শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৪:৩৭ পিএম


মিড ডে মিল’ ও দরিদ্র স্কুল ছাত্র-ছাত্রীর পুষ্টি

স্বদেশ রায়

প্রকাশিত: ১১:০৮, ২২ আগস্ট ২০১৯  

এ মাসেরই ১১ তারিখে কলকাতায় সাংবাদিক বন্ধু সুকান্ত সরকার এবং তার স্ত্রী বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী ও বালি গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতি মনিদীপা সরকারের সঙ্গে বসে নানান আলাপ প্রসঙ্গে আসে স্কুলের ‘মিড ডে মিলে’র কথা। মনিদীপা বলেন, তিনি প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে প্রায় দুই বছর তার স্কুলে মিড ডে মিল ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। তখন তিনি ভাবতেন, স্কুল পড়াশোনার জায়গা, এখানে রান্নাবান্না, খাওয়া দাওয়া চালু করলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। এখন তিনি অনুশোচনায় ভোগেন।

মনে করেন, ওই দুই বছর মিড ডে মিল চালু ঠেকিয়ে রেখে তিনি অনেক ভুল করেছেন। কারণ, এখন তিনি প্রত্যক্ষ করেন, অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে তারা পেট ভরে খায় কেবল স্কুলের দেওয়া মিলটা। তার দেওয়া অনেক উদাহরণের ভেতর কয়েকটি এমন—তিনি লক্ষ করেন, তার একজন ছাত্রী দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা সামনে। তাই একদিন তিনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি ডিম-টিম খাও? সে বলে, দিদিমণি স্কুলে যেদিন ডিম হয়, ওই দিন খাই। আরেকজন ছাত্রী, খেলাধুলা করে। কিন্তু সে পড়াশোনায় ভালো করছে না দেখে তিনি তার কাছে জানতে চান, তার কি কোনও অসুবিধা হচ্ছে? তার উত্তরে ওই মেয়েটি যা বলে তার সারাংশ এমনই, সকালে সে খুব সামান্য খেয়ে, কোনোদিন এক অর্থে না খেয়ে স্কুলে আসে। তারপরে দুপুরে শুধু স্কুলের মিলটা পেট ভরে খায়। এরপরে স্কুল শেষে প্র্যাকটিস করে যখন সে বাসায় যায়, তখন তার শরীরে অবসন্নতা নেমে আসে। রাতে ওইভাবে খাবার পায় না। তখন সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার পক্ষে আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয় না।

খাবারের অভাবে যে পড়াশোনা ভালো করতে পারে না, এটা জীবনে প্রথম জানতে পারি আমার এক পিসিমার কাছে। তিনি আমার শিক্ষকের বড় বোন, তাই তাকে পিসিমা ডাকতাম। তখন কেবল কলেজ ছেড়েছি। বছর সতের বয়স। সুকান্ত পড়া হয়ে গেছে অনেক আগে। মার্কসও পড়ছি। পৃথিবীতে ক্ষুধা আছে জানি। তবে সেসব আমার কাছে কবিতার ভাষায় আর মার্কসের তত্ত্বে। এর বাস্তবতা প্রথমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন পিসিমা। তিনিও একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা। একদিন কথা প্রসঙ্গে পিসিমা বলেন, গ্রামের অধিকাংশ ঘরের মেয়েরা পড়াশোনায় ভালো করতে পারে না খাবারের অভাবে। আমাদের গ্রামের পরিবারগুলোতে মেয়েদের সাধারণত কম খাবার দেওয়া হয়। তাছাড়া পুষ্টিযুক্ত যে খাবারগুলো যেমন—ডিম, দুধ, ফল, মাছ, মাংস, তার সিংহভাগ ছেলেদের খেতে দেওয়া হয়। তাই এই পুষ্টির অভাবেই মেয়েরা পড়াশোনায় খারাপ করে। তিনি তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এটা খুব নিবিড়ভাবে দেখেছেন। তিনি আরো বলেন, দরিদ্র ঘরের মেয়েদের তো খাবার ততটুকু জোটে, যতটুকু পুরুষরা খাবার পরে অবশিষ্ট থাকে।

ছোটবেলা থেকে বোর্ডিংয়ে, হোস্টেলে মানুষ। নিজের বাড়ি, বন্ধুর বাড়ি, মামাবাড়ি, এছাড়া খুব কোনও বাড়ির অন্দর মহল সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না ওই সময়ে। তাই পিসিমার কথায় সেদিন একটি নতুন পৃথিবী সামনে হাজির হয়। তারপরে ছাত্ররাজনীতি, সাংবাদিকতা পেশা এই দুইয়ের কারণে অতি সাধরণ ঘর শুধু নয়, বস্তিবাসীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। তখন মনে হয়েছে পিসিমা যেন একটা নতুন পৃথিবী আমার চোখের সামনে খুলে দেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, কেন আমাদের দেশে অধিকাংশ মেয়ে খাটো হয়, কেন ইউরোপে ছেলেমেয়ে সবাই প্রায় সমানই লম্বা। তাছাড়া পরবর্তী সময়ে আরো লক্ষ করি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ছেলেমেয়েদের আশির দশকে যে হাইট ছিল এখন সেটা বেড়ে গেছে। তারও মূল কারণ সুষম খাদ্য।

যাহোক, মনিদীপা’র সঙ্গে কথা হচ্ছিল ১১ তারিখে। আর ১৯ তারিখ জানতে পারলাম শেখ হাসিনা কেবিনেটে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ২০২৩ সালের মধ্যে সব প্রাইমারি স্কুলে মিড ডে মিল চালু হবে। তখন প্রথমেই মনিদীপার কণ্ঠটি যেন কানে ভেসে এলো, ‘তুমি ডিম-টিম খাও, ছাত্রীটি উত্তর দিলো যেদিন স্কুলে ডিম হয় ওই দিনই ডিম খাই।’ বাস্তবে এখনও বাংলাদেশে মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ মানুষ প্রতিদিন ডিম খায়। আবার এখানে যদি পিসিমার কথা মনে করি তাহলে নিঃসন্দেহে ধরে নেওয়া যায় এই পাঁচ ভাগের সাড়ে তিন ভাগ পুরুষ আর দেড় ভাগ নারী ডিম খায়। পিসিমা পৃথিবী ছেড়ে গেছেন অনেক দিন হলো। তারপরে পদ্মা দিয়ে অনেক পলি বঙ্গোপসাগরে গেছে, কিন্তু আমাদের মানসিকতায় সেই পলি কোনও নতুন উদ্ভিদের জন্ম দিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এখনও সমাজে নারী একটি শোষিত জনগোষ্ঠী। এমনকি সে ধর্ষিতা হলেও খোঁজা হয় তার কোনও ত্রুটি ছিল কিনা? অনেক ধর্মীয় নেতা শুধু নয়, ভদ্রলোকরাও বলেন, তার পোশাকের কারণে সে ধর্ষিতা হয়েছে। আবার অনেক বড় ধর্মীয় নেতা বলেন, মেয়েদের যেন তিন ক্লাসের বেশি শিক্ষা দেওয়া না হয়। তাই সে সমাজে এখনও যে আশি ভাগ মেয়ে ডিম খেতে পায় না, এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই ১৯ তারিখ কেবিনেটের সিদ্ধান্তের পরে মনে মনে ধন্যবাদ জানাই শেখ হাসিনাকে। তিনি অন্তত প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে ২০২৩ সালের মধ্যে সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন হলেও ডিমের ব্যবস্থাটা করলেন।

এই সময়ে মনে পড়লো কবি সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ ভাইয়ের কথা। ১৯৯৬-তে শেখ হাসিনা প্রথমে ক্ষমতায় এসে কিবরিয়া সাহেবকে অর্থমন্ত্রী করলেন, তখন মনে মনে একটু উদ্বিগ্ন হই। কারণ, কিবরিয়া সাহেব একজন ভালো আমলা। রাজনীতিতে তার যেমন পদচারণা কম ছিল, তেমনি সাধারণ সমাজেও। অতত্রব অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি কি সফল হবেন, এই নিয়ে মনের ভেতর একটা শঙ্কা জাগে! কারণ, ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় এসেছে। ওই সরকারের ওপর তখন মানুষের আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা। সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ ভাই পলিটিক্যাল সায়েন্সের মানুষ হলেও পলিটিক্যাল ইকোনমিতে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তাই আতিকুল্লাহ ভাইকে বলি, ভাই, শাহ এমএস কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী হিসেবে কেমন করবেন বলে আপনি মনে করছেন? তিনি বলেন, দেখো, এখানে কিবরিয়া কোনও ফ্যাক্টর নয়। মূল ফ্যাক্টর শেখ হাসিনা। আর তিনি দেশের অর্থনীতি শুধু নয়, গোটা দেশকে খুব ভালো বুঝবেন। কারণ, শেখ হাসিনা একটি যৌথ পরিবারের মেয়ে। এই যৌথ পরিবারের শিক্ষিত মেয়েরা দেশকে, সমাজকে যত গভীর চোখে দেখে, এমনটি প্রায় কেউ দেখতে পায় না। ১৯ তারিখ তাই আবার মনে পড়লো, আতিকুল্লাহ ভাইয়ের কথা। হ্যাঁ, সত্যি শেখ হাসিনা দেশকে অনেক বেশি জানেন। আর তাই প্রাইমারি স্কুলে মিড ডে মিল চালু করে তিনি যেমন দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পেট পুরে এক বেলা খাবার ব্যবস্থা করলেন, তেমনি দরিদ্র মেয়েদের সপ্তাহে একদিন হলেও ডিম ও মাংস খাবার ব্যবস্থা করলেন।

ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে যতটুকু বুঝি তাতে বলতে পারি, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বলতে যা বোঝায়, এই পদক্ষেপটি তার একটি। কারণ, দেশের শিশুদের যতক্ষণ না সুস্বাস্থ্য হবে ততক্ষণ ওই দেশ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের পথে নয়। মিড ডে মিল পুরোপুরি সুস্বাস্থ্য না দিলেও ওই পথে অন্তত এক পা এগোলো। তবে শুরুতেই শেখ হাসিনাকে লক্ষ করতে হবে, এই মিড ডে মিল যেন দুর্নীতির কবলে না পড়ে। কারণ, আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর খাদ্যের জন্য যা বরাদ্দ থাকে তার অর্ধেকও কিন্তু রোগী পায় না। এর মূল কারণ যারা খাবার সাপ্লাই দেয়, তাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ যোগসাজশ করে অর্ধেকের বেশি টাকা চুরি করে। যেহেতু জাতি হিসেবে আমরা অন্তত এইটুকু মেইনটেইন করতে পারি না রোগীর খাবার থেকে চুরি নয়, তখন ভয় থেকে যায়, কচি মুখের খাবার থেকে আবার চুরি করি কিনা? এই চুরি যাতে না হয়, সেজন্য শেখ হাসিনাকে কোনও না কোনও একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, দরিদ্র কচি শিশুগুলো পেট পুরে খাবে, তাদের শরীরে পুষ্টি নামবে—এ অনেক আনন্দের বিষয়। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনারও অনেক আনন্দের বিষয় এটি। এই আনন্দ যেন মাটি না হয়।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর