শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৪১ এএম


বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসলে কী ঘটছে!

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রকাশিত: ০৮:৫৫, ৩ জুলাই ২০১৯  

খুব মাথা উঁচু করে একসময় বলতাম আমরা শিক্ষক। এখন আর এমনটা বলি না। এখন আরো একধাপ এগিয়ে বলি ‘আমরা মহান শিক্ষক!’ জাতির বিবেক! কিন্তু কীসের কী? নিয়োগ-বাণিজ্যি, টেন্ডারবাজি, টেন্ডারে কারসাজি, ঠিকাদারদের সঙ্গে বোঝাপড়া, লেনদেন, নিজের ব্যবসা, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, গবেষণাবিমুখ সংস্কৃতিকে ধারণ, শিক্ষার্থীদের নিজ স্বার্থে ব্যবহার এমন কিছু নেই যার সঙ্গে শিক্ষকরা যুক্ত নয়। এর সঙ্গে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেওয়া, কনসালটেন্সির নামে ব্যবসা করা, এটা তো এখন ট্র্যাডিশন হয়ে গেছে। বলার কিছুই নেই। কারণ বলতে গেলেই সবাই বলবে এটা তো আমাদের অধিকার। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে আছে। ঠিক আছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী সেটা যেভাবে করা উচিত সেভাবে কি সেটা করা হচ্ছে? কিংবা আমরা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কি এমন বড়ো পর্যায়ে আমরা নিয়ে গেছি যে আমরা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে মনোযোগী না হয়ে অন্য কাজে যুক্ত হব।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে ও বোঝে কিন্তু বলার মতো বুকের পাটা কারো নেই। মেরুদণ্ডটাই তো ভাঙা। কারণ আমরা যে মহান, নিজের বড়ো বড়ো স্বার্থ ত্যাগ করে এই পেশা গ্রহণ করেছি। এত মহত্ আর আত্মত্যাগী মানুষ কি আর পৃথিবীতে আছে? সবার নিজ নিজ দর্শন থাকতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। সবাই এক মত ও পথের হবে, সেটাও কখনো সম্ভব নয়। রাজনীতির বাইরে তো আর মানুষ নয়। কিন্তু নীতি ও আদর্শের বদলে যখন রাজনীতিকে নোংরামির উদ্দেশ্যে শিক্ষকরা ব্যবহার করছেন তখন সেটাকে আমি অপরাজনীতি বলব। দিনের পর দিন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আমলনামা জমছে আর জমছে। সেটার দিকে কারো খেয়াল নেই। হয়তো দু-একটা তদন্ত হয় কিন্তু সেটার ফলাফলও মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে। শিক্ষকতা একটি স্বাধীন ও মহান পেশা। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে না এলেও চলে। বিশ্ববিদালয়ের সবচেয়ে খারাপ দিকটি হচ্ছে শিক্ষকদের পদ-পদবির লোভ। এজন্য টিমওয়ার্কের বদলে গড়ে উঠছে গ্রুপকেন্দ্রিক গ্রাম্য রাজনীতি। এর সঙ্গে কে কাকে ভিসি বানাবে, কে কাকে লাভ লেটার দেবে, এই তো চলছে। অদ্ভুত একটা সময় চলছে। যার দিকেই তাকাই সে-ই বলে ভিসি তার কথামতো চলে। রাতের পর রাত টেলিফোনে কথা হয়। গোপন আলাপ চলে। গ্রুপিং লবিং করে, নিজের ব্যক্তিত্বের বারোটা বাজিয়ে আরো নিচে নেমে যখন কেউ ভিসি হচ্ছেন তখন তার ক্রেডিট সবাই নিচ্ছেন। এই গ্রুপিং লবিং, তদবির, তোষামোদিকে ভিসি হবার অযোগ্যতা ঘোষণা ও আইন সরকার থেকে করা হোক। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণার পরিবর্তে হয়ে পড়বে ক্ষমতাকেন্দ্রিক পেশিশক্তির বলয়।

এভাবে যদি চলতে থাকে তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা আর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে অপশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যে কমিটির ওপর কারো কোনো প্রভাব থাকবে না। এই কমিটি শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদান, সততা, দক্ষতা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধসহ ইতিবাচক দিকসমূহকে প্রাধান্য দেবেন। অনেকেই সরকারি আইন, রীতিনীতিকে তোয়াক্কা না করে এমনভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রয়োগ করছেন, যার প্রভাব বিরূপভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পড়ছে। গবেষণায় শিক্ষকদের উত্সাহিত করার পরিবর্তে শিক্ষকদের মধ্যে কীভাবে দলাদলি সৃষ্টি করে নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায় সে পরিকল্পনা তাঁরা পরোক্ষভাবে গ্রহণ করেন। এর ফলে বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থীর যেভাবে লালন-পালন ও যত্ন নেওয়া দরকার সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন জ্ঞান নিয়ে বের হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়ে ওঠে না। পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ইসরাইলে অবস্থিত। এর কারণ হচ্ছে এই শিল্প-কারখানাগুলো তাদের যে শিল্পপণ্য উত্পাদন করে তার নতুন নতুন ধারণা এই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে আসে। এর অর্থ হচ্ছে ইসরাইলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে তাদের চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানো হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গতানুগতিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করা হয় বলে চিন্তাশীলতা সৃষ্টির পরিবর্তে সেখানে মুখস্থ বিদ্যার প্রভাব বেশি দেখা যায়। এর ফলে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীরা পেছনে পড়ে যায় আর মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে এসে পড়ে। সামগ্রিকভাবে যা প্রকৃত মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মনোবলের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

এর ফলে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়, যার প্রভাব রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর গিয়ে পড়ে। শিক্ষকরা শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে শিক্ষাবহির্ভূত কাজে বেশি যুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্কের টানপোড়েন সৃষ্টি হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই ধরনের নেতিবাচক ফলাফল কারো জন্যই শুভকর হবে না। এখানে আমি সব শিক্ষকদের কথা বলছি না। বেশিরভাগ শিক্ষকই মেধাবী ও যোগ্য। কিন্তু তার পরও তাঁরা ন্যায়-অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রায় তথাকথিত নিরপেক্ষ। এই তথাকথিত নিরপরক্ষতার কারণে ভালো শিক্ষকরাও ভুলতে বসেছেন ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা গ্রুপের কিছু মানুষের স্বার্থের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার পরও শুভদিনের প্রতীক্ষায় সদা জাগ্রত থাক চোখ।


লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর