বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:৫৩ এএম


মাছের রাজা ইলিশ, শিক্ষককে পেটায় পুলিশ

শেখ মো. শফিকুল আলম সরকার

প্রকাশিত: ১২:৩০, ২৭ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২০:৩৩, ২৭ অক্টোবর ২০১৯

 

মাছের রাজা ইলিশ, শিক্ষককে পেটায় পুলিশ। আবার "হায়রে কলিকাল, বকরি চাটে বাঘের গাল"। এ কথাগুলো কেন বললাম? একটু খুলেই বলি শুনুন। বিষয়টি অত্যান্ত দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে। মানুষ গড়ার কারিগর হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষকরাই হচ্ছে একটি দেশের সোল বা আত্মা এবং সেরা নাগরিক, বলতে গেলে নাগরিকতার দিক থেকে শিক্ষকরাই রাজা। যেমনটি বলছিলাম, মাছের রাজা `ইলিশ।

কারন শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডের চালিকা শক্তিই হচ্ছে শিক্ষক। আর সেই শিক্ষক কে পেটায় পুলিশ। আমরা উল্টো স্রোতের ব্যর্থ সাতারু। আর শিক্ষকরা বেতন বৈষম্যের শিকারের কারনেই একজন পুলিশ শিক্ষকদের ওপর লাঠি তুলতে দ্বিধাবোধ করে না। শিক্ষকদের অবস্থান কোথায গিয়ে ঠেকেছে? আর এ কারণেই বলি "হায়রে কলিকাল, বকরি চাটে বাঘের গাল"

এখন আসি আসল কথায়, সন্তান যেমন মায়ের কাছে আবদার করতে পারে বা কোন কিছু চাইতে পারে এটাই স্বাভাবিক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে রাষ্ট্র মাতার বা পিতার নিকট শান্তিপূর্ণ ভাবে বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন করতেই পারে। তার মানে এই নয় যে, মানুষ গড়ার কারিগরদের মানে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরুরা পুলিশ বাহিনী কর্তৃক রাজপথে বা আনাচে- কানাচে লাঞ্চিত হবে! আমার ভাবতে অবাক লাগে যে পুলিশ পোলা পানরা এতো বড় সাহস কোথা থেকে পেলো? যে সমস্ত পুলিশ পোলা পান আমার স্যারদের অপমান করেছেন তাদেরকে ক্ষমা চাইতে হবে।

বলছিলাম গত ২৩ অক্টোবর প্রাথমিকের শিক্ষকরা বেতন বৈষম্য নিরসনের জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী র সহিত দেখা করে তাদের মনের কথা ব্যক্ত করবেন। কিন্তু সে সুযোগ হওয়া তো দূরের কথা উল্টো পুলিশের লাঠিপেটা খেয়ে সমাবেশ পন্ড করে শিক্ষকেরা বাড়ি ফিরে যান।

প্রশ্ন হলো পুলিশ কি এতোটুকু চিন্তা করলো না যে কাকে পেটাচ্ছি ? কেনই বা চিন্তা করবে পুলিশ ভালোভাবেই জানে যে এরা সরকারের স্বল্প বেতনভোগী প্রাইমারি স্কুলের মাস্টর। আমরা তাদের চাইতে বেতন বেশিই পাই।

আমরা কুকুর বিড়ালকে মাঝে মাঝে লাঠি পেটা করি। যদি দেখা যায একটা অপরিচিত বিড়াল বা কুকুর বাড়িতে ঢুকে খাবার জাতীয় কোন কিছু নষ্ট করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেদিন শিক্ষকেরা কার খাবার বা রিজিক কেড়ে নিতে চেয়েছিলো যে পুলিশ বাহিনী তাঁদেরকে লাঠিপেটা করলো?

আসলে আমরা শিক্ষকদেরকে সম্মান করতে ভুলে গিয়েঁছি। সম্মান ও মর্যাদা আদাযের লক্ষ্যেই তো পোনে চার লাখ প্রাধমিকের শিক্ষক সমাবেশের ডাক দিযেছিলো। পুলিশ লাঠিপেটা না করে বলতে পারতো, স্যার, আপনারা চলে যান সামনে এগুবেন না। এতটুকু সৌজন্যবোধ পুলিশ দেখায়নি, উল্টো লাঠি দিযে আঘাত করে বুঝিযে দিয়েছে যে এরা প্রাইমারির মাষ্টোর। কত টাকা আর বেতন পায়?

আজ থেকে ১৫ কি ১৬ বছর পূর্বে আমিও একটা সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকের পদে চাকরি করেছিলাম। পুলিশের সঙ্গে বাক - বিতণ্ডা ও লাঞ্চিত হযে চাকরিটা ছেড়ে দেই। কেন ছেড়ে দেই একটু বলি, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য লোন করে একটা কমদামী মোটর বাইক ক্রয় করি। একদিন রাস্তায় পুলিশ মোটর বাইক আটকে দিযে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ ভাই বলল, আপনি কি করেন? আমি বললাম, আমি একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করি।

পুলিশ বলল, মাসে কত টাকা বেতন পান মাস্টার? আমি বললাম, ৩২০০ (তিন হাজার দুই শত) টাকা। পুলিশ বলল, আরে মাস্টোর, এতো কম টাকা স্যালারি( বেতন) পান,! আবার মোটর সাইকেল মারাইছেন ? দুই হাজার টাকা দিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে যান। উপায় না দেখে ১৫০০ টাকা ঐ পুলিশকে ঘুষ দিয়ে মোটর সাইকেলটা ছাড়িয়ে নিই। সেই কষ্টে প্রাথমিকের শিক্ষকতা পদ থেকে ইস্তেফা দেই। ঐ পুলিশ ব্যাটকে আজও খুঁজছি।

শিক্ষকদের সহিত বেতন বৈষম্য ও অবহেলা একদিনে গড়ে উঠেনি এ সমস্যা বহুদিনের। যাহোক সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। দেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করার এখনি উপযুক্ত সময়। আমার শিক্ষাগুরুদের অপমান আর সহ্য হয় না। আমার আর কোন স্যার যেন পুলিশের পিটুনি না খায়। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শিক্ষকদেরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়ার সময় হযেছে। তা না হলে, শিক্ষকদের অভিশাপে জাতি ধবংস হয়ে যাবে। পুলিশ ভাইদেরকে ভাবতে হবে, যে আমরা কাকে পেটাচ্ছি?

এদিন শিক্ষকেরা ‘শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য মানি না মানব না’, ‘দাবি মোদের একটাই আদায় ছাড়া যাব না’, ‘দাবি মোদের একটাই ১০-১১ গ্রেড চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছেন। দফায় দফায় শিক্ষকেরা সমবেত হয়ে স্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বেতনবৈষম্য নিরসনের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের পূর্বঘোষিত মহাসমাবেশ পুলিশি বাধায় করতে পারেননি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। পরে তাঁরা দোয়েল চত্বরে অবস্থান নেন। সেখান থেকে দাবি পূরণ করার জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন তাঁরা। শিক্ষকদের ওপর পুলিশ লাঠি নিয়ে হামলা করে। এতে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়।

এই আন্দোলনের মূল জায়গা হলো সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের জন্য দশম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের জন্য ১১তম গ্রেডের ঘোষণা। শিক্ষকদের এই দাবী মেনে নিলে মেধাবীরাও এই পেশায় আসতে শুরু করবে। ফলে মান সম্মত শিক্ষাও নিশ্চিত হবে বলে আমি আশা করি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর