বৃহস্পতিবার ২০ জুন, ২০১৯ ২১:১৩ পিএম


বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চাকরি ছাড়তে বললেন ডা. জাফরুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ২১ মে ২০১৯  

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম ট্রাস্টি ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ডা. লায়লা পারভীন বানুর নির্দেশে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন আটকে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চলতি মাসের ২১ তারিখ অতিবাহিত হলেও এপ্রিল মাসের বেতন পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা।

এতে রমজান মাসে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছেন অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে বৈধ উপাচার্যের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন আটকে রাখা হয়। যদিও এই আন্দোলনের সঙ্গে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে গত ৬ এপ্রিল আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ভবনের সব শিক্ষক-কর্মকর্তা নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে চাকরি হারানোর ভয়ে অধিকাংশ শিক্ষক কথা বলতে রাজি হননি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মকর্তার বেতন বন্ধ করে দেয়াকে হঠকারী ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও কর্মকর্তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, অধ্যাপক ডা. লায়লা পারভীন বানু ২০১৭ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তার নিয়োগ অনুমোদিত না হওয়ায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ৬ এপ্রিল বৈধ উপাচার্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু এই আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমাদের বেতন আটকে রাখা হলো?

 

ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, বৈধ উপাচার্য নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, আন্দোলন করল শিক্ষার্থীরা আর বেতন বন্ধ হলো শিক্ষক-কর্মকর্তাদের- এটা আসলে অমানবিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি, রেজিস্ট্রার এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ঘিরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যস্ত।

প্রশাসনিক ভবনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ভিসি এক প্রকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে হাত করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন আটকে রেখেছেন।

জানা যায়, ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বেতন বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়। নোটিশ দেয়ার ৫ মিনিট পর সেই নোটিশ উঠিয়ে নেয়া হয় এবং একই তারিখ সংবলিত সংশোধিত নোটিশে বেতন স্থগিতের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সেমিস্টার ফি প্রদান না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবনতির কথা উল্লেখ করা হয়।

 

এ বিষয়ে সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক শেখ খোদার নূর রনি বলেন, এটা অমূলক এবং অযৌক্তিক পদক্ষেপ। কারণ আমরা শিক্ষার্থীরা প্রত্যেক সেমিস্টারের শুরুতে সেমিস্টার ফি দিয়ে থাকি। গত সেমিস্টার শুরু হওয়ার চার মাস পরে শুধুমাত্র এক মাসের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার ফি দেয়নি বলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন স্থগিতের যে নোটিশ দেয়া হয়েছে তা জঘন্য মিথ্যাচার।

শেখ রনি আরও বলেন, মূলত শিক্ষার্থী এবং আমাদের শিক্ষকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমাদের বৈধ ও যৌক্তিক আন্দোলনকে ব্যাহত করার জন্যই প্রশাসন এমন করছে।

রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের একজন প্রভাষক বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারাদেশে গণতন্ত্র, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার দীক্ষা দিয়ে বেড়ালেও নিজের প্রতিষ্ঠানে এগুলোর অস্তিত্ব নেই। এখানে তিনি কতিপয় অনুসারীদের দিয়ে রাজার রাজত্ব চালান। এ কারণেই রমজান মাসে তার আজ্ঞাবহ স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদেরকে দিয়ে বেতন বন্ধ করে দেয়ার মতো হঠকারী, অমানবিক, অনৈতিক ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

বেতন বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক মো. মুক্তার আলী দীপু গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিবি ক্লোজ ফ্রেন্ড’ নামক একটি ফেসবুক পেজে আক্ষেপ করে লিখেছেন,গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কি গাছের পাতা খেয়ে রোজা রাখবে।

 

বেতন বন্ধ হওয়ায় এবং চলতি মাস প্রায় শেষ হওয়ার উপক্রম হলেও এ সমস্যার কোনো সুরাহা না হওয়ায় আইন বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, আমরা এক অনিশ্চয়তার ভেতরে বসবাস করছি। অথচ আমরা প্রতিদিন অফিস করছি। ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিলে আমরা ক্যাম্পাসের বাইরে রাস্তায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেছি। অথচ আমাদের কষ্ট-শ্রমের মূল্য দেয়া হচ্ছে না। বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মকর্তারা যেমন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন তেমন সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন।

মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, এমনিতে আমাদেরকে কোনো উৎসব ভাতা দেয়া হয় না। তার ওপর আবার বেতন বন্ধ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ঈদের আগে আমরা বেতন পাব না। এমন অবস্থা সত্যি অমানবিক এবং লজ্জার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এটা নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলুন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে সত্যিকারের যেটা সেটা জানুন। রেজিস্ট্রার তো উপাচার্যের হুকুমের দাস, সেটা আপনারা ভালো করেই জানেন। যদিও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একটু আলাদা, আমি অনেক কিছু করে থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। যদিও ভিসি বলেন আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি রেজিস্ট্রারকে বিশ্বাস না করেন তবে বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলবে? ছাত্রদের সঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য রেজিস্ট্রারের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ডা. লায়লা পারভীন বানুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টার পর ফোন রিসিভ করে বলেন, আপনাকে ধন্যবাদ, আমি এখন কথা বলতে পারব না, ঠিক আছে? থ্যাংক ইউ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সমসামিয়ক সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ছাত্ররা একটা আজগুবি সিদ্ধান্তে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিষয়ে ছাত্রদের নাক গলানোর অধিকার নেই। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ ৩০০ জন শিক্ষক রয়েছেন। কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে এমন? তাহলে কি নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন? টিউশন ফি সবচেয়ে কম, জায়গা জমি সবচেয়ে বেশি, খেলাধুলায় ভালো করলে তাতেও টিউশন ফি মাফ আছে। পড়াশোনায় ৯০ ভাগ ক্লাস উপস্থিতি ওপরে টিউশন ফি ছাড় দেয়া হয়। টাকা না থাকলে শিক্ষকদের বেতন দেব কোথায় থেকে?

 

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর মানে সেমিস্টারের শুরুতে ফি দেয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, না দেয় না। প্রত্যেক মাসে মাসেই টিউশন ফি আছে। সব বাকিই পড়ে। অনেকেই দিতে পারে না। আমরা ট্রাস্টিরা তো কোনো বেতন-ভাতা নিই না। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ১০ কোটি টাকা দিয়েছে। জায়গা দিয়েছে ১০ একর। শিক্ষকরা ভেবেছেন এটা উপাচার্যের সমস্যা। ভাই, টাকা না থাকলে বেতন কোথায় থেকে দেব?

এক্ষেত্রে শিক্ষকরা কি করতে পারেন এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, শিক্ষকরা অন্য জায়গায় চাকরি নিতে পারেন। অন্য জায়গায় চাকরি নিয়ে নেক শিক্ষকরা। আমাদের তো টাকা নেই, সামর্থ্য নেই। ছাত্ররা ক্লাস করে না, শিক্ষকরা ক্লাসে যান না। শিক্ষকরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেন না। শিক্ষকরা রাস্তায় এসে কেন বলেননি, ‘ছেলেরা তোমরা পাগলামি করিও না।’

এরই মধ্যে সোমবার বিভিন্ন পত্রিকায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে আসার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এ বিষয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যাপার। ছাত্রদের ক্লাসে ফেরার জন্য এটা দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না গেলে নাই। যে কয়জন ক্লাসে যাচ্ছে, গিয়ে ঘুরে আসতেছে। মেডিকেল যাচ্ছে, কয়েকটা বিভাগের মাস্টার্স যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কি আমরা তাদের মারধর করব?

গত ৬ এপ্রিল থেকে বৈধ ভিসির দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রাখেন।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর