সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৬:১৯ এএম


ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ অধ্যক্ষ নিয়োগ প্রসঙ্গে

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রকাশিত: ১৩:২৩, ১ জুন ২০১৯   আপডেট: ১২:৩৭, ২ জুন ২০১৯

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ বাংলাদেশের সেরা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। বাছাই করা ভালো শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত হতে হতে অনেক বেড়েছে এটির সুনাম ও পরিধি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, পরিচালনা কমিটি গঠন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা ও সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে একজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ও অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা সর্বাধিক। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অবশ্যই ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বারবার বিতর্কিত হচ্ছে ভালো শিক্ষার্থীদের একটি বড় প্রতিষ্ঠান। লজ্জিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত প্রতিটি শিক্ষানুরাগী সচেতন মানুষ। কেননা এই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের প্রতি তৈরি হয়েছে অনেক রকম আস্থার সংকট। যা মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

আস্থার সংকটের কারণেই গত ৮ মার্চ ২০১৯ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত অধ্যক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জবাবে প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রহণযোগ্য আবেদনপত্র জমা পড়েছে মাত্র ১৫টি এবং নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন মাত্র ১৩ জন ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১০ প্রার্থী। সেই নিয়োগ পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে অনেক অভিযোগ ও সমালোচনার ঝড়। স্থগিত করা হয়েছে নিয়োগ। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। এসবের মাধ্যমে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যদের আস্থাহীনতার পূর্বানুমান। ঢাকা শহরের যে কোনো একটি মধ্যম মানের কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে জমা পড়ে কম বা বেশি অর্ধশত আবেদনপত্র। অথচ ভিকারুননিসায় আবেদনপত্র জমা পড়ল মাত্র ১৫টি যোগ্য আবেদন! এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হওয়ার মতো যোগ্য ও সাহসী লোকের এত অভাব পড়ল কেন? ঢাকা শহরেরই অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা তো ভিকারুননিসায় যাওয়ার জন্য আগ্রহী থাকা স্বাভাবিক। আমার জানা মতে ঢাকাতেই অনেক যোগ্য অধ্যক্ষ আছেন। তারা কেউ কি আবেদনপত্র জমা দিয়ে ছিলেন ভিকারুননিসায়? যদি না দিয়ে থাকেন তো কারণ কী? যারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন তারা কি চেয়েছিলেন অধিক সংখ্যক যোগ্য লোকের আবেদনপত্র জমা পড়ুক? নাকি তারা চেয়েছিলেন, তাদের পছন্দের প্রার্থীর সঙ্গে দু’চারজন দুর্বল প্রতিযোগী থাকুক, যাতে নিয়োগ বিধি কভার করে মাত্র? তা না হলে- (ক) আবেদনপত্রের সঙ্গে ২০০০ টাকার অফেরতযোগ্য পে-অর্ডার চাওয়া হলো কেন? ভিকারুননিসায় কি টাকার অভাব ছিল? পে-অর্ডার চাইতেই হবে এমন তো কোনো আইন নেই। বেকডেট দিয়ে আবেদনপত্র জমা করার পথ বন্ধ করতে চাইলে ২০০ টাকার পে-অর্ডার চাইলেই তো হতো। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনলাইনেও তো আবেদন নেয়া যেতে পারত। (খ) অভিজ্ঞ প্রার্থীদের আবেদনপত্র বেশি পেতে চাইলে কর্মরতদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে বলা হলো কেন? মোটামুটি ভালো প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ/সহকারী অধ্যাপক পদে অনুকূল পরিবেশে কর্মরত থাকা ভালো বা যোগ্য লোকেরা সাধারণত কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে অন্যত্র আবেদন করতে চান না। কারণ দুয়েকটি আবেদনে তার চাকরি হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার সবাইকে জানিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বারবার আবেদন করতে গেলে বর্তমান কর্মক্ষেত্রে তার গুরুত্ব কমে যায়। তা ছাড়া যে কোনো ইনটেনশনে কর্তৃপক্ষ কাউকে অন্যত্র আবেদন করার সুযোগ দিতে না চাইলে (আইনত দিতে হবে) এখানেই কর্মরত থাকতে হবে বিধায় কর্মীর তেমন কিছুই বলার বা করার থাকে না। ফলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কর্মী অন্যত্র আবেদন করতে পারে না। অবশ্য অযোগ্যতা বা অপকর্মের দায়ে বর্তমানে কর্মরত প্রতিষ্ঠানে গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় কর্তৃপক্ষ যাকে ভালোয় ভালোয় বিদায় করতে চায় তার কথা আলাদা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যম ছাড়া আবেদন নেয়া যাবে না এমন কোনো আইন তো নেই আমার জানা মতে। কারো অন্যত্র চাকরি হলে কর্তৃপক্ষ বিনা কারণে যেতে দেবে না শ্রম আইনে এমন কোনো ধারাও নেই। তা হলে ভিকারুননিসা এই শর্ত যুক্ত করল কেন প্রার্থী কমানোর উদ্দেশ্য না থাকলে? পত্রিকায় তো প্রায়ই দেখা যায় এই শর্ত না দিয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। (গ) অধিক যোগ্যদের আবেদন পেতে চাইলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কেবল বেতন স্কেল উল্লেখ করা হলো কেন? অত্যন্ত সচ্ছল এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষের জন্য প্রচলিত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতাদির কথা প্রকাশ করা হলো না কেন? অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সুযোগ্য অধ্যক্ষ যার মূল বেতন (ইনক্রিমেন্ট লেগে) ৫০-৬০ হাজার টাকায় উন্নীত হয়ে আছে তিনি কি কেবল ৪৩ হাজার টাকা মূল বেতনে কাজ করতে আসবেন ভিকারুননিসায়? তেমন যোগ্য প্রার্থী পেলে তার বর্তমান মূল বেতনের চেয়েও বেশি মূল বেতন নির্ধারণ করে এবং অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিয়োগ দেয়া হবে তা বলা হলো না কেন? পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও বৈধ সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করা না হলে কর্মরত, সৎ, সুযোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি আবেদন করার আগ্রহ না দেখানোই স্বাভাবিক। পরে এসে কিসের ভিত্তিতে ভাতাদি দাবি করবেন তিনি? (ঘ) ‘স্বহস্তে লিখিত জীবনবৃত্তান্তসহ আবেদনপত্র, আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত অভিজ্ঞতার সনদপত্রসহ সব সনদের ফটোকপি, সদ্য তোলা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি’ চাওয়া হয়েছে। আবেদনপত্র স্বহস্তে লেখা যেতে পারে। কিন্তু জীবনবৃত্তান্ত (যা কম্পোজ করে দিলেও বিভিন্নমুখী যোগ্যতাসম্পন্ন অভিজ্ঞ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৫-১০ পৃষ্ঠা হয়ে থাকে) স্বহস্তে লিখে দিতে বলার যুক্তি কী? তিন কপি ছবিইবা চাওয়ার প্রয়োজন কী? ‘প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত অভিজ্ঞতার সনদপত্রসহ সব সনদের ফটোকপি’ চাওয়া হয়েছে কেন? সত্যায়িত কপি দেয়া হলে কি আর মূল সনদ দেখা হবে না? সরকারি চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে সত্যায়িত কাগজপত্র চাওয়া নিষেধ করা হয়েছে সেই ২০১৫ সালে (রিপোর্ট- দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৯ জানুয়ারি ২০১৫)। অথচ ২০১৯ সালে এসেও একজন অধ্যক্ষ পদপ্রার্থী (যিনি বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ/সহকারী অধ্যাপক) তার সনদের কপি সত্যায়িত করতে কেন অন্যের কাছে যাবেন? এসব অহেতুক বদারেশন তৈরি করে প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

উল্লিখিত চারটি কারণ আস্থার সংকট আরো বাড়িয়েছে এবং আবেদনকারীর সংখ্যা কমিয়েছে। তা ছাড়া আরো একটি বিষয় আলোচিত আছে যে, ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ পদে পুরুষ প্রার্থী নিয়োগ হয় না, হবে না। মহিলাদের ক্ষেত্রেও ভিকারুননিসার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। আবেদন কম পড়ার এটিও একটি কারণ। অলিখিত হলেও এমন বিধান চিরদিন অনুসরণ করা অনুচিত। ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেন কলেজসহ হাজার হাজার সরকারি বা বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের প্রধান যদি পুরুষ হতে পারেন তো ভিকারুননিসায় হতে পারবেন না কেন? যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে যিনি অধিক উপযুক্ত হবেন তিনি নারী হোক বা পুরুষ হোক, অভ্যন্তরীণ হোক বা বহিরাগত হোক নিয়োগ পাওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে। এটিই ন্যায্যতা, এটিই বিবেক, এতেই অধিক কল্যাণ।

কেবল একাডেমিক রেজাল্ট দেখে কিংবা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠান-প্রধান করার যোগ্যতা পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব। এসব পরীক্ষায় কেউ বেশি নম্বর পেলেই তাকে প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার জন্য সুযোগ্য মনে করা সঠিক নয়। তদুপরি নেয়া হলে কোন কোন বিষয়ক প্রশ্নে শতকরা কত নম্বরের লিখিত এবং কত নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নিতে হবে তাও নির্ধারিত নেই। প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিখ্যাত ও সুযোগ্য হলে তাকে নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক গর্বিত হবে। তার কারণে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার্থীরা বিখ্যাত ও সুযোগ্য হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। কর্মে, কথায়, ধর্মে, জ্ঞানে তাকে হতে হবে সব মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র এবং শিক্ষার্থীদের অনুসরণীয় অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। প্রতিনিয়ত প্রদান করতে হবে উদ্দীপনা, বৃদ্ধি করতে হবে কর্ম উদ্যম, নিশ্চিত করতে হবে সফলতা। প্রদান করতে হবে নৈতিক, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা। নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ও সার্বিক উন্নয়ন। এককথায় জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ পর্যন্ত করতে হবে তাকে। তাই নিয়োগ দেয়ার আগে শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অবদান, মনমানসিকতা, আচার-আচরণ, নৈতিক চরিত্র, জাতীয়তা বোধ, দেশপ্রেম ইত্যাদিসহ দীর্ঘ অতীত জীবনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রদত্ত নেতৃত্ব ও অর্জিত কৃতিত্বসহ ভালোভাবে মূল্যায়ন করা উচিত তার পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত। আর যারা পালন করবেন অধ্যক্ষ বাছাই করার এই গুরু দায়িত্ব তাদেরও থাকতে হবে ততোধিক সততা, দক্ষতা, উদারতা, নিরপেক্ষতা ও দূরদর্শিতা।

মো. রহমত উল্লাহ্ : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর