মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০ ৪:০১ এএম


মক্কা-মদিনায় বন্ধের উপক্রম বাংলা কমিউনিটি স্কুল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:২৪, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর সৌদি আরব সফরকালে বলেছিলেন, মক্কা-মদিনায় যে কোনো মূল্যে বাংলা কমিউনিটি স্কুল চালু রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এসব স্কুল বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের চিহ্ন।

তিনি স্কুলগুলোর জন্য প্রবাসীকল্যাণ তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা দেয়ার নির্দেশও দেন। তারপরও মক্কা-মদিনার বাঙালি কমিউনিটি স্কুল দুটি আর্থিক সংকটে বন্ধের উপক্রম হয়েছে। মক্কার স্কুলের কার্যক্রম একবার বন্ধও করে দিতে হয়েছে। পরে ভাড়া বাসায় ঘরোয়াভাবে স্কুলটি চালু রাখা হয়েছে। কিছুদিন আগেও স্কুল দুটিতে হাজারের ওপর শিক্ষার্থী ছিল, এখন তা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

প্রবাসীদের কোটি কোটি টাকা প্রবাসীকল্যাণ তহবিলে দেয়া হলেও তাদের সন্তানদের লেখাপড়াই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অথচ পাকিস্তান ও ভারতের কমিউনিটি স্কুলগুলো চালু রয়েছে দাপটের সঙ্গে।’ ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ। গত ৮ ফেব্রুয়ারি মক্কা হজ মিশনের সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন।

গোলাম মসিহ বলেন, সৌদি আরবের ৯টি স্কুলের মধ্যে মক্কার বাংলা স্কুলটি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। স্কুল দুটি অর্থ সংকটে ভুগলেও এখনও সরকারি সহায়তা মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালনে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব আছে বলে অভিযোগ তার। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত।

সূত্র জানায়, ২০১২ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, মক্কা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় প্রায় ১০০০ শিক্ষার্থী ও ৪৪ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিল। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদানকারী স্কুলটি ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্কুলটি এখন কোচিং সেন্টার আকারে চালু আছে। বর্তমানে স্কুলটিতে ২১৬ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। যে কোনো মুহূর্তে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কথা হয় মক্কার বাংলা কমিউনিটি স্কুলের প্রধান পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষক আবদুল জব্বারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মক্কার বাংলা কমিউনিটি স্কুলটির শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০১৮ সালেও এক হাজার ১০০ জন ছিল। ভাড়া ভবনে সুন্দরভাবেই শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল। কিন্তু সৌদি সরকার প্রবাসীদের ওপর নানা ধরনের করারোপ করায় অনেক প্রবাসী পরিবারসহ সৌদি আরব ত্যাগ করেন।

যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন তারাও অপারগতা প্রকাশ করছেন। এ অবস্থায় স্কুলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেক শিক্ষককে বিদায় করে দিতে হয়েছে। পরে আবার তিনটি পাহাড়ি এলাকায় ছোট্ট পরিসরে চালু করা হয়েছে। ছাত্রসংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। গত বছরও অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা জেদ্দায় গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষায় পাসের হার শতভাগ। তিনি বলেন, সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী মক্কায় স্কুলের জন্য নিজস্ব জমি কেনার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় কোনো স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। স্কুল ভবন ব্যবহারের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়ে ওই ভাড়া পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে স্কুলের কেন্দ্র অনুমোদনসহ সরকারের আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সব চেষ্টা চলছে। তিনি ওই সময় সাংবাদিকদের স্কুলটি ঘুরিয়ে দেখান। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার যে ৩টি ভাড়া বাসার ড্রয়িংরুমে পাঠদান চলছিল, তা কোনোভাবেই পাঠদানের উপযোগী নয়। সহায়তা না পেলে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনাই কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, কোনো স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে স্কুল পরিচালনার ব্যাপারে সৌদির অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন দরকার অর্থ।

মদিনায় মদিনা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে বাংলা কমিউনিটি স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুসা আবদুল জলিল জানান, এই স্কুলে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। বর্তমানে ১০০ জনের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসীদের দেশে ফেরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। মদিনার শোরান রোডের সৌদি আরবের একটি আরবি স্কুলে বাংলা স্কুলটির কার্যক্রম চলছে বিকালের শিফটে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, স্কুলটির ছাদে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলাসহ বিনোদনের সব ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুলটিতে প্লে থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী রয়েছে। সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী ছাত্র ও ছাত্রীদের আলাদাভাবে পাঠদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৯ জন শিক্ষকের অধিকাংশই নারী। মুসা আবদুল জলিল জানান, মদিনার বাংলা স্কুলটির পরীক্ষা কেন্দ্রেরও অনুমোদন রয়েছে। ২০১৯ সালে অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৩ জন। ২০০৯ সাল থেকে স্কুলটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বছরে দেড় লাখ সৌদি রিয়াল পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই ভাড়ার অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু এ বছর ভাড়া পরিশোধ করা না গেলে স্কুল পরিচালনাকারীদের পক্ষে এই অর্থ পরিশোধ করা দুঃসাধ্য বলে তিনি জানান। সৌদি আরবের ৯টি বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুল হচ্ছে- রিয়াদ বাংলা মিডিয়াম ও ইংলিশ ভার্সন স্কুল, জেদ্দা বাংলা ও ইংলিশ ভার্সন স্কুল, দাম্মাম ইংলিশ ভার্সন স্কুল, আলকাছিম বুরাইদা বাংলা স্কুল, তাবুক বাংলা স্কুল, মক্কা বাংলা স্কুল ও মদিনা বাংলা স্কুল।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর