মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ৮:৩৭ এএম


বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় কলকাতার শিক্ষকরাও

প্রকাশিত: ১১:৫৬, ৮ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১১:৫৯, ৮ মার্চ ২০১৯

আট দিনের টানা লড়াই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে অবস্থান। বৃহস্পতিবার ইতি হলো এই অবস্থার। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক মাসের সময়সীমার দিকে তাকিয়ে অবস্থান আন্দোলন আপাতত তুলে নিলেন এসএসকে, এমএসকে শিক্ষকরা। এদিকে, এদিনই পার্শ্বশিক্ষক এবং শিক্ষাবন্ধুরা অবস্থান শুরু করেন বিকাশ ভবনের অদূরে। এসএসকে, এমএসকে অবস্থান মঞ্চের পাশেই। পরিকল্পনা ছিল রাতভর অবস্থানের। তবে সন্ধ্যা গড়াতেই প্রায় তিনশো পার্শ্বশিক্ষক এবং শিক্ষাবন্ধুদের হটিয়ে দেয় পুলিশবাহিনী।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কার্যত ব্যারিকেডে মোড়া বিকাশ ভবন থেকে অদূরে বিধান রায়ের মূর্তির সামনে অবস্থান চত্বর। দুপুর থেকে ইন্দিরা ভবনের আগে আটকে দেওয়া হয় গাড়ি। ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন রুটের বাস। এদিন সকালেই পার্শ্বশিক্ষক এবং শিক্ষাবন্ধুরা অবস্থানে বসে ওই চত্বরেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী এসএসকে এবং এমএসকে শিক্ষকরা বিকাশ ভবন ঘেরাও করতে গেলে আটকে দেওয়া হয় তাঁদের। ধস্তাধ্বস্তি হয় কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে। প্রাথমিকভাবে ব্যারিকেড সরিয়ে এগিয়ে যান শিক্ষকরা। ফের আটকায় পুলিশ বাহিনী। বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধ্বস্তির পর ওই ‌অঞ্চলে রাস্তায় বসে পড়েন শিক্ষকরা। প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তাঁরা। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা মূল রাস্তার ওপরেই চলে তাঁদের আন্দোলন। আন্দোলনরত দুই শিক্ষক এদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের বিধাননগর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিন এসএসকে-এমএসকে অবস্থানকারীদের সঙ্গে দেখা করেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। তিনি বলেন, ‘‘উন্নয়নের বন্যার জলে রাস্তায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যদি সত্যি এরাজ্যে উন্নয়ন হয়ে থাকে তবে মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তাঁরা রাস্তায় কেন? ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষকরা। এই সরকারের কানে কথা ঢোকে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে আজ শিক্ষকরা রাস্তায় নেমেছেন। জয় ছিনিয়ে নিতেই হবে। নিজেদের দাবি আলোচনায় তুলতে হবে। রাস্তাকে রাস্তা হিসাবে কাজে লাগাতে হবে। মানব সম্পদের উন্নয়নের কাজে যুক্ত কর্মীরা নতুন ইতিহাস তৈরি করবে। নিজেদের দায়িত্বে অচল থেকেই দাবি আদায় করতে হবে। আর সরকার যদি দাবি মানতে না করেন তবে সেই না হ্যাঁ করাতে হবে।’’ এদিন পার্শ্বশিক্ষক, শিক্ষাবন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলেন বিমান বসু। তিনি বলেন, ‘‘আপনারা মানব সম্পদের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ করেন, অথচ আপনাদের বঞ্চিত হতে হচ্ছে। আপনাদের আন্দোলন সঠিক এবং যুক্তিসঙ্গত। এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। সরকারপক্ষ থেকে যদি কেউ দেখা করতে চান তাহলে আলোচনায় বসবেন। সরকার দাবি মেটাতে না পারলে বা প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রাখতে না পারলে ফের আন্দোলনে নামতে হবে।’’

আন্দোলনের চাপে পড়ে এদিন এসএসকে এবং এমএসকে শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে চান শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শিক্ষকরা দেখা করতে গেলে শিক্ষামন্ত্রী জানান, পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে শিক্ষা দপ্তরে গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে আসার পিছনে বেশ কিছু জটিলতা আছে। শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধি নিয়েও ভাবনা চিন্তা চলছে। তিনি একমাস সময় চেয়েছেন শিক্ষকদের থেকে। শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের সভাপতি সুজিত দাস জানান, আমরা ১৫দিন দেখব আদৌ কোনও কাজ শুরু হয়েছে কি না। যদি না হয় তাহলে পরবর্তী আন্দোলনের কথা ভাবা হবে। একইসঙ্গে শিক্ষকদের অন্য একটি প্রতিনিধিদল দেখা করতে যান রাজ্যপালের সঙ্গে। শিক্ষকদের কথায়, ‘‘এসএসকে, এমএসকে-র এই দুর্দশায় বিস্মিত রাজ্যপাল। বিস্তারিত তথ্য এবং সমস্যার সমাধান সূত্র বের করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যপাল কথা বলবেন বলে শিক্ষক প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন।’’

এসএসকে, এমএসকে শিক্ষকদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে ১২জুলাই কমিটি। এদিন এক বিবৃতিতে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘‘কাজ করেও মজুরির নিরাপত্তা এই দেশে এবং এই রাজ্যে নেই। এরাজ্যের শিশু শিক্ষা সহায়িকা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মীরা দীর্ঘদিন এই বঞ্চনার শিকার হয়ে জীবন ধারণের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। এই আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারী-শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের সরব হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এবং আন্দোলনের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।’’

প্রসঙ্গত, পার্শ্বশিক্ষক ঐক্য মঞ্চের নেতৃত্বে রাজ্যের পার্শ্বশিক্ষকরা বৃহস্পতিবার এক গুচ্ছ দাবি নিয়ে অবস্থানে বসেন। একইসঙ্গে অবস্থানে বসেন শিক্ষাবন্ধুরা। তাঁদের দাবি, উপযুক্ত পদমর্যাদা দিতে হবে ‘কো-অর্ডিনেটর’-এর, বেতনবৃদ্ধিসহ বেতনকাঠামো চালু করতে হবে এবং কর্মরত অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাঁর পোষ্যকে চাকরি দিতে হবে। পাশাপাশি পার্শ্বশিক্ষক এবং শিক্ষাবন্ধুদের যৌথ দাবি, ভাতা ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে গ্রেড পে, পে স্কেল চালু করা, সমকাজে সম বেতন চালু করা, পার্শ্বশিক্ষিকাদের সিসিএল চালু করা, নিযুক্তির দিন থেকে ইপিএফ প্রদান করতে হবে। এদিন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের প্রতিনিধি দল দেখা করতে গেলেও শিক্ষামন্ত্রী দেখা করেননি। উপরন্তু রাজ্য সরকারের কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনী সন্ধ্যা নামার পর হটিয়ে দেয় আন্দোলনকারীদের। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনও লাভ হয়নি তাতে। এদিনে এই ঘটনায় মানব সম্পদ উন্নয়ন সহায়ক কর্মী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদিকা মধুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অত্যন্ত বর্বর আচরণ করেছে পুলিশ বাহিনী। শিক্ষক, শিক্ষাবন্ধুদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আক্রমণ করে পুলিশ। রাজ্য সরকারের উসকানিতে এই কাজ লজ্জার।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসাবে আজ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখা করেছেন এসএসকে এমএসকে শিক্ষকদের সঙ্গে। তবে গোটা আন্দোলনে নির্মম আচরণ করেছে রাজ্য সরকার। সংখ্যায় বেশি থাকলেও মহিলাদের জন্য কোনও শৌচালয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রতিদিন রাতে আন্দোলন ভাঙার চেষ্টা করেছে পুলিশ।’’

সূত্র : গণশক্তি

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর