সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯ ৯:৩২ এএম


ভুল পথে প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা

উমর ফারুক

প্রকাশিত: ১১:১৯, ১৩ মে ২০১৯   আপডেট: ১১:১৯, ১৩ মে ২০১৯

প্রাক্‌-প্রাথমিকের জন্য আমরা এক অসাধারণ পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুত করেছি। কাঠি, লতাপাতা, ফুল-ফল ইত্যাদি ব্যবহার করে শিশুর উপযোগী একটি অনন্য পুস্তক প্রণয়ন করেছি। শিশুরা খুব আগ্রহভরে বইটি নাড়াচাড়া করবে। মজা পাবে, খুলে দেখবে। বইটি হাতে নিলেই বোঝা যায়, শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্নেষণের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে গ্রন্থটি। এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। যদিও শিক্ষার এই স্তরে পাঠ্যবই খুব কম গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা উপকরণ। অন্যদিকে, আমরা বছরের প্রথম দিন প্রায় ৪০ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পেরেছি। সারাবিশ্বে এ ঘটনাও বিরল আর প্রশংসনীয়। সত্যি কথা বলতে কি, মোটা দাগে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সফলতার গল্পটা এখানেই শেষ। বাকিটা ব্যর্থতার, আর্তনাদের, কষ্টের। আর সেই কষ্টের গল্পটা বুঝতে আমাদের শিক্ষা প্রক্রিয়ার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে হবে। বাইরে থেকে বোঝা একটু কষ্টকরই বটে।

প্রাক্‌-প্রাথমিককে আমরা বলি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শূন্য স্তর। একটি শিশু গভীর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা প্রত্যাশা করে শিক্ষার এই স্তরে। এটা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। প্রাক্‌-প্রাথমিকের ওই অসাধারণ বইটিকে যদি আমরা পাঠ্যবই বলি, তাহলে আরেকটি মস্ত বড় ভুল করব। কারণ এ স্তরে পাঠ্যবই আবশ্যক নয়। আবশ্যক অন্য কিছুর। এ গ্রন্থকে একটি খেলনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে; কিন্তু পাঠ্যপুস্তক নয়। প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তর পাঠ্যবই পড়ার কোনো বয়স নয়। এটা খেলার বয়স। এটা দুষ্টুমি ও আনন্দ করার বয়স।
প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে আমরা এক নতুন ভুল করলাম। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খানিকটা দায়িত্ব তুলে দিলাম ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাঁধে। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির এই শিক্ষা বিতরণ করছে। সাতক্ষীরা জেলার বিছট নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিমাংশু কুমার মন্ডল মুরারী কাটি মন্দিরের কয়েকটা ছবি দেখাচ্ছিলেন। ভেঙে পড়া একটা মন্দির। টিনের চাল ভাঙা। ভেতরে কাদায় ভরা। নড়বড়ে খুঁটি। কিন্তু সেই ভাঙা মন্দিরের সাইনবোর্ডে লেখা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে `মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম`। এখন প্রশ্ন হলো, শিশুশিক্ষার দায়িত্ব কার? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, নাকি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের? একটি কাজের দায়িত্বে দুটি মন্ত্রণালয়? ছবিগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক করুণ কাহিনীর কথা বলছিল। শিশুশিক্ষার এই বেহাল অবস্থা দেখে আমরা অবাক ও লজ্জিত হই। কোনো রকম প্রস্তুতি ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছোট্ট শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া মস্ত বড় এক ভুল সিদ্ধান্ত।

শিক্ষার মানে ফিনল্যান্ড বিশ্বে প্রথম। জাপান চতুর্থ। জাপানকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য জাতি। ভাবতে হবে, কী আছে অথবা কী নেই জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায়? জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা ৬-৩-৩-২/৪-এ বিন্যস্ত। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৬ বছর। কিন্তু গ্রেড ৪ পর্যন্ত। অর্থাৎ ১০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো পরীক্ষা নেই। এ সময়ে শিশুরা শুধু খেলাধুলা করে আর শিষ্টাচার শেখে। সম্বোধন শেখে, ভদ্রতা শেখে, আচার-আচরণ শেখে। যে জন্য আজকের বিশ্বে জাপানিরাই সবচেয়ে সভ্য জাতি। অন্যদিকে, সেই বয়সে আমরা শিশুদের জন্য আয়োজন করছি পিএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা। কী হাস্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা! ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের কোনো হোমওয়ার্ক থাকে না। কারণ ফিনল্যান্ড মনে করে, শিশুকে শিশুর মতো থাকতে দিতে হবে। সে জন্যই বোধ হয়, ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ সারবিশ্বে অনুকরণীয়। অথচ আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। শিশুদের জন্য বইয়ের বোঝা, হোমওয়ার্ক, শাসন- আরও কত কী ব্যবস্থা করেছি! আমরা আগে পড়ছি বই, পরে শিখছি শিষ্টাচার। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। এ কথা সত্য, আমরা শিশুশিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। শিশুশিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছি। কিন্তু কোন পথে আমাদের শিশুশিক্ষা? ভুল পথে নয়তো? শিশুশিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে প্রাক্‌-প্রাথমিকে। এই স্তরের শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রতিনিয়ত শানিত করতে হবে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকদের জন্য সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা সরকারি খরচে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ কাজগুলো আমরা করছি না। করছি সেসব কাজ, যা শিক্ষায় অনাকাগ্ধিক্ষত দৌড় প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছে। সেরা স্কুলের তালিকা তৈরি করছি আমরা। কী অদ্ভুত এক লঙ্কাকান্ড! সমান সুযোগ নিশ্চিত না করে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করা হাস্যকর, লজ্জাজনক। বরং আমাদের উচিত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর জন্য সমঅধিকার ও সমসুযোগ নিশ্চিত করা।

কী প্রয়োজন আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য? খুব বেশি কিছু নয়। একটা খোলা আকাশ, খেলার মাঠ। প্রচুর খেলনা। সেখানে খেলবে সারাদিন, বন্ধুদের সঙ্গে। শিখবে- কীভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয়; কীভাবে বড়দের সঙ্গে চলতে হয়; কীভাবে খেতে হয়, পোশাক পরতে হয়; কীভাবে নিজের কাজ নিজে করতে হয়। আর একজন শিক্ষকের কাজ হলো তার ভেতরে প্রচন্ড এক আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করা। যেন সে কখনও ভয় না পায়। যেন সে প্রতিনিয়ত প্রচন্ড সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আমাদের প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলনার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই খেলনা আবার যেন সিন্দুকবন্দি হয়ে না পড়ে! কক্ষে খেলবে, বাহিরাঙ্গনেও খেলবে। নানা রকম খেলনা। সেখানে বিজ্ঞান থাকবে; থাকবে প্রকৃতি। যদি সরকার প্রাক্‌-প্রাথমিকে খেলনা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে অনুদানের ভিত্তিতেও খেলনা সংগ্রহ করতে পারে। শিশুর শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করে তুলতে হবে। অন্যথায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো যাবে না। পাঠ্যবই থাকতে পারে, সেটিও একটি খেলনা হিসেবে। শিশুকে পাঠ্যপুস্তকে ডুবিয়ে দেওয়া হবে ভয়ানক বিপজ্জনক একটি কাজ। তাহলে প্রজন্মের প্রবৃদ্ধি রুদ্ধ হবে।

ফিনিশ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের পেছনে মূল কারণ হলো, ফিনিশরা বিশ্বাস করে, শিক্ষকরাই উন্নত ফিনিশ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন দেয়; অযথা হয়রানি করে না। তারা বিশ্বাস করে- শিক্ষকরাই একটি জাতির হূৎপিন্ড। তারাই শিক্ষা ব্যবস্থা ও জাতি গঠনের প্রাণ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বাগ্রে এ ধারণাটি পোষণ করা আবশ্যক। প্রয়োজনে কোনো কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসনও নিশ্চিত করতে হবে। পাঠদানের জন্য গাইডলাইন থাকতে পারে; কিন্তু শিক্ষকের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর ভরসা রাখা জরুরি। আর এ কাজে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অতি জরুরি। যোগ্যদের এই পেশায় আকর্ষণীয় করে তুলতে বেতন কাঠামোসহ বেশ কিছু দৃশ্যমান দ্রুততর কর্মসূচি থাকা আবশ্যক।

আমরা এখন সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির পথে হাঁটছি। এ জন্য চাই মানসম্পম্ন পাঠ্যবই ও শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। শিশুশিক্ষা শিক্ষার গোড়া। আগায় জল ঢেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার এ স্তরে কোনো ভুল হলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে। উন্নত জাতির জন্য উন্নত শিশুশিক্ষা আবশ্যক। শিশুশিক্ষায় ভুল পথ প্রশ্নবিদ্ধ করবে আমাদের সমগ্র অগ্রযাত্রাকে।

শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
[email protected]


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর