মঙ্গলবার ০২ জুন, ২০২০ ১৭:৫৩ পিএম


মামলার কারণে সরকারি চাকরিতে হাজার হাজার পদ শূন্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:৪৩, ১ জানুয়ারি ২০২০  

পাঁচ সহস্রাধিক মামলার বোঝা বইছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ দিন ধরে এ নিয়ে কেউ গা করেনি। এখন সংকট দেখা দিয়েছে। এসব মামলার কারণে সরকারি চাকরিতে হাজার হাজার পদ শূন্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পরও ওই শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না। ফলে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও গতি কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে দুই যুগ ধরে ঝুলে থাকা স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর একাধিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়সংশ্নিষ্ট পাঁচ হাজার ৩৭৪টি মামলা আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এসব মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা বা সময়মতো পদক্ষেপ নিতে না পারায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রায় সরকারের বিপক্ষে গেছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সময়মতো নজর দিলে এ পরিস্থিতি হতো না। মামলার স্তূপ বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাষ্ট্রের আইনজীবী, আইন শাখার কর্মকর্তারা থাকার পরও এখন বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে আসা এসব মামলার বিবাদী সচিবসহ বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের প্রধানরা।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, চাকরি স্থায়ী ও একীভূতকরণ, পেনশনসহ বিভিন্ন কাজ করতে হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে। এসব কাজে বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর মধ্যে রয়েছে বেতন স্কেল বাড়ানো, পদোন্নতি, প্রকল্পভুক্ত ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরতদের চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়। বিভাগীয় পর্যায়েও অনেক মামলা রয়েছে। এসব মামলার কারণে প্রশাসনের শূন্য পদে জনবল নিয়োগ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ বাদে সব রাষ্ট্রে আইন ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন। আর সরকারের আইন ক্যাডার না থাকায় অজান্তেই প্রতিনিয়ত অনেক আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অগণিত মামলা হয়। তিনি বলেন, দেশে অস্থায়ী ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হয়। এ কারণে সরকার বেশিরভাগ মামলায় হেরে যায়। সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ও বিচারপ্রার্থী জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর দেশে আইনের শাসন শুধু মুখের কথায়। আইন কর্মকর্তা ছাড়া আইনের শাসন সম্ভব নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার আইন ক্যাডারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনই করছে না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আল-আমীন বলেন, জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো অধিকতর তৎপরতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। আর স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, জনপ্রশাসনে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা বছরের পর বছর ধরে এসব কাজ করেনি। এখন এসে রাষ্ট্রীয় টাকা বাড়তি ব্যয় করে আইনজীবী নিয়োগ দিচ্ছে। দেখা যাবে নিয়োগের পর আর কেউ কাজ করতে চাইছেন না। আইন শাখার নিজেদেরই এসব কাজ করা উচিত। আর রাষ্ট্রের আইনজীবীরাই বা কী করছেন? তারা কেন বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তি করেননি? যদিও আইন শাখার কর্মকর্তাদের দাবি- আইনজীবী নিয়োগ না করলে এত মামলার জবাব কোনোভাবেই তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, জনপ্রশাসনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাজেট বরাদ্দ ও আইন অনুবিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। প্যানেল আইনজীবী ও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এতদিন তাদের চাহিদা পূরণ এবং মামলা নিষ্পত্তি হয়নি কেন- জানতে চাইলে তারা বলেন, তারা সবাই আইন শাখায় নতুন এসেছেন। আগের প্রায় সবাই বদলি হয়ে গেছেন। এভাবে স্বল্প সময়ের জন্যই কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়ে থাকেন এবং আইন শাখায় স্থায়ী কোনো জনবল নেই। এ ছাড়া যে কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মরত, তাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

গত ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মামলা আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য তিনি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনেরও নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পর গত ৮ মে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু চিঠি পাঠানোর প্রায় সাত মাস পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আইন সচিবকে একাধিকবার তাগাদাপত্র দিয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, সরকারি কৌঁসুলিদের মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সহায়তা করছে। এ জন্য আলাদা আইনজীবী শাখা আছে। তারাও কাজ করছেন।

জানা যায়, ২০০২ সালে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়াও তৈরি করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। সেটি আর চূড়ান্ত হয়নি। ফলে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকারি আইনজীবীরা। বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার-১৯৭২ অনুযায়ী এই আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়া হয় চুক্তিভিত্তিক। দক্ষতা বিবেচনায় নয়; এ নিয়োগ হয়ে থাকে সাধারণত রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারি আইনজীবীদের অদক্ষতার কারণে বেশিরভাগ মামলায় সরকার পরাজিত হয়। সরকার বদল হলে নিয়োগের চুক্তি বাতিল হওয়ায় পুরোনো মামলা পরিচালনার জন্যও নতুন নিয়োগ পাওয়া আইনজীবীরা আগ্রহ দেখান না। ফলে পুরোনো মামলাগুলো চলে যায় হিমাগারে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আইন অনুবিভাগে নেই স্থায়ী কোনো জনবল। ফলে বেশিরভাগ কর্মকর্তা স্বল্প সময়ের জন্য এসে দায়সারাভাবে কাজ করেন। এভাবে একদিকে মামলাজট বাড়ে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় বিচারপ্রার্থীরা।

সূত্র: সমকাল

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর