সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ২১:৩৯ পিএম


ভূমির মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নিয়োগ বিধিতে অসামঞ্জস্য

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশিত: ০৮:৪৫, ১৭ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ০৮:৪৫, ১৭ আগস্ট ২০২০

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ-সংক্রান্ত খসড়া বিধিমালায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। সেখানে ১৬তম ও ১৭তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ১০ম গ্রেডে আনার প্রস্তাব করা হলেও ১৪তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বরং তাদের পদোন্নতির জন্য অভিজ্ঞতা পাঁচ বছরের জায়গায় ১০ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া বিধিমালায় চতুর্থ শ্রেণির পদ অফিস সহায়ক, প্রসেস সার্ভেয়ার ও চেইনম্যান থেকে পদোন্নতি বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালতে ছয়টি রিট মামলা থাকলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে সামরিক শাসনামলে প্রণীত বিধিমালা বৈধতা হারিয়ে ফেলায় মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য পৃথক দুটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। পরে `ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০২০` এবং `ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা-২০২০` নামে পৃথক দুটি বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগে পাঠানো হয়।

ভেটিংয়ে একই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সংক্রান্ত পৃথক দুটি বিধিমালা প্রণয়ন নিয়েই প্রশ্ন তুলে বলা হয়, দুটি বিধিমালা একত্রিত করে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা গেলে বিধিমালা স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য হতে পারে। এতে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত বিধিমালায় প্রতিটি পদের বিপরীতে পদসংখ্যা, বেতন স্কেল ও গ্রেড উল্লেখ থাকা আবশ্যক হলেও তা করা হয়নি। `ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা` থেকে কানুনগো পদে পদোন্নতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালায় ওই দুটি পদের উল্লেখ নেই। এতে উচ্চ আদালতের ছয়টি রিট পিটিশন মামলায় কোনো আদেশ দেওয়া হয়ে থাকলে তা আমলে নেওয়া হয়েছে কিনা তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেশকিছু বিষয়ের অসামঞ্জস্য তুলে ধরে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের এই পর্যবেক্ষণ ছাড়াও প্রস্তাবিত বিধিমালায় আরও কিছু গরমিল ও অসামঞ্জস্য রয়েছে, যা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রী ও সচিব বরাবর লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তহসিলদার, সহকারী তহসিলদারদের পদবি বিধিবহির্ভূতভাবে পাল্টিয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তারা করা হয়েছে। তাদের বেতন গ্রেড যথাক্রমে ১৬তম ও ১৭তম হলেও তা ১১তম ও ১২তম গ্রেড দেখানো হয়েছে। তাদের কানুনগো পদে পদোন্নতির জন্য পাঁচ বছরের চাকরির যোগ্যতা সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সার্ভেয়াররা ১৪তম গ্রেডে কর্মরত থাকার পরও কানুনগো পদে পদোন্নতির জন্য ১০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের দেওয়া নির্দেশনা আমলে নেওয়া হয়নি।

নিয়োগ বিধিমালায় ফিডার পদধারীতে পদোন্নতির বিধান না রেখে ১০০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ সব মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও অধিদপ্তরে ফিডার পদে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পদোন্নতির বিধান রয়েছে। ২০০১ সালে নিয়োগবিধিতে চতুর্থ শ্রেণির পদ অফিস সহায়ক (পূর্বের পদ এমএলএসএস), প্রসেস সার্ভেয়ার ও চেইনম্যান থেকে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা পদে ২০ শতাংশ পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলেও নতুন বিধিমালায় ১০০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অসংখ্য কর্মচারী পদোন্নতিবঞ্চিত হবেন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, `এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। প্রয়োজন হলে জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।`

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা সার্ভে ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিএসইবি) চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির তুষার বলেন, সরকারের ডিজিটাল ভূমি জরিপ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সার্ভেয়াররা। অথচ তাদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় উপসহকারী প্রকৌশলী ও সমমানের পদসমূহে কর্মরত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদ ও তাদের বেতন স্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার নির্দেশনা দিলেও ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভেয়িং) ডিগ্রিধারীদের জন্য তা কার্যকর করেন ভূমি মন্ত্রণালয়। এরপর ১৯৮৪ ও ১৯৯০ সালের নিয়োগবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে করা এ বিধিমালায় তাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ভূমি মাঠ প্রশাসন সরকারি কর্মচারী পদোন্নতি বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, সারাদেশে মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়, উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন অফিসে বিভিন্ন পদে সাড়ে ১২ হাজার কর্মচারী কাজ করছে। তাদের জন্য ২০০১ সালের নিয়োগ বিধিতে ২০ শতাংশ পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখা হলেও নতুন বিধিতে ১০০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালা অফিস সহায়ক, প্রসেস সার্ভেয়ার ও চেইনম্যানদের জন্য বৈষম্যমূলক হয়েছে। নতুন বিধিমালায় ৩০ শতাংশ পদোন্নতির বিধান রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর