শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৩:৩১ পিএম


ভর্তি পরীক্ষা এবং দুদকের সুপারিশ

মঈদুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০৮:৩৩, ২৮ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১০:০৬, ২৮ আগস্ট ২০১৯

দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতিবছর মার্চ মাসের মধ্যে তার আগের বছরের প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করে থাকে। এটাকে বলা হয় বার্ষিক প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে সারা বছরের দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে দুদকের কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরা হয়, সেই সঙ্গে রাখা হয় কিছু সুপারিশ। প্রতিবছর বাংলায় ও ইংরেজিতে এই প্রতিবেদন ছাপিয়ে দ্বিভাষিক একটি বই প্রকাশ করা হয়, বিতরণও করা হয় বিনামূল্যে। এই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হয় রাষ্ট্রপতিকে।

এক যুগেরও অধিককাল চলে যাচ্ছে, দুদকের কোনো বার্ষিক প্রতিবেদনের ওপর জাতীয় সংসদে কখনও আলোচনা হতে দেখিনি। দেখা যায়নি গণমাধ্যমগুলোতেও তেমন গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হতে। এই প্রতিবেদন আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনের নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই আটকে আছে এখনও। জাতীয় সংসদে ও গণমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনা হওয়া উচিত প্রতিবছরই। দুদকের ওয়েবসাইটেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে সত্যিকার কিছু হয় তবে।

এ বছর দুদকের ২০১৮ সালের যে বার্ষিক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে আরও অনেক বিষয়ের সুপারিশ ছাড়াও বিবিধ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালগুলোতে ভর্তির জন্য সমন্বিত পরীক্ষা গ্রহণ, সরকারি সব চাকরির ও সংবিধিবদ্ধ সব ধরনের সরকারি কর্তৃপক্ষের সব চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পিএসসির (সরকারি কর্মকমিশন) মাধ্যমে নিয়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ পরীক্ষা ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার মতো তিনটি সময়োচিত অতিগুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রাখা হয়েছে। এখানে আমার নিজের একটু ভূমিকা ছিল বলে কিঞ্চিৎ শ্লাঘা অনুভবও আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও রয়েছে আমার কিঞ্চিৎ পারিবারিক অভিজ্ঞতা। ২০১০ সালে আমার মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য তাকে নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছোটাছুটি করেছি। সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও ভেসে ওঠে। বাসে, ট্রেনে টিকিট পাওয়া যায় না, থাকার জায়গা পাওয়া যায় না, হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আর তাদের অভিভাবকের অসহায় ভিড়ে ভরা সবখানে। দিনের ট্রেন ধরে রাতে চট্টগ্রাম পৌঁছে পরদিন সকালে পরীক্ষা দিয়ে আবার রাতের ট্রেন ধরে সকালে ঢাকায় নেমে পরীক্ষা দিয়ে বিকেলের বাসে সিলেটে গিয়ে পরদিন সকালে পরীক্ষা দেওয়া। উহ, সে কী দুর্বিষহ যাতনা! সিলেট আর খুলনার পরীক্ষা একই দিনে পড়ায় খুলনা বাদ গেল। শেষে ক্লান্ত হয়ে স্ত্রীকে পাঠিয়েছিলাম মেয়েকে রাজশাহী নিয়ে যেতে। আমি তো বদলি পেয়ে বাঁচলাম কিন্তু; মেয়ের তো উপায় নেই, তাকে যেতে হলো সশরীরে সবখানে এবং দিয়ে যেতে হলো একের পর এক নিষ্ঠুর প্রহসনের পরীক্ষা! তখন মনে হয়েছিল, মেডিকেলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যদি একটি সমন্বিত পরীক্ষা নিত! ড. জাফর ইকবাল মহোদয়রা তখনও এ বিষয়ে সরব হননি কিংবা হয়েছিলেন হয়তো। `আশীবিষে দংশেনি` বলে আমিই টের পাইনি।

ভর্তি পরীক্ষার মতোই চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্য সদ্য স্নাতক বা বেকারদের বিড়ম্বনা চোখে পড়ে। এখনও আজিমপুরে অফিসার্স কোয়ার্টারের আশপাশে প্রতি শুক্র আর শনিবার শত শত চাকরিপ্রার্থী ছেলেমেয়েদের ভিড় দেখি (বিভিন্ন সব নিয়োগ পরীক্ষা হয় ইডেন কলেজ, হোম ইকোনমিক্স কলেজ, অগ্রণী স্কুলে) আর আমাকে ২০১০ সালের সেই ভয়াবহ দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে। এই ছেলেমেয়েরা আর তাদের অভিভাবকরা বছরের পর বছর ধরে নিয়োগ পরীক্ষার নামে একটি ভালো চাকরির মরীচিকার পেছনে ছুটে চলেছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। পরিসংখ্যান বলছে, একজনকে নাকি তিন বছর ধরে ১৭টি নিয়োগ পরীক্ষা দিতে হয় একটি চাকরি পেতে! শুধু ছোটাছুটি নয়; শিকার হয়ে চলেছে দুর্নীতি আর প্রতারণার। দুদকে থেকে দেখেছি, নিয়োগে দুর্নীতি আর প্রতারণা নেই এমন জায়গার সংখ্যা কত নগণ্য, যখন আদালতে (উচ্চ-নীচ ভেদ নেই এখানে) কর্মচারী নিয়োগেও দুর্নীতির অভিযোগ দেখতে হয়েছে!

সমস্ত নিয়োগ পরীক্ষা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে এই দুর্নীতি আর হয়রানি থেকে মানুষ রক্ষা পেত! তাই দুদকের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা পিএসসির মাধ্যমে নিতে গেলে নতুন আইনবিধি করার কথা যখন আসছেই, তখন সংবিধিবদ্ধ বাকি সব সরকারি কর্তৃপক্ষের এবং পুরোপুরি সরকারি বাকি সব চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্যও তা হওয়া উচিত বোধ হলো।

এসব বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, নিয়োগ পরীক্ষার ব্যাপারে দুদক থেকে সুপারিশ দেওয়া যায়। আরও বলি, ড. জাফর ইকবালরা তো পেরেশান হয়ে গেলেন। রাষ্ট্রপতিও ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সমন্বিত পরীক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে না এখনও; দুদকেরও উচিত সুপারিশ করা। এসবে দুর্নীতির প্রমাণ আগেই মিলেছে দুদকের অনুসন্ধানে। তিনি আমার প্রস্তাবের যথার্থতা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে দ্বিধা করেননি মোটেও। কমিশনও সম্মত হয়, বার্ষিক প্রতিবেদনে যুক্ত হলো সুপারিশ তিনটি। দুদক চেয়ারম্যানসহ কমিশনকে অশেষ ধন্যবাদ। কিন্তু প্রতিবেদনে এই সুপারিশগুলোর ব্যাখ্যা বিশদ আসেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সমন্বিত পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে এ ক`বছর, চলছে এখনও। এবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ময়মনসিংহ) সঙ্গে কৃষি বিষয়ে প্রাধান্য পরবর্তী প্রজন্মের আরও ৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ধরনের আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চাইছে বলে খবরে প্রকাশ।

দেখা যাচ্ছে, প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও নানা ছলছুতোয় পাশ কাটিয়ে চলেছে। তাদের গুটিকয়ের স্বায়ত্তশাসনের `বাঁশি` বাজানো `নিরোর` সুখের মতো ঠেকছে! বাকিদের স্বায়ত্তশাসন নেই, তারাও যেন মহাপ্রলয়ের `শিঙ্গা` ফুঁকে চলেছেন! তাদের থামাতে সরকার প্রয়োজনীয় কঠোরতাটুকু দেখাবে আশা করি। মানুষকে দুর্গতির মধ্যে জিম্মি করে রাখার স্বায়ত্তশাসনের কিছুটা সংস্কার দরকার হলে করতে হবে বই কি!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে নেমেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের এই চতুর বাণিজ্যের স্বার্থপরতা থেকে প্রথম যে দীক্ষাটা পায়, তাতে জীবনে `টাকাই লক্ষ্য` জ্ঞান হয়। `সকলে আমরা পরের তরে`- পরার্থপরতার সুবচন তাদের মনে, মস্তিস্কে আর ধারণ করার কথা নয়! বৃহৎ চিন্তার নীতিবান আদর্শ মানবসম্পদ না হয়ে ফিকিরবাজ দুর্নীতিপ্রবণ হয়ে ওঠাই তো স্বাভাবিক, যার কুপ্রভাব গিয়ে পড়ছে কর্মক্ষেত্রে। দুর্নীতির এই `লার্ভাক্ষেত্র` সজীব রেখে দুর্নীতির বিস্তার রোধ সম্ভব নয়।

সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)

[email protected]
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর