বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৪:২৪ পিএম


বৈরুত ও একটি আহত আত্মার আত্মকথন

ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ২১:৪০, ২ সেপ্টেম্বর ২০২০  

আমার স্মৃতিতে বৈরুত একটি সৌন্দয্যমণ্ডিত , সুশোভন ও নয়নাভিরাম নগরী । একথা সত্যি যে সেখানে অবস্হানের শেষ একটি বছরের ও কিছু বেশী সময় নিরন্তর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বেঁচে ছিলাম ।

আমার জীবনে বৈরুতে অবস্হানের সময়টা এতই ঘটনাবহুল যে আর ও স্মৃতিতর্পণে ও তা শেষ হবে না । সময়টি ছিল ভর যৌবন , উচ্ছল , উজ্জ্বল এবং ফুরফুরে । বৈরুতের উন্মুক্ত , অবাধ , বাঁধাবন্ধনহীন দিনগুলি অধ্যয়ন , গবেষণা এবং মুক্ত পরিবেশে আনন্দ- উল্লাস , এবং বিনোদনে সময় কাটিয়েছি । তবে , সবসময়ই সচেষ্ট ছিলাম বুঝতে ; চিনতে চেষ্টা করেছি আত্মসত্বার বিভিন্ন দিকগুলো । সমুদ্র , পাহাড় , সমতল ও ভ্যালির অপরূপ সমন্বয়ে বেষ্ঠিত লেবানন দেশটি চষে বেডিয়েছি বিভিন্ন দেশের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে । প্রাচীন ঐতিহাসক স্হান , যেমন , বিবলস , টেম্পল অব দি সান , আওতার লেডি অব লেবানন , জেইটা গুহা , বালবেক , বেকা ভ্যালি , কাডিসা ভ্যালি , আন্জারে উমাইয়া আমলের ধ্বংসাবশেষ , উনিশ শতাব্দীতে নির্মিত বেইতদিন প্রাসাদ ইত্যাদি দেখার সুযোগ হয়েছে । ফোনেসিয়ান , রোমান , মুসলিম এবং আধুনিক পুরাকির্তী ও স্হাপত্যকর্ম দেখে বিস্ময় জেগেছে ।

মূলত লেবানিজ বন্ধু-বান্ধবদের গুটিকয় পারসীয় বন্ধুদের সাহচর্যে বিশ্ববিদযালয় ছুটির দিনগুলো এ করেই কাটতো । গ্রীষ্মে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের বীচ সত্যিই নয়নাভিরাম ছিল । নিত্যই কিছুক্ষনের জন্য হলে ও যাওয়া হতো । লেবাননের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক খন্দকার গোলাম মুস্তফা । তাঁর ছোট ছেলেটি ও প্রায়ই আমাদের সাথে বীচে যেতে বায়না ধরত । আমরা ক’জন সম্মানিত রাষ্ট্রদূতের তাঁর পত্নী প্রফেসর সাবেরা আপার আদর আপ্যায়ন পেয়েছি প্রচুর ।খাজা সেরজিল হাসান ছিলেন সে সময় থার্ড সেক্রেটারী । খাজা দম্পতি ও আমাকে খুব স্নেহ করতেন । বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কেজি মুস্তফা সাহেব বাগদাদ চলে যান । কেএম শেহাবউদ্দিন কন্সাল জেনারেল হিসেবে আসেন । পারিবারিক একটা বন্ধন হয়ে গিয়েছিল এ পরিবারটির সাথে । তাঁর সাথে আমি সিরিয়া সহ আরো বেশ কিছু স্হান ভ্রমণ করেছি । আমার থাকাকালীন সময়ে জনাব (মরহুম) আব্দুশ শাকুর (প্রাক্তন সিএসপি) বরেণ্য সাহিত্যিক , (মরহুম) ব্রিগেডিয়ার খুর্শেদ ( আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী) , (মরহুম) নুরুল হক (পরিচালক, বিআরডিবি এবং পরবর্তীতে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী , বগুড়ার পরিচালক) বৈরুত পরিভ্রমণ করেন । শেষোক্ত দুজন চাকুরী সুবাদে আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন । শাকুর ভাই আমার ভাই ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের সহকর্মী ছিলেন বিধায় পূর্ব পরিচিত ছিলেন । নুরুল হক সাব এইউবি এল্যুমনাই ছিলেন । তাঁদের অবস্হান ছিল খুবই অল্প সময়ের । তবে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তা খুবই উপভোগ্য ছিল ।

এহেন আনন্দঘন সময়ে ভাটা পরতে শুরু করে বৈরুতে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে । ১৯৭৬ সালে আমি যখন ডিগ্রী শেষ করে দেশে চলে যাই তখন এক বিধ্বস্ত বৈরুত পেছনে ফেলে যাই । নববিবাহিত স্ত্রী কাছে প্রাণ নিয়ে ফিরে যাওয়াতে আনন্দ ছিল কিন্তু প্রিয় শহর বৈরুত , আমার প্রিয় সব বন্ধুদের রেখে যেতে কষ্ট ও হয়েছিল ।

বৈরুতের অবস্হা সবসময়ই মনযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করেছি , ফেলে আসা বন্ধুবান্ধবদের জন্য উৎকন্ঠা বোধ ও ছিল । আমার সাথে যারা একই সময়ে গিয়েছিলাম তাদের বেশীর ভাগই আমার ডিগ্রী শেষ হওয়ার এক কিংবা দেড় বছর পরে সেখানকার অধ্যয়ন পর্ব শেষ করেছেন । স্কলারশীপের ব্যাপারটি এক্ষেত্রে ইনসেনটিভ যুগিয়েছে বলে মনে হয় । আমার ক্ষেত্রে বধু ছিল মটিভেশন নিঃসন্দেহে ।

পনের বছর ব্যাপ্তির নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধ বৈরুত তথা লেবানন দেশটিকে বিধ্বস্তপ্রায় করে দিলে ও প্রবাসী লেবানিজ এবং ব্যবসায়ীদের কঠোর পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক ভাবে সবল হতে শুরু করে । আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্হাগুলো এবং কিছু সংখ্যক বন্ধু রাষ্ট্র , বিশেষত , ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসলে সকল মহলে আশার সন্চার হয় যে লেবাননের অর্থনীতি , বৈরুতের চাকচমক আবার বুঝি বা ফিরে আসবে । কিন্তু দেশটির দক্ষিণান্চলে বানি আল সদরের ইরানী বাহিনী তথা হিজবুল্লাহর দীর্ঘ সময় যাবত উপস্হিতি , সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদের সক্রিয় সমর্থন এবং রাশিয়ার মদদ্ ইসরায়েল ও আমেরিকাকে স্বাভাবিক ভাবেই অন্যপক্ষে টেলে দেয় । এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে সৌদী আরব এবং ইরান রাজনীতিতে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ । এ দুটি দেশের সুন্নী শিয়া বিভাজনের প্রতিচ্ছায়ায়ই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির মূল নিয়ামত । প্যালেষ্টাইনে উদ্বাস্তুরা ফ্যাক্টর হিসেবে তো আছেই । লেবাননের রাজনীতিতে এদের উপস্হিতি খুবই দৃশ্যমান । তেমন কোন শক্তিশালী সামরিক ভূমিকা রাখার ক্ষমতা তালা থাকায় দেশটিকে নিয়ে সিরিয়া, ইরান এবং ইসরাইলের টানাহেঁচড়া দীর্ঘদিনের । পূর্বেই বলা হয়েছে যে লেবানন একটি বিভাজিত দেশ । মোট জনসংখ্যার ( ৬,৮৫৯,৪০৮) ৫৪ শতাংশ মুসলমান , ৪১ শতাংশ ক্রিস্টান এবং ৫ শতাংশ দ্রুজ । আবহমানকাল থেকে ধর্ম , গোত্রগত বিভাজনের কারণে দেশটি রাজনৈতিক ও সামরিক শাসনব্যবস্হা সংকটাপন্ন অবস্হায় প্রায় সময়েই নিমজ্জমান ছিল । পনের বছর ব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসানে অবস্হার কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও ২০১৫ সালে বিশ্ব ব্যান্ক ঘোষনা করে যে লেবানন তার নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ব্যর্থ একটি রাষ্ট্র । এটি শাসন যারা করছে তারা ঘুষ এবং স্বজনপ্রীতির মত পাপাচারের চরমে পৌঁচেছে । মানুষজনের সেবা প্রদানে সামর্থ , সদিচ্ছা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ট যারা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়না ।

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে সরকার উচ্চ হারে ট্যাক্স আরোপের ঘোষণা দিলে জনতা আক্রোশে ফেটে পরে । হরতাল , জনপথ অবরোধ লাগাতার চলতে থাকলে কোন ফলোদয় হয়নি । বিগত ৪ ই আগষ্ট ২০২০ তারিখে ২০১৩ থেকে বৈরুত বন্দরে রাখা ২,৭৫০ মেট্রিক টন এমোনিয়াম নাইট্রেট যা হিরোশিমায় যে এ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল সেরকম বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরিত হলে ২২০টি প্রাণ বিনষ্ট হয় ; ৩০,০০০ লোকের আবাসস্হান ধূলিস্যাত হয়ে যায় । প্রশাসন কতোটা দূর্বল ও অলস হলে এ পরিমাণ এমোনিয়াম নাইট্রেট ( যা আফ্রিকার কোন একটি দেশে পাঠানোর কথা) বন্দরে ছয় বছর যাবত পড়ে থাকে তা অনুমান করা কঠিন নয় । দায়িত্বহীনতা , জবাবদিহি ব্যবস্হার অনুপস্হিতি ওরম উলভেরাইন স্বজনপ্রীতি লেবাননের প্রশাসন জাঁকিয়ে বসে আছে । আটারোটি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় সেক্ট যেখানে গঠনতন্ত্র মোতাবেক মিলেমিশে একটি বিভাজিত দেশ ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ , কল্যাণে কাজ করার কথা সেখানে স্বার্থপরতা ও পক্ষপাতদুষ্ট , গোষ্ঠি স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোই প্রাধান্য পায় ।

৬.৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি অক্টোবরে ইস্তাফা দেন । জানুয়ারী থেকে তাঁর স্হলাভিষিক্ত হন হাসান ডিয়াব । তিনি ও বিক্ষোভের মুখে ২০২০’র আগষ্টের ১০ তারিখে পদত্যাগ করেন । তাঁর কেবিনেট ও পদত্যাগ করেছে । পার্লামেন্ট নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত হাসান ডিয়াব আভ্যন্তরীন ব্যবস্হা হিসেবে দায়িত্ব থাকবেন । জনতা এ পরিবর্তনে সন্তুষ্ট নয় । তাদের দাবী হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ও স্পিকারের পদত্যাগ ।

আমার দেখা বৈরুত আগের মতো নেই । সুন্দর চেহারার সুন্দর মনের লেবানিজ মানুষগুলো পরস্পরের সাথে দ্বন্ধ বিসম্বাদে মানব চরিত্রের কুৎসিত দিকগুলো উন্মোচন করছে নিতান্তই নির্লজ্জ ভাবে । দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ব হয়ে সুন্দর লেবানন গড়ার যে বীজমন্ত্র শাসনতন্ত্রে নিহিত তা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে অনেক পূর্বেই । ১৫ বছর স্হায়ী গৃহযুদ্ধ , বিভাজিত প্রশাসন, বিচার ব্যবস্হা , ঘুষ , স্বজনপ্রীতি , নিন্মমানের আমলাতন্ত্র ইত্যাদি কারণে এককালের সবল অর্থনীতি বর্তমানে চরম দুর্দশাগ্রস্ত । ডলারের বিপরীতে লেবানিজ পাউন্ড অত্যন্ত নিন্মগামী । মূল্যমান শতকরা ৮০ ভাগের ও নীচে । প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন লেবানিজ বেকার । গ্রীড ইলেকট্রিসিটি সারাদিনে ঘন্টা দু’য়েকের জন্য ও মিলে না । বৈরুত নগরীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিন্মপর্যায়ে নেমে যাওয়ায় স্বাস্হ্য এবং হাইজিন অবস্হা শোচনীয় । প্রায় সম্পদশুন্য দেশটির খাদ্যাভাবের বাস্তব অবস্হা পর্যবেক্ষণ করে সেভ দি চিলড্রেন বলছে যে শিশু মৃত্যুহার আশংকাজনক ভাবে বেডে যাচ্ছে । ২০২০ শেষ হওয়ার পূর্বেই দূর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে ।৬.৯ মিলিয়ন মানুষের ৮৭.২ ভাগই শহরে বসবাস করে । ২ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত মানুষ আর ৫ লক্ষ মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারের ভীরে শহরগুলো , বিশেষত বৈরুত নগরীর তার পূর্বেকার সৌকর্য্য , সচ্ছল জীবনধারা হারিয়ে আজ প্রায় মিসকিনদের আবাসস্হানে পরিণত হয়েছে । আমি এবং আর ও অনেক বৈরুত ভক্তদের জন্য নিদারুণ কষ্টের সময় এখন ।

সেপ্টেম্বর ২ , ২০২০
লং আইল্যান্ড , ন্যু’ইয়র্ক ।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর