বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর, ২০২০ ০:২৩ এএম


মাঠ প্রশাসনে ক্যাডার নন-ক্যাডার দ্বন্দ্ব

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ১১:৫৬, ১১ আগস্ট ২০২০  

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে সরকারি কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (জিপিএমএস) চালু করেছে সরকার। এরপর মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে কাজের গতিও বেড়েছে অনেক। কিন্তু সম্প্রতি বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) সংক্রান্ত উপজেলা কমিটি গঠন করায় মাঠ প্রশাসনে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারে চরম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

এসবের জের ধরে স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পৃক্ত গতিশীল এই কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। তাই সরকারি কাজের গতিশীলতার স্বার্থে এই কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন উপজেলা পর্যায়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

জিপিএমএস পদ্ধতির আওতায় প্রতিবছর মাঠপর্যায়ের অফিসগুলো সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) স্বাক্ষর করে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পক্ষে সংশ্নিষ্ট সচিব স্বাক্ষর করেন। প্রতিবছর এ চুক্তি স্বাক্ষর হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই এবং এপিএর স্বাক্ষরিত কপি প্রধানমন্ত্রীর হাতে হস্তান্তর করা হয়। চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করতে হয়। এখন উপজেলা পর্যায়ে এপিএ কমিটি গঠন করায় স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ে জবাবদিহির পর কমিটির নন-ক্যাডার জুনিয়র কর্মকর্তাদের কাছেও জবাবদিহি এবং পরামর্শ নিতে হবে উপজেলার অনেক দপ্তরপ্রধানকে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এতে এক দপ্তরে দুই নীতি চালু হবে। কারণ, কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে উপজেলার নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির সমাজসেবা কর্মকর্তাকে। অথচ উপজেলার সিনিয়র স্কেলের প্রাণিসম্পদ ও সিনিয়র মৎস্য বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে (ষষ্ঠ গ্রেড) কমিটির সদস্য হিসেবেও রাখা হয়নি। এ ছাড়া ৯ সদস্যের কমিটির পাঁচজনই নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে পাঁচটি দপ্তরে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা কাজ করলেও দুটি দপ্তরের ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই কমিটিতে রাখাই হয়নি। ফলে উপজেলার নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা এখন সিনিয়র স্কেলপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের দেখভাল করবেন। এপিএ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও সমন্বয় করবেন। সিনিয়র কর্মকর্তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে জেলা কমিটিকে জানাবেন জুনিয়র কর্মকর্তারা। একইভাবে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও এপিএ-সংক্রান্ত কমিটি গঠন নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

অর্ধশতাধিক উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তারা বলেন, এপিএ বাস্তবায়ন ও অগ্রগতির বিষয়ে তারা স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি ও জবাবদিহি করেন। এ জন্য উপজেলায় কমিটি গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই। কমিটি করলে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারে দ্বন্দ্ব বাড়বে। সরকারি দপ্তরের বার্ষিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি হওয়া এপিএ-সংক্রান্ত কমিটির প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি করেছেন তারা।

তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, জুনিয়র কর্মকর্তাদের এপিএ কমিটির দায়িত্ব দেওয়ায় চেইন অব কমান্ড ধ্বংস হবে না। কারণ, তাদের খবরদারি করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুধু মনিটরিং করার জন্য। তিনি বলেন, নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেলের ক্যাডার কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় তাদের (সিনিয়র কর্মকর্তাদের) গুরুত্ব কমে যাবে না। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে চুলচেরা বিশ্নেষণ করেই তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া এপিএ-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ই দেখভাল করছে।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা ষষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র স্কেলপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তাদের কার্যক্রম নন-ক্যাডারের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারা দেখভাল করবেন, এটা খুবই দুঃখজনক। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, উপজেলা কর্মকর্তারা জেলার সঙ্গে, জেলা বিভাগে এবং বিভাগ অধিদপ্তরের সঙ্গে, এরপর অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এপিএর চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি করছেন। এখানে নতুন করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একই অভিমত রেখেছেন স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। উপজেলা পর্যায়ে পাঁচ ক্যাডারের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এর মধ্যে চারটি ক্যাডারের কর্মকর্তাই এ কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

সরকারি কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি জাতীয় কমিটির সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কাজের প্রয়োজনেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের কাছে জানতে বলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্নিষ্ট শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি জাতীয় কমিটির অনুমোদনকৃত একটি কমিটি। এ বিষয়ে তিনি কোনো মতামত দিতে পারবেন না। জাতীয় কমিটির নির্দেশেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

দেশের দেড় শতাধিক উপজেলায় বিসিএস ১৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে। অনেক জেলা কর্মকর্তার চেয়েও তারা সিনিয়র। কিন্তু পদোন্নতিজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন উপজেলা পর্যায়ে কাজ করছেন। আর উপজেলা এপিএ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে রয়েছেন বিসিএস ২৯, ৩০, ৩১ ও ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা। বিসিএস ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তাদের ১৫ বছর পরে ২০১৪ সালের আগস্টে। আর কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তারা হলেন দ্বিতীয় শ্রেণির নবীন কর্মকর্তা।

বিসিএস লাইভস্টক অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফজলে রাব্বি মণ্ডল আতা বলেন, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এখন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের দিয়ে সিনিয়র স্কেলের ক্যাডার কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করার জন্য এপিএ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলায় এপিএ-সংক্রান্ত কমিটির কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, মাঠপর্যায়ের প্রতিটি দপ্তর স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এপিএ চুক্তি করছে। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করছেন। এমন একটি ভালো উদ্যোগকে করোনাকালের সুযোগ নিয়ে নষ্ট করার পরিকল্পনা চলছে। এতে সরকারের অগ্রাধিকার কাজগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দেবে।

সরকারের রূপকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হয়। এর আওতায় দেশের ৫১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উপজেলা পর্যায় থেকে সুনির্ধারিত বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি সম্পাদন হয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষতিপূরণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে মুজিববর্ষ, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১, সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, এসডিজিসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এপিএর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর