রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২০:৪৯ পিএম


বরখাস্ত শিক্ষকের স্থগিত বেতন-ভাতা ছাড়ের প্রস্তাব মাউশির

এডুকেশন বাংলা ডেস্ক:

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ২৬ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৭:০১, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

জালিয়াতির দায়ে বরখাস্ত শিক্ষকের স্থগিত বেতন-ভাতা ছাড়ের প্রস্তাব করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) ছাড়ের প্রস্তাব পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর সেলিম ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর ও দুটি পত্রিকার নামে বিজ্ঞপ্তি জালিয়াতি করে নিয়োগপত্র তৈরি করেন। এসব কাগজপত্র দিয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিও অনুমোদন নেন ২০১৩ সালের নভেম্বরে। কিন্তু তা তদন্তে ধরা পড়ার পর এমপিও স্থগিত করে মাউশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট জাহাঙ্গীর সেলিমকে সাময়িক বরখাস্ত করে ম্যানেজিং কমিটি। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি চূড়ান্ত বরখাস্তের পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আর্বিট্রেশন কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হয়। নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগে ম্যানেজিং কমিটি ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীর সেলিমের বিরুদ্ধে শেরপুরের ঝিনাইগাতি সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন।

এই অভিযোগে একই বছর সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন বিদ্যালয়টির ওই সময়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক (বর্তমানে প্রধান শিক্ষক) উম্মে কুলসুম। এই মামলার রায়ে আদালত উম্মে কুলসুমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেন। কমিটি পরে তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।


মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতির ঘটনায় বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে ছয়টি মামলা চলছে। তবে সব তথ্য গোপন করে মাউশিতে এমপিও ছাড়ের আবেদন করলে মাউশি এমপিও ছাড়ের অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা তার পুরো তথ্য যাচাই করবো। মাউশির প্রস্তাব যাই থাক তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক পদে বহাল না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই এমপিও ফেরত চাইতে আবেদন করতে পারেন না, আর চাইলেও তা পাবেন না।’


এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, ‘এমপিও ছাড়ের সময় সব যাচাই করা হয়। বরখাস্ত হলে বা নিয়োগ না থাকলে কেউ এমপিও পাওয়ার যোগ্য হবেন না।’

প্রধান শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে চিঠি জানা গেছে, অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগের ঘটনাটি তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিমের নাম এমপিও তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশের চিঠি মাউশির মহাপরিচালকের কাছে পাঠায় শেরপুর জেলা শিক্ষা অফিস। ২০১৫ সালে স্থায়ীভাবে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে শিক্ষা অফিস।


জেলা শিক্ষা অফিসারের সুপারিশের পর ২০১৫ সালে তার এমপিও বন্ধ করে রাখে মাউশি। স্থায়ীভাবে এমপিও তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে মাউশি অনুমোদন চায় মন্ত্রণালয়ের কাছে। এছাড়া নিয়োগ জালিয়াতির জন্য জাহাঙ্গীর সেলিমের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা দিয়ে জেলা শিক্ষা অফিসারকে চিঠি দেয় মাউশি। জেলা প্রশাসনও বিষয়টি তদন্ত করে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই সময়ের উপসচিব (বর্তমানে যুগ্মসচিব) নুসরাত জাবীন বানু স্বাক্ষরিত আদেশে মাউশির বেতন-ভাতা স্থগিতের ভুতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়।

এমপিও ছাড়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি
এতো কিছুর পর নুসরাত জাবীন বানু তার নিজের স্বাক্ষরিত ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বরের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল রহস্যজনকভাবে এমপিও ছাড়ের চিঠি ইস্যু করেন। এমপিও ছাড়ের আদেশে বলা হয়, ‘জাল স্বাক্ষর সংক্রান্ত অভিযোগটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমতাবস্থায় জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও বকেয়া ছাড় করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ এ বিষয়ে জানতে নুসরাত জাবীন বানুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।’


মন্ত্রণালয়ের চিঠির বিরুদ্ধে রিট
নুসরাত জাবীন বানুর এই চিঠি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগে ওই রিট খারিজ হয়ে যায়। তবে খারিজ আদেশে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘অভিযোগটি নিম্ন আদালতে বিচার্য বিষয়।’ এই আদেশের রায় হাতে না পেয়ে বাদী উম্মে কুলসুম সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্টের খারিজ আদেশে ও পর্যবেক্ষণের আলোকে আপিল বিভাগ ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর ‘নো-অর্ডার’ আদেশ দেন। উম্মে কুলসুম বলেন, ‘হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ থাকার কারণে আপিল বিভাগ ‘নো-অর্ডার’ আদেশ দিয়েছেন। আমি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের আলোকে নিম্ন আদালতে মামলা করেছি, মামলা চলমান।’


এমপিও ছাড়ের প্রস্তাব
অভিযুক্ত শিক্ষকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৯ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে মাউশির মহাপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। এতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বেতন ছাড়ের বিষয়ে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে মতামতসহ প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে আইনগত মতামতসহ চিঠি পাঠান মহাপরিচালক। চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘চলমান মামলার স্লিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোকাদ্দমাগুলোতে কোনও ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। আমাদের অভিমত ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিলের আদেশ (নুসরাত জাবীন বানু স্বাক্ষরিত এমপিও ছাড়ের আদেশ) বহাল থাকবে।’


তবে মহাপরিচালকের ওই চিঠিতে দুইজন প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ থাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘জাহাঙ্গীর সেলিম/উম্মে কুলসুম -এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কামনা করা হলো।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। এছাড়া মামলা চলাকালে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমিই প্রধান শিক্ষক হিসেবে আছি।’ তবে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।


সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর