মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ৮:৪৪ এএম


প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের চাকরি কঠিনতর হচ্ছে

মাহবুবুল আলম

প্রকাশিত: ১৪:০৪, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  

গত বছর তেইশ থেকে পঁচিশ ডিসেম্বর পর্যন্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন-বৈষম্য নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। এই অনশন কর্মসূচি সংগঠন হিসেবে কোনো কোনো সংগঠনকে শক্তিশালী প্লাটফর্ম দিলেও সহকারী শিক্ষকদের কিছুই দিতে পারেনি। এই কর্মসূচি নিয়ে কেউ কেউ লাভবানও হয়েছেন । কেউ কেউ জিরো থেকে হিরো হয়েছেন । কিন্তু সাধারণ সহকারী শিক্ষকগণের কাছে এই কর্মসূচির ফল " যেই লাউ সেই কদুর মতো" ।

সাধারণ শিক্ষকদের প্রাপ্তির ভাণ্ডার শূন্য । তবে সাধারণ শিক্ষকদের অনেক ঝক্কি ঝামেলা গেছে বা যাচ্ছে এখনো। দিনকে দিন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের চাকরি কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে । নানা ধরণের বৈষম্য মূলক পরিপত্র একটার পর একটা জারি হতেই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে সময়সূচি কার্যকর (সকাল নয়টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ) তা কিছুতেই শিশুবান্ধব নয়। এক শিফটের স্কুলের জন্য এই সময়সূচি শিশু পীড়নের পর্যায়ে ফেললেও অতিরিক্ত বলা হবে না।

দ্বিতীয়ত প্রাথমিক শিক্ষকদের জাতীয় দিবস এবং ধর্মীয় কিছু অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক । যদিও এসব দিবস সরকারি ছুটি হিসেবে গণ্য । কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের বিদ্যালয়ে আসতেই হয়। তাই এসব দিবস অবশ্যই কর্ম দিবস হিসেবে বিবেচ্য হওয়া বিবেচনার দাবি রাখে।

তৃতীয়ত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য । শিক্ষক নিয়োগ বিধি অনুসারে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা পুরুষ স্নাতক এবং মহিলা এইচএসসি । যোগ্যতা ভিন্ন চাওয়া হয় কিন্তু বেতন অভিন্ন। এটা একটা অভিনব প্রতারণা । পৃথিবীর কোনো দেশে এমনটা আছে কিনা আমার জানা নেই। একদিকে যোগ্যতা বেশি চাওয়া হয় অন্যদিকে ক্ষেত্রবিশেষে চাপ বেশি । এটা পরিষ্কার বৈষম্য ।

চতুর্থত স্ববেতনে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব । প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রধান শিক্ষক নামক পদে হরেক নামের প্রধান শিক্ষক এবং বেতনের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা। সরাসরি /ননক্যাডার থেকে আগত প্রধান শিক্ষকদের বেতন অন্যান্য প্রধান শিক্ষকদের চেয়ে অনেক বেশি। পদোন্নতি এবং চলতি দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন সহকারী স্কেলেই। তাই এটাও একটা বৈষম্য ।

শিক্ষক এবং কেরানি । একজন প্রাথমিক শিক্ষকদের এখন বিভিন্ন কাজ করতে হয় যা তাঁর মূল পেশাকে ব্যাহত করে। কখনো তাঁকে শিল্পী হতে হয় , কখনো দক্ষ হিসেব রক্ষক, কখনো দক্ষ পরিসংখ্যানবিদ বা খেলোয়াড় ---- । একজন কেরানি প্রতিটি বিদ্যালয়ের এখন সময়ের সেরা দাবি।

সর্বোপরি তৃতীয় শ্রেণীর অভিশাপ । স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরেও প্রাথমিক শিক্ষকগণ তৃতীয় কর্মচারী । যা চরম কষ্ট এবং দুঃখের। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। শিক্ষকগণ তাঁদের স্বল্প বেতনে সংসার চালাতে রীতিমতো সংগ্রাম করে। তাই স্কুল পিরিয়ডের বাইরে তাঁদের বিভিন্ন কর্ম করতেই হয় সংসারের ব্যয় মিটাতে । সংসারে দীনতা রেখে মান-সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দুরুহ কাজ । তাই কঠিন কঠিন পরিপত্রের ভীরেও কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসছে না । যা আসছে তা নিতান্তই শিক্ষকদের অতিরিক্ত আন্তরিক নিবেদনে । যা সকল শিক্ষকের ক্ষেত্রে আশা করা বাতুলতা ।
তাই নতুন বছরে প্রাথমিক শিক্ষার অভিভাবকদের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে নিন্মুক্ত বিষয়গুলি বিবেচনা করে কাঙ্ক্ষিত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়ে উদারতার পরিচয় দেওয়া :

ক) সহকারী শিক্ষকদের বেতন-বৈষম্য নিরসন ।
খ) প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-বৈষম্য নিরসন।
গ) শিশু বান্ধব সময়সূচি ।
ঘ) লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণ ।
ঙ) প্রাথমিক শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণির অভিশাপ থেকে মুক্তি ।

শেষে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি অভূতপূর্ব । যা কেবল শিক্ষকদের অতিরিক্ত আন্তরিক প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে । কিন্তু শিক্ষকদের বেতন যদি মান-সম্মত হতো তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা তরতর করে এগিয়ে যেতো । কঠিন কঠিন পরিপত্রের দরকার হতো না। যে সকল অসাম্যতা আছে তা দূর করলেই প্রাথমিক শিক্ষা গুণগত মানোন্নয়নে অগ্রগামী হবে নিঃসন্দেহে।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের তথা প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদার জয় হোক ।

মাহবুবুল আলম , সহকারী শিক্ষক
হাতিরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় , মনোহরদী, নরসিংদী ।


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর