মঙ্গলবার ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ১১:১৪ এএম

Sonargaon University Dhaka Bangladesh
University of Global Village (UGV)

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা

এ এ মামুন

প্রকাশিত: ১০:১০, ৯ জানুয়ারি ২০১৯  

সমুদ্রের তীরে বসে দীর্ঘ সময় রাতের খোলা নীল আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ঘাড় ব্যথা করে ফেলেছি, কিন্তু কোনো রমণীর সুন্দর মুখ তো দূরের কথা, কোনো রমণীর কায়াটুকুও খুঁজে পাইনি, একইভাবে বৃক্ষরাজির পাশে বসে বহুবার রাতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, কোনো এলোকেশী নারীর এলোকেশ তো অনেক দূরের কথা, উড়ে আসা ধান গাছের কোনো শুকনো খড়ও দেখতে পাইনি। কারণ প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যের ওপর গবেষণা করার আগ্রহ বা দক্ষতা কোনোটাই আমার মধ্যে জন্মাতে পারিনি। তাই আমি চাঁদকে চাঁদই দেখি, আর গাছকে গাছই দেখি। আমার এ ব্যর্থতার উপমা দেয়ার একটিই কারণ, সেটি হলো প্রকৃতি ও প্রকৃতির কথা, জীবন ও জীবনের কথা, মানুষ ও মানুষের কথা, সমাজ ও সমাজের কথা ইত্যাদি যেকোনো বিষয়ের ওপর যিনিই গবেষণা করুন না কেন, তিনিই গবেষক, তিনিই সত্য ও সুন্দরের সাধক।

বিজ্ঞানভিত্তিকই হোক বা শিল্পকলাভিত্তিকই হোক, আজ যে গবেষণালব্ধ তথ্য সঠিক বলে গ্রহণ করা হয়েছে, কাল যে সেটি ভুল বলে প্রমাণিত হবে না, তা কেউই বলতে পারে না। গবেষণার ফল যা-ই হোক না কেন, সত্যিকারের গবেষণা মস্তিষ্ককে শানিত করে এবং সেই সঙ্গে সময়োপযোগী জ্ঞান দান করে। এ শানিত মস্তিষ্ক আর সময়োপযোগী জ্ঞান দ্বারা যিনি শিক্ষার্থীকে পাঠ দান করেন, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলে। এজন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদোন্নতিতে গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতিতে করা হয় না। এটাই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটা অন্যতম পার্থক্য। তাই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বা গবেষণার কোনো পরিবেশ নেই, তাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় কিনা, এ প্রশ্ন আমার অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, যে পর্যন্ত না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে।

 

দুই.

অনেক বিশ্লেষক (যদিও আমার মতে, শিক্ষকদের শিক্ষাদানের মানদণ্ড নির্ণয়ে শিক্ষার্থীরাই বড় বিশ্লেষক) গবেষণা ও পাঠদানের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চার ভাগে ভাগ করে থাকেন: ক) ভালো গবেষক এবং ভালো শিক্ষক, খ) ভালো গবেষক, কিন্তু ভালো শিক্ষক নন, গ) ভালো গবেষক নন, কিন্তু ভালো শিক্ষক; ঘ) ভালো গবেষকও নন, আবার ভালো শিক্ষকও নন। প্রথম ক্যাটাগরির শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটাগরির শিক্ষকদের নিয়ে আমার কিছুটা হলেও ভিন্ন মত রয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে চাই, ব্যক্তিবিশেষে উপস্থাপনা ভিন্নতর হলেও সত্যিকারের একজন ভালো গবেষক চাইলে ভালো শিক্ষক না হয়ে থাকতে পারেন না, কারণ তার রয়েছে শানিত মস্তিষ্ক ও সময়োপযোগী জ্ঞান। ভালো শিক্ষক ও ভালো গবেষক পরস্পরের পরিপূরক। তাই ভালো শিক্ষক অবশ্যই একজন ভালো গবেষক, যদি তিনি সময়োপযোগী জ্ঞান অর্জনে ক্লান্ত না হয়ে পড়েন। চতুর্থ ক্যাটাগরির একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধুই একটা বোঝা। কীভাবে এবং কেন এ বোঝা কমবেশি আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েই চলছে, তার কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই শুধু নয়, সব সচেতন নাগরিকই অনুধাবন করতে পারেন।

কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োগে অনেক শিক্ষকেরই তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগে যখন মেধা ও গবেষণার (শানিত মস্তিষ্কের) তেমন কোনো স্থান দেয়া হয় না, তখন অধিকাংশ শিক্ষকই দারুণভাবে মর্মাহত হন, সেই সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। কারণ এ ধরনের শিক্ষক নিয়োগ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানই কমায় না, সেই সঙ্গে আমাদের প্রিয় সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিযোগিতায় নামতে দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করে। আমাদের একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষার্থীদের জন্যই শিক্ষক, শিক্ষকদের জন্য শিক্ষার্থী নয়। এ অনুধাবন থেকেই ২০১২ সালে আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সম্মানিত শিক্ষক ও সহকর্মীরা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে তত্কালীন শিক্ষক নির্বাচনী বোর্ডের সভাপতি অর্থাৎ তত্কালীন উপাচার্যকে (অত্যন্ত দুরদর্শী ও উচ্চশিক্ষাবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায়) পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। এ অপ্রাসঙ্গিক কথাটি বলার উদ্দেশ্য হলো, চতুর্থ ক্যাটাগরির শিক্ষক যে কয়েকটি স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে, তার একটি (ব্যক্তিগত স্বার্থ) পূরণ হলেও বাকি কোনোটাই পূরণ হয় না। জাতীয় স্বার্থ ও শিক্ষা/গবেষণার মান রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ ক্যাটাগরির শিক্ষক নিয়োগ বন্ধের কোনো বিকল্প নেই, আর তার জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫-১০ মিনিটের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মৌলিক পরিবর্তন। এজন্য দরকার নতুন, গঠনমূলক ও নিরপেক্ষ নীতিমালা (এ বিষয়ে সময়-সুযোগ পেলে কিছু লেখার ইচ্ছা রয়েছে)। আমার জানামতে, বেশকিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া রয়েছে, যেখানে চতুর্থ ক্যাটাগরির শিক্ষক নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। এমনকি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অন্যসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫-১০ মিনিটের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার তুলনায় অনেকটাই উত্তম। কারণ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্বাচনী বোর্ডের অস্বচ্ছতার অভাবের প্রভাব থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫-১০ মিনিটের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্বাচনী বোর্ডের অস্বচ্ছতার অভাবের প্রভাব (যেকোনো স্বার্থেই হোক না কেন) মুক্ত আছে কি? এ প্রশ্ন আমার অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, যে পর্যন্ত শুধু ৫-১০ মিনিটের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ চলতে থাকবে।

এটা সবাই স্বীকার করবেন, আমাদের বর্তমান সরকার এতই উচ্চশিক্ষাবান্ধব যে, উচ্চশিক্ষার্থে নবীন শিক্ষক/গবেষক/সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্কলারশিপ/ফেলোশিপের মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার বিদেশে পাঠাতেও কার্পণ্য করছে না। কিন্তু হতাশ হই, যখন দেখি নিজের চেষ্টায় অত্যন্ত সম্মানজনক স্কলারশিপ নিয়ে উন্নত দেশ থেকে পিএইচডিধারীদের ছলে-বলে-কৌশলে বাদ দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রিহীন ও তাদের চেয়ে অধিকতর কম মেধাবীদের (স্নাতক/স্নাতকোত্তর রেজাল্ট ও গবেষণাকর্মের ভিত্তিতেও) ৫-১০ মিনিটের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। এটা কি সরকারি নীতিবিরুদ্ধ ও আমাদের মতো একটি দেশের জন্য অর্থের অপচয় নয়? এটা কি উন্নত দেশ থেকে পিএইচডিধারীদের পরোক্ষভাবে উন্নত দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য করা নয়? এটা কি brain-draining-কে সহায়তা করা নয়? আমার এ প্রশ্ন সব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগকর্তাদের কাছে থাকল।

 

তিন.

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের (যার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নির্ভরশীল) কথা উঠলেই সব বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর জানা একটি ইতিহাস মনে পড়ে যায়: বিজ্ঞানী থমসন প্রথম অ্যাটম সম্পর্কে বলেন, অ্যাটম হলো একটি পজিটিভলি চার্জড গোলক, যার মধ্যে ইলেকট্রন বিছানো রয়েছে। কিছুকাল পরে তাঁর ছাত্র, রাদারফোর্ড তাঁর বিখ্যাত আলফা-কণা পরীক্ষার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাঁর শিক্ষক (থমসন) যা বলেছেন, তার মধ্যে একটু ত্রুটি রয়েছে। এটা হলো, অ্যাটমের কেন্দ্রে রয়েছে পজিটিভলি চার্জড গোলক (নিউক্লিয়াস) আর বাইরের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে ঘূর্ণায়মান এক বা একাধিক ইলেকট্রন। এরও কিছুকাল পর আবার তাঁর ছাত্র বোর (Bohr) তাঁর শিক্ষকের (রাদারফোর্ডের) অ্যাটম মডেলে কিছু সীমাবদ্ধতা খুঁজে পান এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করে এ সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে অনেকটাই সঠিক অ্যাটম মডেল প্রদান করেন। এখানে উল্লেখ্য, থমসন, রাদারফোর্ড ও বোর তিনজনই (শিক্ষক, ছাত্র এবং নাতি-ছাত্র) নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ ইতিহাস নিয়োগকর্তাদের এ শিক্ষাই দিচ্ছে, রাদারফোর্ডের মতো ছাত্র পেতে চাইলে থমসনের মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং বোর-এর মতো ছাত্র পেতে চাইলে রাদারফোর্ডের মতো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগকর্তাদেরই ঠিক করতে হবে, তারা কাদের চান। এ ইতিহাস শুধু নিয়োগকর্তাদেরই শিক্ষা দেয় না, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং গবেষণারত শিক্ষার্থীকেও স্বপ্ন দেখায়, শিক্ষক যদি থমসন হন, তাঁর ছাত্রকে হতে হবে রাদারফোর্ড এবং শিক্ষক যদি রাদারফোর্ড হন, তার ছাত্রকে হতে হবে বোর।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষক তখনই একজন সত্যিকারের শিক্ষকে পরিণত হতে পারেন, যদি তিনি তার শিক্ষকতা ও গবেষণাকে পেশা থেকে নেশায় পরিণত করতে পারেন। তাই সত্যিকারের একজন শিক্ষক বা গবেষক কখনই, কোনোভাবেই অর্থ বা পদলোভী হতে পারেন না। ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর ওই দেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু আইনস্টাইন একটি দেশের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করতে অসম্মতি প্রকাশ করে লেখেন, ‘আমাদের ইসরায়েল রাজ্যের আমন্ত্রণ আমার হূদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে আমি দুঃখিত ও লজ্জিত এজন্য যে, আমি এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারলাম না। কারণ আমার বাস্তব জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই, আর মানবজাতির সঙ্গে মেলামেশা করার দক্ষতাও নেই। তাই বলে এ মহাবিজ্ঞানী কোনো অন্যায়, অবিচার, অশান্তি ইত্যাদি ঘটতে দেখে নীরব থাকেননি। এ প্রসঙ্গে এ মহাবিজ্ঞানী একটি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে আমরা যা বিশ্বাস করি না, তা মেনে নেয়ার যন্ত্রণা বেশি নয় কি?’ মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এ প্রশ্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বিবেকের কাছেও রইল।

 

চার.

গবেষণা কী এ প্রসঙ্গে অতি সংক্ষেপে কিছু কথা উপস্থাপন করছি: ক) গবেষণা হলো সত্য ও সুন্দরের সন্ধান, যা একমাত্র সত্য ও সুন্দর পথ ধরে পরিচালনা করা সম্ভব; খ) গবেষণা মস্তিষ্ককে শানিত করে এবং সময়োপযোগী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বমানের গবেষণা করতে বা করাতে সহায়তা করে; গ) বিজ্ঞান বা শিল্পকলাভিত্তিক গবেষণা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ব্যাখ্যা প্রদানে সহায়তা করে; ঘ) বিজ্ঞান বা শিল্পকলাভিত্তিক গবেষণা অতীতে যা ঘটে গেছে, বর্তমানে যা ঘটছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানে সহায়তা করে।

গবেষণা কী তা অতি সহজভাবে বোঝানোর জন্য সবার দেখা দুটি সাধারণ দৃশ্য নিম্নে দেয়া হলো। বাম পাশে রয়েছে শব্দের বেগের চেয়ে বেশি বেগে চলমান একটি উড়োজাহাজের দৃশ্য, আর ডান পাশে রয়েছে পানিতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ঢেউয়ের বেগের চেয়ে বেশি বেগে সাঁতার কাটা অবস্থায় একটি হাঁসের দৃশ্য।

এ চলমান উড়োজাহাজ ও হাঁসের পেছনে যে ত্রিমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক কোণ (যাকে Mach কোণ বলা হয়ে থাকে, যেহেতু বিজ্ঞানী Mach এ কোণের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন) তৈরি হয়েছে, তার যেমন রয়েছে শিল্পকলাভিত্তিক বর্ণনা, তেমনি রয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা। কারণ যেই কঠিন, তরল গ্যাস বা প্লাজমা মাধ্যমে (বস্তু বা প্রাণী কর্তৃক) এ ত্রিমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক কোণের সৃষ্টি হয়, তা পরিমাপ করে সেই মাধ্যমের বেশকিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা সম্ভব। ২০০৪ সালে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির একটি অতি উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর (৮.৮) জার্নালে প্রকাশিত আমাদেরই একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ [Mamun et al: Phys. Rev. Lett. 92, 095005 (2004)] একটি বিশেষ মাধ্যমের অজানা বেশকিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিরূপণের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণ করে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে: এ বিশ্বে বড় বড় যত আবিষ্কার হয়েছে, তার সিংহভাগই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কর্তৃক।

একজন নবীন শিক্ষকের সৎ পথে থেকে ভালো গবেষণার পাশাপাশি পাঠদান, সততা, আদর্শ, মানবতা, নিরপেক্ষতা ইত্যাদির মাধ্যমে তার শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করে তাদের আইডল হয়ে ওঠাই হওয়া উচিত তাঁর স্বপ্ন। শিক্ষার্থীদের মানবতাবোধ জাগ্রত করা, দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং অর্থবহ জীবন গঠনের স্বপ্ন দেখানো শিক্ষকদেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে অন্তত আমি মনে করি। শিক্ষক নিজে যা লালন করেন না, তা শিক্ষার্থীদের লালন করার উপদেশ দেয়া ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। আমাদের একটি কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার, একজন শিক্ষক তা-ই বলবেন, তিনি নিজে যা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। এটা না করলে একজন শিক্ষক ও তথাকথিত রাজনীতিবিদকে আমি অভিন্ন মনে করি।

 

পাঁচ.

গবেষণাকর্ম নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই উঠে আসে, সেটি হলো: গবেষণাকর্মের গুণগত মান না পরিমাণগত মান বেশি গুরুত্বের দাবিদার? অনেকে মনে করেন গুণগত মান, আবার অনেকে মনে করেন পরিমাণগত মান। আমি এ দুটিকেই সমান গুরুত্বের চোখে দেখে থাকি। আমার এ কথার পক্ষে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করছি:

দুপুরের খাবার হিসেবে আপনার কাছে এক চামচ অতি উন্নত মানের বাসমতি চালের ভাত বেশি গুরুত্বপূর্ণ না এক প্লেট মিনিকেট চালের ভাত বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্যই এক প্লেট মিনিকেট চালের ভাত (কমপক্ষে যেকোনো প্রধান খাবারের সময়);

৩৫-৪০ বছরের কর্মজীবনে উন্নতমানের সময়োপযোগী পাঠদানের জন্য, কয়েকবার না প্রতিনিয়ত আমাদের মস্তিষ্ক শানিত করা প্রয়োজন? আমরা সবাই স্বীকার করতে বাধ্য, সময়োপযোগী তথ্য-উপাত্ত দ্বারা যত বেশিবার আমাদের মস্তিষ্ক শানিত করব, আমরা শিক্ষার্থীদের তত বেশি উন্নত মানের পাঠদানে সমর্থ হব;

কোনো গবেষকের অনেক গবেষণাকর্মের মধ্যে কোন গবেষণাকর্ম যে তাঁকে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বিরাট জায়গা করে দেবে, তিনি তা নিজেও জানেন না।

ইচ্ছা করলে কেউ বেশি প্রবন্ধের অধিকারী গবেষককে বেশি সন্তান প্রসবকারী ইতর প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, যদি তার গবেষণাকর্মের মানদণ্ড (citation ইনডেক্স, impact পয়েন্ট, h-ইনডেক্স এবং i১০-ইনডেক্স, যা নিম্নে বর্ণিত হলো) শূন্যের কোটায় থাকে।

Citation ইনডেক্স: কোনো গবেষকের একটি গবেষণাকর্ম অন্য যতসংখ্যক গবেষণাকর্মে তা cited হয়েছে, তাকে ওই গবেষণাকর্মের citation সংখ্যা বলে। একজন গবেষকের সব গবেষণাকর্মের citation সংখ্যার যোগফলকে ওই গবেষকের citation ইনডেক্স বলে। citation ইনডেক্স নির্ণয়ে self-citations গণনায় না আনাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি।

Impact পয়েন্ট: কোনো জার্নালের ২০১৮ সালের impact factor = A/B। এখানে A হলো ২০১৭ সালে ওই জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা, যা ২০১৮ সালে cited হয়েছে এবং B হলো ২০১৭ সালে ওই জার্নালে সর্বমোট প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা।

h-ইনডেক্স: ‘কোনো গবেষকের h-ইনডেক্স ২০’। এর অর্থ হলো, ওই গবেষকের সব গবেষণাকর্মের মধ্যে কমপক্ষে ২০টি গবেষণা প্রবন্ধের প্রতিটি কমপক্ষে ২০ বার করে cited হয়েছে।

i১০-ইনডেক্স: ‘কোনো গবেষকের i১০-ইনডেক্স ৫০’। এর অর্থ হলো, ওই গবেষকের সব গবেষণাকর্মের মধ্যে কমপক্ষে ৫০টি গবেষণা প্রবন্ধের প্রতিটি কমপক্ষে ১০ বার করে cited হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, গবেষণাকর্মের পরিমাণগত মান (গবেষণাকর্মের সংখ্যা, যা উপরে উল্লিখিত ইনডেক্স বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে) গুণগত মানের চেয়ে কোনোভাবেই কম গুরুত্বের দাবিদার নয় বলে আমি মনে করি।

ছয়.

একজন গবেষক বা শিক্ষক নিজে যেমন সার্থক, সফল ও অর্থবহ জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন, ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীদের তাঁর নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বড় স্বপ্ন (যা ঘুমিয়ে দেয় না, বরং ঘুম ভেঙে দেয়) দেখাতে হবে, সেই সঙ্গে সেই বড় বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ দেখাতে হবে। একজন গবেষক বা শিক্ষককে তার গবেষণাকর্ম বা শিক্ষকতায় সর্বদা সৎ ও আন্তরিক থাকতে হবে, যেহেতু তিনি সত্য ও সুন্দর সন্ধানে, সেই সঙ্গে শুদ্ধ ও আকর্ষণীয় পাঠদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আমরা বড় বড় থিসিস অথবা অনেক অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশের চেষ্টা করে থাকি, কিন্তু existing literature-এ অর্ধেক বাক্যও যোগ/বিয়োগ করাই যথেষ্ট আমাদের নিজ নিজ গবেষণা ক্ষেত্রে একটি বিশাল জায়গা করে নেয়ার জন্য। কোনো গবেষকের অনেক গবেষণাকর্মের কোনো একটি গবেষণাকর্মই এ অর্জন করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তাঁর কোন গবেষণাকর্ম তাঁকে এ অর্জন করিয়ে দেবে, তিনি তা নিজেও জানেন না।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন আত্মোৎসর্গকৃত গবেষক বা শিক্ষক তাঁর আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতি কোনো না কোনো এক রূপে, কোনো না কোনো একদিন অবশ্যই পাবেন। গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা (যা আমার পেশা থেকে নেশায় পরিণত হয়েছে) নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে বলা হলে না বলে বা লিখে থাকতে পারি না। কারণ এ সম্পর্কিত অনেক না বলা কথা বা লেখা কথা আমার হূদয়ের কথা, আমার ভালোবাসার কথা। এজন্যই আমার এ লেখা।


লেখক: গবেষক ও অধ্যাপক
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর