মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল, ২০২০ ১৬:৩৯ পিএম


বাংলা শিক্ষায় 'মিশ্র' বাঁশির সুর

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

প্রকাশিত: ০৮:৪৩, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৮:৪৩, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আমরা এখনও বাংলা ভাষাতে হাসি, কাঁদি বা স্বপ্ন দেখি বলে আমাদের মানবিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো এখনও এই ভাষাতেই দানা বাঁধে। আমরা যতই ইংরেজি-হিন্দি বলি না কেন, আমাদের মনোজগৎ এখনও এই ভাষাতেই ঋদ্ধ হয়। ভিটগেনস্টাইনের কথার সূত্র ধরে বলা যায়, আমাদের ব্যক্তিগত ভুবনগুলো কেমন বা কত বড়, সেটা নির্ভর করে মাতৃভাষা জ্ঞানের ওপর; কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এই গোড়াতেই গলদ আছে।

সৌভাগ্যবশত আমাদের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা। সৌভাগ্য বলছি এ কারণে যে, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এখন পৃথিবীর ৪০ শতাংশ মানুষ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কিন্তু কোনো কিছু পেয়ে গেলে যা হয়- রক্তে কেনা ভাষাও একসময় মূল্যহীন মনে হয়; হাতের লক্ষ্মীকেও অবহেলায় পায়ে ঠেলতে দ্বিধা করি না।
যে ভাষাজ্ঞান সম্বল করে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন জ্ঞানান্বেষণে ব্রতী হয়, সেটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। অন্যদের মতো আমাদের ছেলেমেয়েরাও তাদের হাতের নাগালের ছুঁয়েছেনে দেখা গণ্ডিবদ্ধ পৃথিবী থেকে ভাষার প্রথম পাঠ গ্রহণ করে। সেই সময় নিরেট ভাষা শেখার জন্য তারা আলাদা করে ভাষা শেখে না; পারিবারিক সদস্যদের সঙ্গে মিথস্ট্ক্রিয়ার মাধ্যমে মনের অজান্তেই ভাষার অবয়ব ও অস্থিমজ্জার সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই ভাষাটি অনানুষ্ঠানিক এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক।
স্কুলে এই প্রক্রিয়াটি একেবারে বিপরীত না হলেও বেশ খানিকটা পাল্টে যায়। প্রাক-বিদ্যালয় জীবনে একজন শিক্ষার্থী অন্য কিছুর মাধ্যমে ভাষা শেখে আর এখানে ভাষার মাধ্যমে সে জ্ঞান অর্জন করে। উলেল্গখ্য, যে ভাষার মাধ্যমে সে জ্ঞান অর্জন করে, আর যে ভাষা সে তার পরিবার থেকে শিখে আসে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই দুটি ভাষা যে দু`রকম আমরা তা প্রায়শ মনে রাখি না। তাই ধরেই নিই, আমাদের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করার মতো প্রয়োজনীয় বাংলা জানে। বাংলা শিখন-শেখানোর প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের যে এত অবহেলা, তা এ কারণেই।
আমরা ভুলে যাই অবচেতন মনের সহজাত প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থী তার প্রথম ভাষাটি যেভাবে শিখেছিল, পাঠ্যবইয়ের ভাষা সে আর তত সহজে শিখতে পারবে না। তাকে সচেতনভাবে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, বানান ইত্যাদি শিখতে হবে। জেফ্রি থর্নটন তার বিখ্যাত `Language Ignorance and Education` বইয়ে বলেছেন, পৃথিবী যেমন সমতল নয়, জ্ঞানের ভাষাও তেমনি একেবারে সহজ-সরল আটপৌরে নয়। তাই জ্ঞান প্রকাশের ক্ষেত্রে যত্ন করে ভাষা শেখাটা যেমন জরুরি, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও তেমনি।
বাংলার মতো সমৃদ্ধ ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে, বাংলা ভাষার আবহে বেড়ে ওঠে, বাংলায় অনার্স পাস করার পরও শিক্ষার্থীদের এই বেহাল অবস্থার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা খুব দ্রুত চারটি বিষয় উলেল্গখ করেন- ১. ভালো শিক্ষক নেই; ২. শিক্ষার্থীরা যত্ন নিয়ে বাংলা শেখার চাপ অনুভব করে না; ৩. ছাত্রছাত্রীরা ধরেই নেয় যে, ওরা বাংলা জানে; ৪. বাংলা শেখার জন্য আকর্ষণীয় বইপত্র নেই বললেই হয়। এই চারটি দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা সহজাতভাবেই আরও বিপজ্জনক দুটি ফাঁদে পড়ে যায়; ৫. প্রাক-বিদ্যালয় জীবনের অবচেতন মন দিয়ে ভাষা শেখার প্রক্রিয়া সে অবচেতনে সারা জীবন ধরে প্রায় একমাত্র প্রক্রিয়া হিসেবে অনুসরণ করে; ৬. কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়া, পত্রপত্রিকা, বইপত্র, বিজ্ঞাপন ও ইন্টারনেট এখন যে অতি সহজ, নিয়মনীতি-বর্জিত, ছেলে ভোলানো, মুখরোচক মিশ্র ভাষা পরিবেশন করছে, তা গোগ্রাসে গিলতে থাকে।

সব মিলিয়ে শৈশবে শেখা সেই অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক ভাষা আর এই তথাকথিত অগোছালো `মিশ্র` ভাষাই বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভাষাজ্ঞানের মূল উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ভাষার কারণে তাদের সঙ্গে পাঠক্রমের একটা দুরতিক্রম্য ব্যবধান থেকে যায়। এই ব্যবধানটি যে একটি বড় ধরনের সমস্যা, তা সাধারণ জ্ঞানেও বোঝা যায়। তবে বেজিল বার্নস্টাইনের `ভাষার ঘাটতি তত্ত্ব` বিষয়টি আরও স্পষ্ট করবে। তাঁর মতে, সমাজের অবহেলিত নিম্নশ্রেণির ছেলেমেয়েরা যেহেতু একটি দুর্বল বা উপভাষার পরিমণ্ডলে বড় হয়, তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অবস্থাপন্ন ছেলেমেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। উলেল্গখ্য, প্রায় এক যুগ ধরে পশ্চিমা বিশ্বে প্রবল আলোড়ন তুললেও বার্নস্টাইন সমালোচকদের তোপের মুখে পড়েছিলেন। সমালোচকদের কথা হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে ধনী-গরিবের পার্থক্য কেবল ভাষার জন্য হয় না, এখানে আরও অনেক বিষয় কাজ করে। কিন্তু আমাদের হেলাফেলার বাংলা শিক্ষার পাশাপাশি এই `মিশ্র` বিকৃতিপরায়ণ ভাষার প্রেক্ষাপটে বার্নস্টাইনের তত্ত্বটি যে আমাদের এখানে এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, তা বলাই বাহুল্য।
বার্নস্টাইনের ইংল্যান্ডের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখানকার নতুন উপাদান হচ্ছে `মিশ্র` ভাষা, যার শিকার মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ শিক্ষার্থীরা। এই `মিশ্র` ভাষারূপী হ্যামিলনীয় বাঁশির অমোঘ আকর্ষণে তরুণরা সম্মোহিত হয়ে কোথায় যে ছুটে চলেছে, তা তারা জানে না। অবশ্য যে কোনো নতুন, সহজ, উত্তেজনাকর, ঝাঁঝালো বিষয় তরুণদের আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রমিত ভাষার তুলনায় স্ল্যাং সবসময় জোরালো হয়। এক শ্রেণির লেখক, উপস্থাপক, নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতারা এই `মিশ্র ভাষা`রূপী বাঁশিটি বাজাচ্ছেন। তাদেরকে হয়তো ব্যবসা বা পেশাগত কারণেই তা বাজাতে হচ্ছে; যেমন পেশাগত কারণে, অপরাধী জেনেও, আইনজীবীদের মক্কেলের পক্ষে দাঁড়াতে হয়।
চেষ্টা করলে বাংলা ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এদের শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে পারেন। শিক্ষার্থীদের ভাষাজ্ঞানের বুনিয়াদ যদি মজবুত হয়, তাহলে ওই বাঁশি, তা যত ডাকাতিয়াই হোক, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও মননকে `চুরি` করে নিয়ে যেতে পারবে না।
মনে রাখতে হবে, শুধু বিনোদন বাণিজ্যের লোভে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেওয়াটা চরম অনৈতিকতার নামান্তর। অপর পক্ষকে মূলত শিক্ষকদের বুঝতে হবে, এই ভাষিক আগ্রাসনের মুখে শিক্ষার্থীদের ভাষাজ্ঞান বা ভাষাপ্রেমরূপী অভেদ্য বর্ম তৈরি করার মূল দায়িত্বটা তাদের। তারা যদি ব্যর্থ হন, `ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলা` কিংবা সর্বোপরি `বাংলা ভাষার বিকৃতি` তো রোধ হবেই না, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় সবই কালক্রমে বেনিয়াদের দখলে চলে যাবে।
মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বাংলাদেশ, ঢাকা

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর