মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ৭:২২ এএম


প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজন নিজস্ব ক্যাডার

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ১০:২২, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিটি সরকারি হওয়ার কারণে অনেকেই এই চাকরিতে দরখাস্ত করেন; কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ের জন্য, শিশু শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ভিত রচনা করার জন্য যাঁদের এই পেশায় আসার কথা, তাঁরা এর ধারেকাছেও নেই। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কর্মজীবন উন্নয়ন পরিকল্পনা নেই অর্থাৎ একজন মেধাবী প্রার্থী যদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি শুরু করেন, অন্য অনেক চাকরির মতো তাঁর ওপরে ওঠার সিঁড়ি নেই। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় দুটি নিয়োগ বিধিমালা আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালা। আর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য একটি নিয়োগ বিধিমালা। তবে ১৯৮৫ সালে এই নিয়োগ বিধিমালায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পদোন্নতির সুযোগ পেতেন। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এই বিধিমালা সংশোধন করে তা রদ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক থেকে ওপরের পদে শতভাগ সরাসরি নিয়োগের বিধান করে পদোন্নতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রধান শিক্ষকদের এখন পদোন্নতি ছাড়াই চাকরিজীবন শেষ করতে হচ্ছে।

৩৪তম ও ৩৬তম নন-ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। জানি না বিষয়টি আমাদের শিক্ষা বিভাগের নীতিনির্ধারকদের কতটা দৃষ্টি কেড়েছে। অন্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার যে করুণ হাল, তাতে যেকোনো মূল্যে মেধাবীদের এখানে নিয়ে আসতেই হবে এবং ধরে রাখতে হবে।

আমাদের দেশে এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সোয়া চার লাখ। বাকি প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ২৭টি ক্যাডার সার্ভিস থাকলেও সোয়া চার লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কোনো ক্যাডার সার্ভিস নেই। আর ক্যাডার পদ না থাকায় তেমন কোনো পদোন্নতিরও সুযোগ নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। ফলে মেধাবীরা প্রাথমিক শিক্ষায় আসছেন না। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আর সামাজিক সচেতনতার ফলে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ক্রমে বাড়লেও শিক্ষার মানের উন্নতি হচ্ছে না। নবম গ্রেডে চাকরি শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডে চলে যান। এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ; কিন্তু দেশের মানবসম্পদ যাঁরা তৈরি করছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক শিশুদের যাঁরা লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের জন্য কোনো ক্যাডার থাকবে না কেন? প্রাথমিক শিক্ষায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী শিক্ষা বর্মকর্তা, ইনস্ট্রাক্টর ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি করেন। সহকারী শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির। প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও তাঁরা এখনো ১১তম গ্রেডে চাকরি করেন। প্রধান শিক্ষকরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত পদমর্যাদা ও বেতনক্রম পেলেও সহকারী শিক্ষকদের চাওয়া পূরণ হচ্ছে না। তাঁরাও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে থাকতে চান না। তাঁরা চান দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা ও ১১তম গ্রেডে বেতন। শিক্ষক নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পান। তাহলে পদমর্যাদা দুই রকম কেন হবে? প্রাথমিক শিক্ষকরা ‘তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী’ এটি বর্তমান সমাজে যেন একেবারেই মানাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজন হলে আলাদা কমিশন গঠন করতে হবে।

১৯৮৯ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার পদের কম্পোজিশন পুনর্বিন্যাস করে। এতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের আওতায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিকারাধীন কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের মোট ৩১৮টি পদ অন্তর্ভুক্ত হয়। একই সঙ্গে এই পদগুলোর জন্য বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ সংশোধন করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ওই বছরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২৩টি পদ, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমিতে ৩৭টি পদ এবং মাঠপর্যায়ের ২০৯টি পদ রাখা হয়। এভাবে কয়েক বছর চলার পর ২০০০ সালে বিসিএস প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ শুরু হয়। এরপর ২০০৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রাথমিকে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এই মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জনবল হিসেবে ধরা হয়। তখন থেকে আর প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠনের কাজ এগোয়নি। আর যেহেতু বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন নিয়োগ হয়, তাই প্রথম দিকে আর কোনো বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ হয়নি। বিভিন্ন ক্যাডার, বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ধার করা কর্মকর্তাদের দিয়েই প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চ পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা কোনো ক্যাডারের সদস্য না হওয়ায় তাঁদের সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার পাথ নেই। তাঁদের বেশির ভাগই যে পদে চাকরি শুরু করে, সে পদ থেকেই তাদের অবসর গ্রহণ করতে হয়। ফলে তারা হতাশাগ্রস্ত থাকে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা প্রদান করে না।

২০১৪ সালের ৯ মার্চ বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করে। একই দিন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সে হিসাবে দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁদের বেতন স্কেল নির্ধারণ হওয়ার কথা জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে। তবে তা না করে মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করেছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডে। অথচ নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির পদে অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কর্মকর্তারা জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডেই বেতন পান। পরে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতিসহ ৪৫ জন শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে গত বছরের ৫ মার্চ রুল জারি করেন উচ্চ আদালত। সেই রুলের শুনানি নিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেলের দশম গ্রেডসহ (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন) গেজেটেড পদমর্যাদা দিতে নির্দেশ দেন। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে এটি কার্যকর করতে আদেশ দেন আদালত। এরপর গত ৩১ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল দশম গ্রেডে উন্নীত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার আইন-কানুন নিয়ে আদালত পর্যন্ত যেতে হচ্ছে, তাহলে শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের উন্নয়ন নিয়ে কে কখন ভাববেন?

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা), সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

[email protected]

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর