সোমবার ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ৩:১৫ এএম


মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ডিডির দুর্নীতির তদন্ত শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮:১৫, ১ আগস্ট ২০১৯  

দীর্ঘদিন ধরেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডি) হিসেবে আছেন ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী। মাঝে একবার শাস্তিমূলকভাবে ঢাকায় শিক্ষাভবনে টেনে নেয়া হলেও তিনি আবারও রাজশাহী এসেছেন তদবির করে। কিন্তু থামেনি অনিয়ম।

খোদ সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও (বেতন-ভাতার সরকারি অংশ) তালিকাভুক্ত করতে মাউশির রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়ে থাকে। অফিস সহকারী আবদুল আজিজ ও আবদুল আওয়ালকে নিয়ে এমপিও সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ডিডি শরমিন।

সম্প্রতি মাউশিতে পড়া এক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শরমিন ফেরদৌসের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে। রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমানকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান ইতিমধ্যে ডিডি শরমিনকে তার দপ্তরের কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বলেছেন।

ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী রাজশাহীর পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে তাকে মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি করা হয়। এরপর জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়মে। অবশেষে ২০১৮ সালের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে শরিমনসহ দেশের ১৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নানা অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। এর ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাউশিকে নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক জুলাই মাসে ডিডি শরমিনকে শাস্তিমূলকভাবে ঢাকায় মাউশির মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের ডিডি করে টেনে নেয়া হয়। কিন্তু যাওয়ার পর থেকেই আবার রাজশাহী আসার জন্য তদবির শুরু করেন শরমিন। এরপর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবার আসেন রাজশাহী। তারপর আবার জড়িয়ে পড়েছেন নানা অনিয়মে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিষিদ্ধ হলেও ডিডি শরমিন আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার খনজোর জয়সাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক নাজমা আকতার বানুকে এমপিওভুক্ত করেছেন। তার ইনডেক্স নম্বর এএল-১১৪২৮৪০। দারুল ইহসানের সনদে একই পদে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. সেলিমেরও এমপিও করে দেয়া হয়েছে।

কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও ২০১৬ সালে এমপিও হয়েছে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিজ্ঞানের শিক্ষক মোজাফফর হোসেনের। তার ইনডেক্স নম্বর-১১৩১৪৬০। দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক মো. রোকনুজ্জামানেরও এমপিও হয়েছে অনিয়ম করে।

১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাল সনদে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ইমদাদুল হক। অভিযোগ, এর জন্য দুই লাখ টাকা নিয়েছেন ডিডি শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় এই দুর্নীতি ধরতে পারলে ইমদাদুল হকের বেতন বন্ধ করা হয়। তিন লাখ টাকার বিনিময়ে জাল নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত হন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জেসমিন আরা।

অভিযোগে আরও জানা গেছে, বাঘা উপজেলার কেশবপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান একই উপজেলার দিঘা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। অনুমোদনহীন আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ দিয়ে তিনি প্রথমে বিএড স্কেল পান। তারপর একই সনদ দিয়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে এমপিও করান। অথচ আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএড কোর্সের অনুমোদনই নেই। বিষয়টি জানাজানি হলে ডিডি শরমিন ফেরদৌস দুই লাখ টাকার বিনিময়ে রয়্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া সনদ দিয়ে হাবিবুরের এমপিও করে দেন।

এছাড়া ছাতারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শাখা শিক্ষক এমদাদুল হকেরও এমপিও করা হয়েছে অনিয়ম করে। সনদে পদার্থ ও রসায়ন না থাকলেও পুঠিয়ার সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহুরুল হককে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবেই এমপিওভুক্ত করে দিয়েছেন ডিডি শরমিন। এ জন্য নেয়া হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। বাঘার আজের আলী নামের এক ব্যক্তি ডিডিকে এই টাকা এনে দিয়েছেন।

এদিকে শুধু এমপিওভুক্তিতেই দুর্নীতি নয়, অভিযোগে ডিডি শরমিন ফেরদৌসের আরও নানা অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, শরমিন ফেরদৌস পিএন স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় স্কুলটির ছাত্রী হোস্টেলে থাকতেন। ডিডি হওয়ার আগে-পরে মিলিয়ে তিনি প্রায় ছয় বছর হোস্টেলটিতে বসবাস করেছেন। ভাড়া দিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ২০১ টাকা। অথচ তার ভাড়ার প্রাপ্যতা ২৩ হাজার ৪২৪ টাকা। শরমিন ফেরদৌস সরকারকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ডিডি হওয়ার পর তিনি ৪০০ শিক্ষকের প্রশিক্ষণের টাকা আত্মসাত করেন। পরে জানাজানি হলে তোপের মুখে টাকা ফেরত দেন। শরমিন ফেরদৌস ইচ্ছেমতো শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি করেন। ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে মাউশি এক পরিপত্র জারি করে যে, পরীক্ষা চলাকালে কাউকে বদলি করা যাবে না। কিন্তু তিনি দিলরুবা আক্তার নামে এক শিক্ষককে চারঘাট থেকে রাজশাহী শহরে বদলি করে আনেন উৎকোচ নিয়ে। ডিডি শরমিন নিজের সন্তানকে সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য শিক্ষক কৌটা পান না। তারপরেও তিনি এই কৌটায় ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের সহযোগীতায় নিজের মেয়েকে পিএন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। এর আগে ভাগ্নে এবং ভাতিজাকে একই স্কুলে ভর্তি করান। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি করে তাদের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় করা হয়। তাই পরবর্তীতে স্কুলে তারা আর ভাল ফলাফল করতে পারেনি। এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

তার অনিয়মের তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, এমন একটি অভিযোগের তদন্ত আমাকে করতে দেয়া হয়েছে। চার-পাঁচ দিন আগে আমি আদেশটি পেয়েছি। আমি ডিডি শরমিন ফেরদৌসকে কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বলেছি। তাই মাউশির মহাপরিচালকের কাছে আমি কয়েকদিন সময় চেয়েছি। আগামীর চার-পাঁচ তারিখের দিকে আমি মাউশিতে গিয়ে অভিযোগগুলোর তদন্ত করবো।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। যেহেতু বিষয়টা নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে আমি বলবো, সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা। আর আমার বদলিটা শাস্তিমূলক ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যখন অনিয়মে জড়িত হিসেবে আমার নাম এসেছিল, আমি এর প্রতিবাদ করেছিলাম। মাউশির পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়েছিল। সেখানে আমার কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর