সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ২২:১২ পিএম


বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা আসছে নজরদারির আওতায়

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

প্রকাশিত: ১২:১৫, ৮ আগস্ট ২০২০  

দেশে কর্মরত অধিকাংশ বিদেশি কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা পদমর্যাদার সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিটে প্রদর্শিত বেতন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার ক্ষেত্র বিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিটে দেখানো পদবিতে অসামঞ্জস্য আছে। বিদেশিরা মূলত এ দু’পদ্ধতিতেই প্রকৃত তথ্য গোপন করে টাকা পাচার ও আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন।

সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে বিদেশি কর্মীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের এ কৌশল বেরিয়ে এসেছে। এসব রোধে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে বিদেশিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন দেয়া বাধ্যতামূলক এবং বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

এদিকে টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধভাবে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি কর্মী কাজ করছেন। ন্যূনতম এ সংখ্যার হিসেবে দেশ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়।

পাশাপাশি বিদেশিদের কর ফাঁকির ফলে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীরাই তথ্য গোপন করে এ টাকা পাচার করেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

জানা গেছে, অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি কর্মীদের বেতনের বড় একটি অংশ বিদেশে হস্তান্তর করা হয়। পুরো বেতন দেশে দেয়া হলে নিয়মানুযায়ী শতকরা ৩০ ভাগ আয়কর দিতে হয়। এতে বড় অংকের টাকা চলে যায়।

কাজেই তারা বেতনের বড় অংশ নিজ দেশে বা অন্য কোনো দেশে গ্রহণের ক্ষেত্রেই বেশি আগ্রহী। দেশের বাইরে বেতন বাবদ দেয়া টাকার বৈধ কোনো রেকর্ড বাংলাদেশে থাকে না।

এভাবে পরিশোধিত টাকা নানা পথে পাচার হচ্ছে। এর কোনো আয়কর সরকার পাচ্ছে না। ফলে সব দিক থেকে লোকসান হচ্ছে বাংলাদেশের। বর্তমানে কত বিদেশি বাংলাদেশে কাজ করছেন, তার সঠিক তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছেই নেই।

আয়কর বিভাগের রিটার্ন জমার তথ্যের সঙ্গে বিডা, বেপজা, এনজিও ব্যুরোর তথ্যের মিল নেই। তবে টিআইবির এক প্রতিবেদনে একটি পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

বিশেষ সংস্থাটির চিঠিতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ইস্যুকৃত ওয়ার্ক পারমিটে বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতার বিষয়টি সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকছে না।

তদন্তে বিদেশিদের বেতন-ভাতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজ দেশ থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করে বলে জানান।

বিধায় ওয়ার্ক পারমিটে তা উল্লেখ থাকে না। কর্মীর নিজ দেশে বেতন-ভাতা প্রদান এবং বাংলাদেশে কর্মকালীন বিদেশির ভরণ-পোষণের ব্যয়ভারের বিষয়টি ওয়ার্ক পারমিটে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

এতে আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ বিদেশি কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পদমর্যাদার আলোকে ওয়ার্ক পারমিটে প্রদর্শিত বেতন-ভাতা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিটে প্রদর্শিত পদবি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

২০১১ সালে ওয়ার্ক পারমিট স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়, যা বর্তমান শ্রম বাজারের বাস্তবতার নিরিখে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বিদেশিদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে ওয়ার্ক পারমিটের প্রদর্শিত বেতন কাঠামো বাস্তবে প্রাপ্ত বেতন কাঠামোর তুলনায় অনেক কম।

তাছাড়া বেশিরভাগ বিদেশি কর্মী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না খুলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। ফলে তাদের বেতন কোথায় জমা হচ্ছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক বিদেশি নগদে বেতন গ্রহণ করে থাকেন, পরে তা হুন্ডির মাধ্যমে নিজ দেশে পাঠান।

ফলে সরকার বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া তারা অর্থ নিজ দেশে নেয়ার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না।

এনজিওতে অধিকাংশ বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং নামমাত্র একটি জীবিকা নির্বাহের জন্য ভাতা গ্রহণ করেন। যা এ দেশে তাদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত আয়কর ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা উচ্চপদে উচ্চ বেতনে কাজ করলেও তা গোপন রাখেন।

এনবিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশিরা চুক্তিভিত্তিক কাজ করে থাকেন। বেশিরভাগ চুক্তিতে আয়কর দেয়ার পর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বেতন হিসেবে দেয়ার কথা বলা থাকে। যেহেতু বিদেশি কর্মীদের আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর আছে, সেহেতু কর ফাঁকি দিতে তারা প্রকৃত বেতন গোপন করে।

যতটুকু কর দেয়, ততটুকু তারা বেতন হিসাবে প্রকাশ করে। বাকি টাকা চুক্তি অনুযায়ী হয়তো বিদেশি কোনো ব্যাংকে স্থানান্তর করে নিয়ে যায়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৪টিরও বেশি দেশের নাগরিক বিভিন্ন খাতে কর্মরত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হচ্ছে- ভারত, চীন, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, নরওয়ে ও নাইজেরিয়া। এদের মধ্যে ভারতের নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, চামড়া শিল্প, চিকিৎসা সেবা এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বেশিরভাগ বিদেশি কাজ করেন।

কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে গোয়েন্দা সংস্থার চিঠিতে বলা হয়েছে- বিডা, বেজা, বেপজা এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ওয়ার্ক পারমিটের শর্ত হিসেবে বিদেশিদের বাংলাদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে বেতন গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুস্পষ্ট এবং গ্রহণযোগ্য বেতন কাঠামো নির্ধারণের জন্য এতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও কর্মসংস্থান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও গাইডলাইন রয়েছে। তা সত্ত্বেও পর্যটক ভিসা ও অন-অ্যারাইভাল ভিসায় কাজ করে। প্রকৃত বেতনের এক-তৃতীয়াংশ তারা বৈধভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিয়ে থাকে।

বাকি অংশ অবৈধভাবে নগদে গ্রহণ করে। অন্যদিকে অবৈধভাবে কর্মরত কর্মীদের শতভাগ বেতন নগদে অথবা দুবাই-সিঙ্গাপুরের মতো অন্য কোনো দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শুধু কর্মী নিজের হাত খরচ, আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়ে থাকে।

এদিকে ৫ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এতে বাংলাদেশে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা এবং পাচার করা অর্থের পরিমাণ এবং সরকারের রাজস্ব হারানোর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদেশি কর্মী নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে বিদেশি কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা ও অবৈধভাবে পাচারকৃত রেমিটেন্সের পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বহুপাক্ষিক যোগসাজশ, সংশ্লিষ্ট নীতি ও বিধিমালার প্রয়োগের ঘাটতি, নিয়োগকারী ও নিয়োগপ্রাপ্তদের অনৈতিকতা, দায়িত্বশীলদের একাংশের অদক্ষতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির ফলেই বিদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

যার ফলে রাষ্ট্র তথা জনগণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাস্তব সুফল ভোগ করতে পারছে না। আমাদের উন্নয়নের সুফল দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। তিনি বলেন, সঠিক ভিসা ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় কাজের অনুমতি দিয়ে নিয়োগ প্রদানসহ তাদের উপার্জিত অর্থ বৈধপথে নিজ দেশে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আয়কর প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর