বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ৬:১৮ এএম


বর্তমান প্রজন্মের মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা

মো. সাজ্জাদ হোসেন

প্রকাশিত: ১৬:৫৮, ৩ নভেম্বর ২০১৯  

প্রজন্ম ”হলো সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি। “প্রজন্ম” সম্মিলিতভাবে বিবেচিত, প্রায় একই সময়ে জন্মগ্রহণকারী এবং বসবাসকারী সমস্ত মানুষ । গড় সময়কাল তিরিশ বছর হিসেবে বিবেচিত হয়, এই সময়কালে শিশুরা জন্মগ্রহণ করে এবং বড় হয়,প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তাদের নিজস্ব সন্তান জন্ম নেওয়া শুরু করে ।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্থানের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ভাষা হবে উর্দু । সেই প্রজন্মের তরুণ সমাজ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দাবী ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন এবং এই দাবীর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিল । গঠিত হয়েছিল রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ । বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলেছিল “ রাষ্টভাষা বাংলা চাই,তোমার ভাষা আমার ভাষা, বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা ।” ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ( বাংলা ৮ ফাল্গুন ) ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল ।

রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে পুঁলিশ গুলি চালিয়েছিল । পুলিশের গুলিতে জীবন দিয়েছিল সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার,শফিউর এবং নাম না জানা অনেকে । পাকিস্থানের সামরিক জান্তা সেই প্রজন্মের কাছে পরাজিত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ছাত্র সমাজের সেই দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল ।

বাঙ্গালী জাতি ফিরে পেয়েছিল তার মাতৃভাষার অধিকার । মাতৃভাষা বংলা ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইইনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয় । ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন,১৯৬৬ সালের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষণাকৃত ৬ দফা আন্দোলন,উনসত্তরের গণঅভ্যুথান,১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের মাধ্যমে জীবন বাজি রেখে দেশ মাতৃকার বীর সন্তানরা পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল । নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীকে পরাস্থ করে সারা বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছিল ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে জীবন বাজি রেখে বহিঃশত্রুর সঙ্গে প্রাণপন লড়াই করে আমাদের কে স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম । ২০২১ সালে বর্তমান প্রজন্ম উৎযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী । আমরা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের নাগরিক । আমরা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছি,আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছি । পৃথিবীতে আর কোন জাতিকে তার মাতৃভাষার জন্য জীবন দিতে হয়নি । আমরা দেশপ্রেমিক,আমরা নীতি নৈতিকতায় পরিপূর্ণ মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ একটি জাতি । সারা বিশ্বে অনেক বাঙ্গালী নীতি নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে উজ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ।


আলজেরিয়ায় ১৯৭৩ অনুষ্ঠিত জোট- নিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন-“আমি হিমালয় দেখিনি,তবে শেখ মুজিব কে দেখেছি । ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমতুল্য । আর এই ভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি ।”


আমরা বাঙ্গালী, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক । আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক,মওলানা ভাষানী ও হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দীর মত মানুষ কে পেয়েছি । তবুও আজ আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছি । আমাদের কাছে আজ আমাদের ভাইবোন আর নিরাপদ নয় ।

মেধাবী ছাত্র,শিশু,যুবক,বৃদ্ধ,মা,বোন কেও নিরাপদ নয় । নৈতিকতা ও মূল্যবোধ টুকু আজ হারিয়ে যেতে চলেছে । টেলিভিশান,পত্র পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন যা জানতে পারছি তা আমাদের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসেনা । প্রতিদিন আমাদের কে জাতির কাছে লজ্জা পেতে হচ্ছে । সহপাঠির কাছে আজ সহপাঠি নিরাপদ নয় ।

বাবার কাছে তার সন্তান নিরাপদ নয়,মা তার সন্তানকে গলাটিপে হত্যা করছে,স্বামীর কাছে স্ত্রী প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে । স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে অনেক মা,বোন আত্মহত্যার মত পাপ কাজকে বেছে নিচ্ছে । সকল ক্ষেত্রে আইন অমান্য করার একটা অসুস্থ প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে । ছাত্র সমাজের মাঝেও আজ নৈতিকতার বড়ই অভাব ।


তথ্য প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের এই যুগে আমাদদের জীবনযাত্রা কে অনেক সহজ করে দিয়েছে বটে,কিন্তু আমাদের মানবিক মূল্যবোধ টুকু কেড়ে নিয়েছে । মানুষ হিসেবে আমরা মানবিকতার শিক্ষাটুকু হারিয়ে ফেলেছি । যাযাবর খ্যাত বিনয় মুখোপ্যাধায় বলেছেন-“ আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ;তাতে আছে গতির নেই যতির আয়েশ ।”


নৈতিকতার শিক্ষা কোন জটিলতর শিক্ষা নয় । আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন-“ কোন কিছু করার পরে যা ভালো মনে তাই হল নৈতিকতা,আর তা করার পর যা খারাপ মনে হয়,তাই হল অনৈতিকতা ।”


জাতির মেধাবী ছাত্র সমাজ ও আজ অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়েছে । তথ্য প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে নিজের মেধা বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে যে ছাত্র সমাজ ও বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সারাবিশ্বকে জয় করবে,সারা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে আজ সেই ছাত্র সমাজ অপসংস্কৃতিতে কলুষিত হয়েছে । পুরো সমাজ আজ মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছে । মনুষ্যত্ব আজ অনেক দূরে চলে গেছে । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন-“ মানুষের মৃত্যু আমাকে আঘাত করে না,কিন্তু মনুষ্যত্বের মৃত্যুকে আমি সইতে পারিনা ।”

আমাদের চিন্তা চেতনায় আধুনিক,মানবিকতা ও নৈতিক গুণাবলী সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার মত অনেক উজ্বল দৃষ্টান্ত আছে । বাঙ্গালী,বাংলা সাহিত্য ও রাজনৈতিক নেতার জীবন আদর্শের প্রতিটি পাতায় তাদের জীবনের মানবিক ও নৈতিক গুণাবলী গুলো আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে ।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ণশীল দেশের কাতারে উঠে এসছে । খাদ্যে আজ বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ । বাঙ্গালী আজ স্বনির্ভরশীল জাতি । মাথাপছিু আয় অনেক দেশের তুলনায় অধিক। কৃষি,শিল্প,অবকাঠামো,তথ্যপ্রযুক্তি সকল ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এসছে ।

তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপান্তর হয়েছে । আশাহত জাতি কখন ও উন্নতি করতে পারেনা । তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে হবে । তাদের হাতেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ । প্রযুক্তি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যত বাংলাদেশকে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলবে এই অটুট বিশ্বাস রাখতে হবে ।

লেখক : প্রভাষক,হিসাব বিজ্ঞান
লাউর ফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ ।
নবীনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া

এডুকেশন বাংলা/ এসআই

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর