চ ২০২০

আজ থেকে শুরু হলো মুজিববর্ষ। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীকে স্বরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যে সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা চাকরি প্রার্থী কিংবা শিক্ষক সংগঠনগুলোও তাদের দাবি আদায়ে মুজিববর্ষকেই বেছে নিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে জাতীয়করণ, পদসৃজন, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫করা, মাধ্যমিক শিক্ষকদের স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের দাবি উল্লেখযোগ্য। আজ এডুকেশন বাংলা`র পাঠকদের জন্য তেমনই কিছু দাবির কথা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

ইবতেদায়ি শিক্ষকরা চায় জাতীয়করণ

মুজিববর্ষে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ ও বেতন পরিশোধ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেয়া সহ ৭ দফা দাবি রয়েছে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির। বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী ফয়জুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে মাদ্রাসা শিক্ষকরা সব সময় সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এ সরকার শিক্ষকবান্ধব সরকার। আশা করি, মুজিববর্ষেই তিনি শিক্ষকদের দাবি মেনে নেবেন। দাবি মানা না হলে টানা রাজপথে অবস্থান করার হুমকি দেন এ শিক্ষক নেতা।
 উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে সরকারি এক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের জন্য দেশে বেসরকারি বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। এর মধ্যে ২৬ হাজার ১৯৩ প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়েছে। এর আগে এগুলো ধাপে ধাপে জাতীয় বেতন স্কেলের অধীনে আসে। কিন্তু একই সময়ে অভিন্ন আইনের বলে প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও উপেক্ষিত থাকে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি (যা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত) মাদ্রাসা। তারা মাত্র ৫শ’ টাকা করে মাসোহারা পেয়ে আসছিলেন।

এমন অবস্থায় ২০১০ সালে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কপাল খোলে। প্রথমে মাসোহারা ১ হাজার টাকা করা হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় তা বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করা হয়। এরপর তৃতীয় দফায় সহকারী শিক্ষকদের (মৌলভী) সম্মানী ২৩শ’ আর প্রধান শিক্ষকদের ২৫শ’ টাকা করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। স্কুলের মতো মাদ্রাসাও জাতীয়করণের জন্য তারা দাবি তোলেন। দাবি আদায়ে সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে আন্দোলনে নামেন তারা। শিক্ষামন্ত্রী তখন প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রেখে ঘরে ফিরে যেতে শিক্ষকদের আহ্বান জানান।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, সারা দেশে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে নিবন্ধিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৮ হাজার ১৯৪টি। এর মধ্যে চালু আছে ১০ হাজারের মতো। এসব মাদ্রাসায় শিক্ষক আছেন প্রায় ৫০ হাজার। সরকারকে সবার দায়িত্ব নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষা শুরু হয়। প্রথমে বিনা বেতনে মাদরাসার কার্যক্রম চালু করা হয়। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী ৬৯৯৮টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা রয়েছে। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদরাসার সংখ্যা ১৫১৯টি। এসব মাদরাসায় ৫১ হাজার ৯৯৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৫ হাজার ২৪৩ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষক নেতাদের দাবি, এর বাইরেও আরও অনেক মাদরাসা রয়েছে। যেসব মাদরাসার কোড ও ইআইআইএন নম্বর নেই।

শিক্ষকরা জানান, ১৯৮৪ সালে ৭৮ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বতন্ত্র মাদরাসা নিবন্ধন শুরু হয়। তখন থেকেই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকরা সরকারের নিয়মনীতি অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন। একই কারিকুলামে পাঠদান করা হয়। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতোই সরকারের সব কাজে অংশ নেন তারা।

এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি

মুজিববর্ষেই এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে জাতীয়করণ এবং বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি রয়েছে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ), বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের। সংগঠনগুলোর দাবি বিচ্ছিন্নভাবে জাতীয়করণ না করে একসঙ্গে জাতীয়করণের ঘোষণা হলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। মুজিববর্ষে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করে সেই আলো শিক্ষকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।

এছাড়া শিক্ষকদের অন্যান্য দাবি হচ্ছে- সরকারি শিক্ষকদের মতোই অন্তর্বর্তীকালীন বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা প্রদান; ব্যবস্থাপনা কমিটির অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা; স্কুল পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ন্যূনতম ডিগ্রি পাস ও কলেজ পর্যায় গভর্নিং কমিটিতে মাস্টার্স পাস ও স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তিদের মনোনীত করা; মাউশি, এনসিটিবি, নায়েম, ব্যানবেইসসহ বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া; মুজিববর্ষে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মুক্তিযুদ্ধ চেতনাবিরোধী ও দুর্নীতিবাজদের অপসারণ।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার দাবি

মুজিববর্ষেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করাসহ ৪ দফা দাবি রয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্রকল্যাণ পরিষদ, বেকার মুক্তি আন্দোলন, জাতীয় যুব কল্যাণ ঐক্য পরিষদের ।

সংগঠনের নেতারা বলছে, কর্মসংস্থান ও চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে অহিংস আন্দোলন করে আসছি। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন এ দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের সব নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন।

 তাদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থার কারণে যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ৩০ বছর পার করে ফেলেন সেসব মেধাবী শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রের উন্নতিতে কাজে লাগাতে চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ করা একটি যৌক্তিক দাবি। কিন্তু দুঃখের বিষয় দীর্ঘদিন এই যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলন করা হলেও সরকার কোনো তোয়াক্কা না করে বেকার শিক্ষিত সমাজকে অপমান, অবহেলা, অবমাননা করছে।

আন্দোলনকারীদের দাবিসমূহ হলো: (বিশেষ দফা) উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে; চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা বৃদ্ধি করে ৩৫ বছরে উন্নীত; চাকরিতে আবেদন ফি কমিয়ে (৫০-১০০) টাকার মধ্যে নির্ধারন; নিয়োগপরীক্ষাগুলো জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে নেয়া; ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নসহ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। এ দাবিগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে বাকি সংগঠগুলোর ‘১ কোটি ৫০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে’ দাবিও যুক্ত করা হয়েছে।

স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর দাবি

মুজিববর্ষেই স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন, বকেয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড দ্রুত প্রদান, সিনিয়র শিক্ষকসহ সকল শূন্যপদে দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা, এন্ট্রি পদ ‘সহকারী শিক্ষক’ ৯ম গ্রেডে উন্নীতকরণ, নতুন আত্তীকরণ বিধিমালা প্রণয়ন, উপ-পরিচালকসহ অন্যান্য পদের বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ ও নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট ঘোষণার দাবি রয়েছে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির (বাসমাশিস)।

সরকারিকৃত সব শিক্ষক-কর্মচারিদের অ্যাডহক নিয়োগ ও পদসৃজনের দাবি

মুজিববর্ষের মধ্যেই সরকারিকৃত সব শিক্ষক-কর্মচারিদের অ্যাডহক নিয়োগ ও পদসৃজনের দাবি রয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদের ।

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, দেশের যেসব উপজেলায় স্কুল ও কলেজ নেই, সেসব উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের আগস্টে ২৭১টি কলেজ জাতীয়করণের সরকারি আদেশ জারি হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও ২৮টি কলেজসহ সরকারের গত আমলে মোট ২৯৯ কলেজ জাতীয়করণ করা হয়। এরপর দেখা দেয় নতুন সমস্যা। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাবি ছিল- সরকারি করা কলেজের শিক্ষকদের নন-ক্যাডার রাখতে হবে। এ জন্য তারা দীর্ঘদিন আন্দোলনও করেন। আর সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের দাবি ছিল তাদেরও ক্যাডারভুক্ত করার।

দুই পক্ষের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮’। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসার পর প্রায় দশ হাজার কলেজ-শিক্ষক ও ছয়-সাত হাজার কর্মচারী ভেবেছিলেন শিগগির তাদের সুদিন আসবে। কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষার প্রহর আজও শেষ হয়নি।

তাদের দাবি পদসৃজনের কাজে তাদের অযাচিত ‘নোট’ ও ‘মন্তব্য’ করার কারণে অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারীর সরকারিকরণের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই তারা বছরের পর বছর ধরে আটকে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা-সরকারি কলেজবিহীন উপজেলা সদরে একটি করে কলেজ সরকারিকরণ। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকরা। কলেজ সরকারি হলেও সরকারি কোনও সুবিধা কেউই পাননা।

এক স্মারকলিপিতে বলা হয়, শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রেই সরকারিকৃত তিনশতাধিক কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক কেউই সরকারিকরণের সুফল পাচ্ছেন না। এখনও পর্যন্ত একজন শিক্ষকেরও পদসৃজন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক কর্মচারিদের মধ্য থেকে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক কর্মচারি সরকারিকরণের সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়ে শূন্য হাতে অবসরে চলে গিয়েছেন। শিক্ষার্থীরাও কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

স্মারকলিপিতে শিক্ষক নেতারা আরও বলেন, কর্তৃপক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণের বাইরে থেকে গেলে তাদের পক্ষে বয়সের কারণে নতুন চাকরিতে যোগদান করা এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা পরিবার, পরিজন ও সমাজের কাছে মুখ দেখানোই দায় হয়ে দাঁড়াবে। একইসাথে সরকারিকৃত কলেজের সব শিক্ষক কর্মচারিদের মুজিববর্ষের মধ্যই পদসৃজন ও অ্যাডহক নিয়োগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন শিক্ষক নেতারা।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

 

 

 
সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর