শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:৫৭ পিএম


বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ‘বিসিএস কলেজ’!

তাহমিদ উল ইসলাম

প্রকাশিত: ০৯:০৯, ২৯ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ০৯:০৯, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্বন্ধে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘জলপাই রঙের অন্ধকার’ বইয়ে বলেন, শুনেছি লেখাপড়াটাকে তারা আর গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না, ঈর্ষা করে না প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তদের; বরং প্রথম শ্রেণি পাওয়াটাকে ভাবে জীবনে এগোনোর প্রথম বড় বাধা। প্রথম শ্রেণি মানে তো বিশ্ববিদ্যালয়, আর বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ হচ্ছে জীবনটাকে নিজের হাতে নষ্ট করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুষ নেই, পীড়ন করার ক্ষমতা নেই, গাড়ি নেই, ভবিষ্যতে বাড়ি নেই, জীবনে কোনো রূপসী নেই।

জানি না অধ্যাপক আজাদ কতটা সঠিক ছিলেন। তিনি নিজেও বলেছেন এসব তার ‘শোনা কথা’। তারপরও এর সঙ্গে বর্তমান সময়ের একটি তুলনামূলক চিত্র আমরা তৈরি করতে পারি। লেখাপড়াকে ছাত্রছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না, একথা সত্যি, কিন্তু পাশাপাশি এ-ও সত্যি যে তারা ফলাফলকে একদম অবহেলাও করে না। তাদের পড়াশোনা ‘শিট ভিত্তিক’। শিক্ষকরা ছোট ছোট নোট বা ‘শিট’ দেন, ওই নোটগুলো তারা ফটোকপি করে শ্যাডো থেকে এবং পরবর্তীকালে তা পড়ে গিয়ে পরীক্ষা দেয়। যারা ওই শিটের সঙ্গে শিক্ষকের লেকচারের সমন্বয় করতে পারে এবং বাছাই করা অংশ ভালোভাবে পড়তে পারে, তারাই মূলত ভালো করে পরীক্ষায়। পড়াশোনা হয় আংশিক। বেশিরভাগ বইয়েরই পুরোটা পড়া হয় না ছাত্রছাত্রীদের, তারা শুধু সেটুকুই পড়ে, যা তাদের পরীক্ষার জন্য জরুরি। ফলে বইটির লেখক ঠিক কোন্ মেজাজে লিখেছেন বইটি, তাও আর বোঝা হয়ে ওঠে না তাদের।

কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদেরই শুধু দায়ী করব না; কেননা, সেমিস্টার সিস্টেমে লেগে থাকে মিডটার্ম, ইনকোর্স, পেপার প্রেজেন্টেশনসহ আরো নানান কিছু। আর কয়েকটি সেমিস্টার যদি ‘শিট’ পড়ে ভালো ফলাফল তারা না করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তদের মতো সবাই হতে চায় না, তা নয়। আর কেউ যে প্রথম শ্রেণি পাওয়াটাকে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে জীবনের পথে বাধা মনে করে, সেটিও মনে করি না। বরং শিক্ষকতা করতে পারে আসলে গুটি কয়েক শিক্ষার্থী; যারা প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়, অর্থাত্ খুব ভালো ফলাফল করে। একটা ব্যাচে যদি একশ’ জন শিক্ষার্থী থাকে, তাহলে তাদের মাঝে সাতানব্বই জনই শিক্ষকতার স্বপ্ন দেখতে পারে না। এই শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ সেই কারণে ছোটে বিসিএস বা একটি নিরাপদ কর্মসংস্থানের পথে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি নেই, একথা বলা যাবে না, কারণ শিক্ষক-জনবল নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়াসহ নানান ধরনের অভ্যন্তরীণ কাজে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক চাপে দুর্নীতি হয়। আর এই দুর্নীতির বাষ্পে কি শিক্ষকরাও দূষিত হচ্ছেন না?

আর নিপীড়নের এক অদ্ভুত দৃশ্য আবিষ্কার করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। কোনো একজন শিক্ষকের কাজের প্রতিবাদ করলে নম্বর কমে যায় পরীক্ষার খাতায়, যৌন হয়রানি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, অভিযোগের তীর অনেক সময় এসেছে শিক্ষকদের ওপরেও, গেস্টরুমে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের একটি সরকারি দলের অনুগত করার জন্য নেওয়া হয় পীড়নমূলক ব্যবস্থা। শিক্ষকদের গাড়ি নেই, এ কথাও অন্তত এখন সত্যি নয়। আমি অনুষদের নিচে বহু শিক্ষককেই দেখি, যারা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে চলাচল করেন। অবসরের পর অনেক শিক্ষকই নিজেদের কেনা ফ্ল্যাটে থাকেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের স্ত্রী বা স্বামী উচ্চশিক্ষিত হবেন, এ আশা করাই যেতে পারে। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি লোভনীয় নয়, এ কথা অন্তত সত্যি বলে মনে করি না।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান তৈরি ও বিতরণের স্থান। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান তৈরি ব্যাপারটা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। বরং এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা যায় বিসিএস কলেজ। গবেষণা বা জ্ঞান তৈরির স্থান এখানে খুব একটা নেই। শিক্ষার্থীরা বিভাগের পড়াশোনা বাদ দিয়ে লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে বিসিএসের পড়া। কেউ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে যায়, তবে দেখতে পাবে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পড়ছে বিসিএসের পড়া। এদের কাছে ভালো ফলাফল ব্যাপারটাই মুখ্য, কে কতটুকু শিখতে পেরেছে বা দক্ষতা অর্জন করেছে, সেটি মুখ্য নয়।

জানি না বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আর কতদিন এরকম থাকবে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কি সত্যিই তার নামের অর্থ প্রতিষ্ঠা করবে? এখানে কি জ্ঞান চর্চার বিকাশ ঘটবে?

আমার বিশ্বাস, বদল সম্ভব। আর সেই বদলের জন্য কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। জ্ঞানচর্চা ও নিজেকে বিকশিত করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে। বিশ্ববিদ্যালয়কে করতে হবে স্বাধীন চিন্তার একটি আবাদভূমি, সৃষ্টি করতে হবে জ্ঞান, সব রকম দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যার একটি প্রধান পদক্ষেপ হলো, প্রতিটি জালিয়াত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা। গেস্টরুম সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রথমবর্ষেই শিক্ষার্থীদের জন্য সিট বরাদ্দ করা হোক। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ফলাফলের পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হোক পড়ানোর দক্ষতাও। আর তৈরি করা হোক একটি উদার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ। তবেই বদল সম্ভব। সম্ভব জ্ঞানের বিকাশ।

লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর