বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:২৩ পিএম


মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কুল-বুলিং প্রতিরোধে কাউন্সেলিং

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

প্রকাশিত: ০৯:২৩, ১৯ জুলাই ২০১৯  

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কুল-বুলিং (শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতন করা/ভয় দেখানো) প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন করে। এ নীতিমালার ওপর মহামান্য হাইকোর্ট কতগুলো নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো অনুসরণ করলে চূডান্ত নীতিমালাটি মানসম্মত ও উন্নত হবে বলে আশা করি। নীতিমালায় শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনের কথা বলা হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী দ্বারা নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। আমরা অনেকেই জানি, ২০১০ সালে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌন হয়রানি মোকাবেলায় একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; কিন্তু নীতিমালাটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতিমালাটি নেই যেমন সত্যি, তেমনি এর কার্যকারিতা ও অপব্যবহারও লক্ষ করা যায়। ঠিক তেমনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একই অবস্থা হলে কোনো লাভ হবে না। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইচ্ছা করলে সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারে এবং কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তা করছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমনটি অসম্ভব তা বলছি না, তবে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, ম্যানেজিং কমিটি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমন নীতিমালা সর্বজনীন হওয়া একান্ত কাম্য। এবং নীতিমালায় বিদ্যমান শাস্তির বাইরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর আইনিপ্রক্রিয়া অবলম্বন করার সুযোগ অপরিহার্য। শুধু বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড যদি প্রচলিত আইনের বিপরীত হয়, তাহলে তা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা উচিত।

খসড়া নীতিমালাটি ভালো হবে বলে আশা রাখি, তবে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগই সমস্যা। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা কোনো কারণে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকে। যার জন্য হাইকোর্ট অভিযোগ বাক্সের কথা বলেছেন, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায়ও রয়েছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এখানে মনে রাখতে হবে, কোনো কারণেই ভিকটিমের পরিচয় প্রকাশ করা যেন না হয়। যদি কেউ মিথ্যা অভিযোগ করে, তার জন্যও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে নীতিমালার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে না। শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতন সমাজে দারুণভাবে বেড়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, চরম আকার ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের কোমলমতিতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির শিক্ষক নামের বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের লালসার শিকার হচ্ছে তারা। পাশাপাশি রয়েছে শ্রেণি বন্ধু দ্বারা নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থী। এর প্রভাব এতটা ভয়াবহ, যা জীবনহানির দিকে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত পত্রিকা খুলতেই এমন অসংখ্য খবর আমাদের তাড়া করে।

শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনকে আমরা বুলিং নাম দিয়েছি এবং নীতিমালা করে শাস্তির কথা বলছি। কিন্তু এ সমস্যা প্রতিরোধে ভিকটিমদের জন্য এবং সমস্যার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছি। একটি সাহায্যকারী পেশা হিসেবে মনঃসামাজিক সমস্যাসহ হালের অনেক সমস্যা মোকাবেলায় কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যা প্রচলিত অর্থে নির্দেশনা, পরামর্শ, তথ্য প্রদানই নয়; বরং একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও নিয়মতান্ত্রিক বিষয় হিসেবে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্তির মধ্যে পরিবর্তন আনয়নের চেষ্টা করা। উন্নত দেশগুলোতে এর ওপর এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে সেখানে প্রতিটি সেক্টরে কমবেশি কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা, শিক্ষা, জ্ঞান ও কাঠামো বিবেচনায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাগত ও মানসম্পন্ন কাউন্সিলর দেওয়া সম্ভব হয়তো নয়, তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা কাউন্সিলর তৈরি করতে পারি। বিদ্যালয়ের কোনো একজন শিক্ষক এ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিংসেবা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে কঠিন সংকট ও দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য অবস্থায় সঠিক পথ পাওয়ার একমাত্র রাস্তা কাউন্সেলিং, যা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যাসহ অন্য অনেক মনঃসামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে।

কাউন্সেলিংয়ের লক্ষ্য ব্যক্তির আচরণ, বিশ্বাস, মানসিক ও আবেগীয় দুরবস্থা ও অপ্রতুলতাকে কাটিয়ে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনয়নে সহায়তা করা। আচরণের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হলে যৌক্তিক চিন্তা প্রয়োজন। তেমনি বিশ্বাসের মধ্যে পরিবর্তন হতে হলে ব্যাখ্যা দাবি রাখে। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। পরিবর্তনের জন্য নিজের মধ্যে ব্যাখ্যা খুঁঁজে পাওয়া এবং নিজেকে আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া—অর্থাৎ পুনরুদ্ধারের জন্য সঠিক হাতিয়ার কাউন্সেলিং। স্বাভাবিকভাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পক্ষে নিজেদের ভুলত্রুটি সহজে বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোনটি সঠিক আর কোনটি নয়, সেখানেও দোদুল্যমানতা রয়েছে। এমনকি মানসিক যন্ত্রণা কিভাবে মোকাবেলা করতে হয়, তা বয়সের কারণে বোঝা সম্ভব হয় না। তাদের সিগমন্ড ফ্রয়েডের প্রতিরক্ষা কৌশল সম্পর্কে হয়তো কোনো ধারণা নেই। পারিবারিক পরিবেশ হয়তো অনুকূলে নয়, যেখানে কোনো সাহায্য পেতে পারে। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের বিপথগামিতা কিংবা অন্যান্য আচরণ অন্যরা কোনো না কোনোভাবে বুঝতে পারে। মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হয়তো সহজে বুঝতে পারে; কিন্তু মাতা-পিতা ও শিক্ষকরা একটু সচেতন হলে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে সহজে বুঝতে পারবে যে শিক্ষার্থীদের আচরণ, বিশ্বাস ও মানসিক অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনা জরুরি কি না। তা ছাড়া শ্রেণিবন্ধুদের মাধ্যমে জানা আরো সহজ। জানা, বোঝা ও বোঝানোর জন্য দরকার কাউন্সেলিং।

বিজ্ঞানভিত্তিক সাহায্যকারী পেশা হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রয়োজন, চাহিদা, আচরণসহ অন্যান্য বিষয়ে সঠিকভাবে মোকাবেলার অন্যতম হাতিয়ার কাউন্সেলিং। বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে এ দায়িত্ব দেওয়া যেমন ভুল নয়, তেমনি শিক্ষকদের মধ্য থেকে কোনো একজনকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। যিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন তিনি আলাদা পারিশ্রমিক পেতে পারেন। তবে তিনি এ কাজের জন্য বিদ্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে শতভাগ দায়ী থাকবেন। এ কাজে প্রথম ও প্রধানতম দায়িত্ব হলো গ্রহণনীতি, খোলামেলা আলোচনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নয়ন। যেকোনো অবস্থায় শিক্ষার্থীদের গ্রহণ, বিচারসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার ও খোলামেলা আলোচনা পারে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সমস্যার সমাধান দিতে।

শিক্ষক যদি দায়িত্ববান হন, তাহলে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষার্থীদের বিরূপ আচরণ কমে আসবে। কাউন্সেলিং এ ক্ষেত্রে ভালো হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। আমাদের বিশ্বাস, প্রস্তুতকৃত স্কুল-বুলিং একটি সেফগার্ড হিসেবে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করতে সক্ষম হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর