মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ১৭:০২ পিএম


বৈষম্যের বেড়াজালে নিমজ্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা

মো. সিদ্দিকুর রহমান

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ৩ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২১:১৭, ৩ অক্টোবর ২০১৯

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ২০১৯ সালের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো YOUNG TEACHER : THE FUTURE OF THE PROFESSION. প্রতিবছর শিক্ষকদের মাঝে এ দিবসটি ঘুরে ফিরে আসে। বিশ্বের শিক্ষক সমাজের কাছে এ দিবসটি অহঙ্কার করার মতো। জানামতে, বিশ্বের অন্যান্য পেশার মানুষের স্মরণ করার মতো কোন দিবস নেই। শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর। তাঁদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের অনেকেই এ দিবসটি সম্পর্কে তেমন জ্ঞাত নয়। এ দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ না রাখা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিবসটি হয়ে পড়েছে গুরুত্বহীন।

সাধারণ শিক্ষকদের মাঝে দিবসটি নিয়ে তেমন ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রতিবছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে ও অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আ্হমদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ইউনেস্কো গণস্বাক্ষরতাসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় কমিটি র‌্যালী ও আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদযাপন করে থাকে। শিক্ষকরা প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে নিবন্ধ লিখে থাকেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস বিদ্যালয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে পালন করে থাকে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ প্রাথমিকের মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস ও বিশ্ব শিক্ষক দিবস সরকারিভাবে পালনে কোন ভাবনা দৃশ্যমান নয়। শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকারের কার্যক্রম দেশ বিদেশে সমাদৃত। এ উন্নয়নে শিক্ষক সমাজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। জাতি গড়ার কারিগর তথা শিক্ষা উন্নয়নে মূখ্য অংশীদার শিক্ষক। শিক্ষক সমাজের একটি মাত্র দিবস সরকারিভাবে পালন না করে বিদ্যালয় খোলা রেখে শিক্ষক সমাজের অবদান স্বীকৃতি না দেওয়ার শামিল। শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে ব্যথিত মনে দিবসটিতে বিদ্যালয় পাঠদানের কার্যক্রম বন্ধ রেখে সরকারিভাবে পালনের দাবি জানাই। শিক্ষাবান্ধব সরকারের অনেক উন্নয়নের পরও আজও বৈষম্যের বেড়াজালে নিমজ্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষায় বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে বলে দৃশ্যমান নয়। সরকারের
ঐতিহাসিক সাফল্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে নোট গাইড।

স্বাধীনতার দীর্ঘ সময়ের পরেও শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষক সমাজের মাঝে বৈষম্যের দেয়াল আজও বিরাজমান। প্রাথমিকে সহকারি ও প্রধান শিক্ষকের মধ্যে বেতন বৈষম্য নিয়ে আজ অসন্তোষ চরমে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ও কিন্ডার গার্টেন তথা অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময়সূচি ও পাঠ্য বইয়ের বিশাল বৈষম্য। এ বৈষম্যের কারণে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর খাবার, উপবৃত্তিসহ নানা উদ্যোগ ম্লান হয়ে আজ প্রাথমিক শিক্ষার অস্বিত্ব বিপন্ন হওয়ার পথে। ইদানিং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মতিঝিল থানার পিএন্ডটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে শিক্ষার্থী সংকট স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি শিক্ষকদের শিক্ষার্থী সংকট দূর করার নির্দেশ দেন। বাস্তব সমস্যা হলো আশেপাশের বিদ্যালয়গুলোর সময়সূচির সাথে পিএন্ডটি স্কুলের সময়সূচির বিশাল ব্যবধান। আরেকটি সমস্যা হলো উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমি অবৈধ দখল করে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলাসহ বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিঘ্নিত করে রেখেছে। সময়সূচি ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের দায়তো শিক্ষকদের নয়। এ দায় নিয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ভাবতে হবে। বেসরকারি শিক্ষকদের মাঝেও এমপিও, নন এমপিও নিয়ে বৈষম্য। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজের সাথে বেসরকারি শিক্ষকদের মাঝে বাড়ি ভাড়াসহ বেতনের পাহাড়সম বৈষম্য।

আজ প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষার সকল বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এ বছরের মূল প্রতিপাদ্যের ব্যাখ্যা হচ্ছে এ প্রজন্মের শিক্ষকেরা আগামী প্রজন্মের সুনাগরিক তৈরি করার স্বপ্নদ্রষ্টা। এর মাঝে কতিপয় চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। প্রথমত: এ প্রজন্মের শিক্ষকেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ইতিহাস পড়ে বেড়ে উঠেনি। বরং তাঁরা স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী ইতিহাস জেনে এসেছে।

অপরদিকে মর্যাদা ও বেতন স্কেলের কার্পণ্যতার জন্য মেধাবী তরুণ সমাজ শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। আর যারা শিক্ষকতা পেশায় আছেন, তাঁরা বৈষম্য, পাঠদান বহির্ভূত কাজের চাপ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হাবুডুব খাচ্ছেন। কুমিল্লা জেলার শিক্ষক নেতা মো. কামরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থী শিক্ষক দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বক্তব্যটি বাস্তব। এ প্রেক্ষাপটে নবপ্রজন্মের শিক্ষকদের দেশের সংগ্রামী ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জ্ঞান যাচাইয়ের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদার বৈষম্য দূর করতে হবে। শিক্ষকদের শিক্ষাদান বহির্ভূত সকল কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। এক কথায় শিক্ষকদের তৃতীয় ও ২য় শ্রেণির বেতন স্কেল ও মর্যাদা দিয়ে ১ম শ্রেণির সুনাগরিক তৈরি শুধু স্বপ্ন ছাড়া কিছুই না। শিক্ষক সংগঠনগুলোর মাঝে বিগত বছরগুলোতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনে কোন ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ বছর বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনগুলোকে নিয়ে একত্রে দিবসটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাঝে হয়ত তাঁদের মাঝে তৈরি হবে পরবর্তীতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের অনুপ্রেরণা। শিক্ষকদের মর্যাদা ও বৈষম্য দূর করার অভিপ্রায়ে শিক্ষক সমাজ এগিয়ে যাক। এ স্বপ্ন হোক বিশ^ শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর