মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০:৩০ এএম


বিসিএস-আন্তঃক্যাডার ও সমপেশায় বৈষম্য কমান

মো. শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০৭:৪০, ২১ আগস্ট ২০২০  

সম্প্রতি ৩৮তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্য রয়েছে। যেমন- প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করলে একজন যে সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা পেয়ে থাকেন, অন্য ক্যাডারে সেসব সুবিধা নেই। প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা একটু কর্তৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে চলতে চান বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার এই কর্তৃত্বের মধ্যে অনেকেই ভালো কাজ করছেন, এটা ঠিক। তবে কর্তৃত্ব ও বৈষম্যর কারণে প্রশাসন ক্যাডার ব্যতীত অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক অসন্তোষও রয়েছে, গবেষণা করলে এই সত্য আশা করি প্রকাশ হবে। প্রশাসন ক্যাডারে সার্ভিস হোল্ডাররা সর্বোচ্চ স্পেশাল গ্রেড পেয়ে থাকেন, আর সেখানে প্রকৌশল ক্যাডাররা সর্বোচ্চ দ্বিতীয় গ্রেডে যেতে পারেন। চিকিৎসকরাও যেতে পারেন দ্বিতীয় গ্রেড পর্যন্ত। এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডারে কার লোন ৩০ লাখ টাকা বিনা সুদে, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা মাসিক ৩০ হাজার টাকা, বাবুর্চি ভাতা মাসিক ১৬ হাজার টাকা, প্রহরী ভাতা মাসিক ১৬ হাজার টাকা, মোবাইল ভাতা ৭৫ হাজার টাকা, মোবাইল বিল আনলিমিটেড; সেখানে প্রকৌশল, চিকিৎসা এবং শিক্ষা ক্যাডারে এসব সুবিধা নেই। প্রশাসন ক্যাডারে প্রমোশনের ক্ষেত্রে পদের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ পদোন্নতি পেয়ে থাকেন, কিন্তু অন্য ক্যাডারে পদ ফাঁকা না থাকলে পদোন্নতি পাবেন না। একই বিসিএস দিয়ে কেউ চিকিৎসক, সহকারী সচিব বা কলেজের শিক্ষক হচ্ছেন, পরে প্রমোশনে প্রশাসন ক্যাডারের লোকজন যে সময় ১ বা ২ নম্বর গ্রেডে যাচ্ছেন; ওই সময়ে চিকিৎসক বা শিক্ষক ৪ বা ৫ নম্বর গ্রেডে যেতে পারছেন না। এত বৈষম্য থাকলে কীভাবে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তা মানসিকভাবে সন্তুষ্টি নিয়ে কাজ করবেন?

এসব কারণে ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিসিএস দিয়ে তার নিজস্ব ক্যাডারে আর চাকরি করতে চান না। তারা প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার জন্য যেভাবে পড়াশোনা করতে হয়, সেভাবে করেন। অথচ একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষায়িত শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের অনেকগুণ বেশি ব্যয় হয় যা অন্য বিষয়ের ডিগ্রিতে এত খরচ হয় না। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং বুয়েটের ব্যয় দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা। অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় ছিল যথাক্রমে এক লাখ ৮০ হাজার ও এক লাখ ২০ হাজার টাকা। দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাঁচ বছরের এমবিবিএস ডিগ্রি নিতে একজন শিক্ষার্থীর ব্যয় হয় ১৮ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীপিছু রাষ্ট্রের ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এত টাকা ব্যয় করে তারা যদি তাদের নিজের ক্যাডারে না থাকেন, তা অবশ্যই দেশের মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি ছাড়া আর কিছু নয়। বর্তমানে জনসংখ্যা অনুসারে যে সংখ্যাক ডাক্তার দরকার, তা কিন্তু নেই। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। করোনা মোকাবিলায় ডাক্তারদের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না, কিন্তু সেই অনুসারে তারা প্রশাসন ক্যাডারের মতো সুযোগ-সুবিধা পান না। প্রশাসন ক্যাডারে বাইরে পররাষ্ট্র ও পুলিশ ক্যাডারেও ডাক্তার-প্রকৌশলীর আধিক্য দেখা গেছে এই বিসিএসে। ৩৬তম ক্যাডারে মোট সুপারিশপ্রাপ্ত ছিল ২৩২৩, এর মধ্যে বিশেষায়িতদের সাধারণ ক্যাডারে আসার সংখ্যা ছিল ১০০ (শতাংশ-৪.৩০)। আর ৩৮তম বিসিএস সুপারিশপ্রাপ্ত ২২০৪, তাতে বিশেষায়িতের সংখ্যা ১৭০ প্রায়, অর্থাৎ শতাংশ হিসাবে ৭.৭১। এর জন্য যেসব ফ্যাক্টর কাজ করছে যেমন- প্রমোশন, আর্থিক এবং অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা, উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার অপশন। ফলে নিজ পেশায় কাজে লাগছে না মেধা। বিশ্ব যেখানে স্পেশালাইজেশন বা বিশেষায়িত কর্মসংস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ তার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। বিশেষায়িত শিক্ষার্থী যদি তার নিজের পেশায় চাকরি করেন, তাহলেই তার উৎপাদন ক্ষমতা বেশি থাকে এবং কাজের গতি বৃদ্ধি পায়। মানসিক স্বস্তি বেশি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে অনেকে পরে প্রশাসন ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন। এতে উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। যা দেশের উন্নয়নের জন্য শুভ নয়। উচ্চশিক্ষার যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বর্তমান সরকার ফেলোশিপ দিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য আমাদের অন্য দেশে পড়ার সুযোগ দিয়ে থাকে, যা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সেখানে রয়েছে বৈষম্য। যেমন- প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপে ১০০ শতাংশ কোটার মধ্যে বিসিএস পাবেন ৭০ শতাংশ, অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবী ২০ শতাংশ এবং সাধারণ নাগরিক পাবেন ১০ শতাংশ। এটা তো চরম অন্যায়। সাধারণত শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর শিক্ষায় বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, কারণ তারা মানবসম্পদ সৃষ্টি করে এবং গবেষণা তাদের মূল কাজ। তাই তারা দেশ-বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈচিত্র্যময় জ্ঞান অর্জন করে শিক্ষার্থীদের শেখাবেন। এটাই স্বাভাবিক বিষয়। এতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে এবং নতুন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ সৃষ্টি হবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নবম গ্রেডে যোগদান করে অধ্যাপক হয়ে যে সুবিধা পান, তার চেয়ে একজন প্রশাসন ক্যাডার যোগদান করে সমান গ্রেডে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে এখন অনেকেই শিক্ষক হতে চান না। আমি মনে করি আন্তঃক্যাডার ও সমপেশায় যেমন সাংবাদিক, চিকিৎসক, ব্যাংকার, শিক্ষক, সচিব, প্রকৌশলী- সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করতে পারলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। বিসিএস পরীক্ষা নতুনভাবে রিডিজাইন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আমাদের বাংলাদেশ, সেখানে আন্তঃক্যাডার এবং সমপেশায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। আমরা একে অন্যের সহযোগী কিংবা সহযোদ্ধা হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ে তুলব- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর